ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

file
গতবছর ঈদের সময়- কোরবানির ঈদ অথবা রোজার ঈদ হবে, আমার ঠিক মনে নেই। চট্টগ্রাম থেকে সকালের মহানগর ট্রেনে কুমিল্লা যাবো।

একদম শেষ মুহূর্তে গিয়ে ঠেলেঠুলে কোন রকম দরজায় দাড়ানোর ব্যবস্থা হলো ট্রেন আস্তে আস্তে চলতে লাগলো। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম ষাটোর্ধ একটি মহিলা ট্রেনের দড়জায় কোনরকম ব্যাগটা গুঁজে ট্রেনের সাথে সাথে দৌড়াচ্ছে আর বলছে, ‘ভাই আমারে তুলেন, ভাই আমারে তুলেন’।
ট্রেনের ভিতরে থাকা একেকজন দিল্লীর সুলতান বলতে লাগলো, ‘পরের ট্রেনে আসেন’।
বৃদ্ধা আকুতি করতে লাগলো, ‘ভাাই আমার সিট আছে, আমি বেলাবেলি না গেলে আমার ছেলেমেয়েরা অনেক চিন্তা করবে’।

আশেপাশের মানুষগুলোকে কিছুটা ধমক দিয়েই হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধাকে ট্রেনে তুললাম।

এতই ভিড় ছিল, ভদ্র মহিলা আর সিটে যাওয়ার সাহস করলো না। অনেকক্ষণ পর ভদ্রমহিলা কোনরকমে দড়জার কাছেই একটা জায়গায় বসার সুযোগ পেলো।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধা আমার হাতে একটি কাগজ দিয়ে বললো, ‘বাবা, আমার মোবাইলে চার্জ নেই, আমার ছেলেকে একটা ফোন করে জানাইয়া দিবেন? আমি ট্রেনে উঠেছি’।

আমি ফোন দিয়ে ওনার ছেলেকে জানিয়ে দিলাম।
আলাপচারিতায় যা জানলাম তা হলো, ওনি ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঢাকায় থাকে, গ্রামের বাড়ী চাঁদপুর, ছেলেরা ঢাকায় চাকরি করে, চট্টগ্রামে একটি বাড়ি আছে, আর এ বাড়ীর ভাড়া নিতেই চট্টগ্রামে এসেছিল । কারণ ছেলেমেয়েরা অনেক ব্যস্ত!

ট্রেন ফেনী পৌছলে ভিড় আরো বেড়ে যায়। মানুষের চাপ, গরম আর ঘামের গন্ধে বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে পড়ে।এবং খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ওনার মাথায় পানিও ঢালতে হয়েছিল।

ট্রেন কুমিল্লার কাছাকাছি, আমি নেমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ওনাকে এভাবে একা রেখে যেতে আমার খুব খারাপ লাগছিল। হঠাৎ মনে হলো, যেহেতু ঈদের আগের দিন সেহেতু কুমিল্লা থেকে ঢাকার বাসগুলো প্রায় ফাঁকাই যাবে এবং ওনাকে বাসে তুলে দিলে ভালোভাবেই ঢাকায় পৌছে যাবে। এবং তাই করলাম, কুমিল্লার শাসনগাছা থেকে ওনাকে বাসে তুলে দিলাম। আবারো ফোনে তার ছেলেকে সেটা জানিয়ে দিলাম।

বাসে তুলে দেয়ার পর জননী আমায় বলেছিল, ‘বাবা, তুমি আমার ছেলের মতো, তোমার কথা আমার সারা জীবন মনে থাকবে’।

আমরা এমন প্রায়ই বলি, ‘তোমার কথা আমার সারাজীবন মনে থাকবে’। কিন্তু আমরা মনে রাখিনা। জননী আমায় ঠিকই মনে রেখেছিল।

ঢাকা পৌছেই রাতে আমায় ফোন দিল, মা-ছেলে দুজনেই অনেক কৃতজ্ঞতা জ্ঞ্যাপন করলো। বার বার বাসায় যাওয়ার জন্য রিকোয়েস্টও করলো। আমিও কথা দিয়েছিলাম, যদি ঢাকায় যাই তবে তাদের বাসায় যাবো।

এরই মধ্যে আরও কয়েকবার ফোন করে জননী আমার খোঁজখবর নিয়েছে এবং বাসায় যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ আমায় ফোন দিয়েছিল পনেরো-বিশ দিন আগে। মা ফোন করে বললো, ‘বাবা, তোমাকে দেখতে আমার খুব ইচ্ছে করে, তুমি একবার এসো’। আমি বলেছিলাম, ‘আট-দশ দিন পর ঢাকায় আসবো, তখন আপনাকে দেখে যাবো’।

আমি গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় গিয়েছিলাম ব্যাংক এশিয়া আর ন্যাশনাল ব্যাংকে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। একই দিনে দুটি ব্যাংকে পরীক্ষা থাকায় তাদের বাসায় আর যাওয়া হল না।

আজ আবার ঢাকায় যাব, আগামীকাল এক্সিম ব্যাংকের পরীক্ষা। তাই আজ ঐ বৃদ্ধ জননী কে ফোন করলাম আমার আসার খবরটা জানাতে। যথারীতি ফোন ধরলো জননীর ছেলে।মাকে চাইতেই তার ছেলে বললো, ‘আম্মাতো মারা গেছেন, গত রোববার’। আমি আর কথা দীর্ঘায়ত করতে পারলাম না। ফোন রাখলাম।

গত শুক্রবারও জননী জীবিত ছিলেন। আমি একটু কষ্ট করলেই ওনার ইচ্ছাটুকু পূরণ করতে পারতাম। তার চাওয়াটা তো আর বেশি ছিল না, পরের সন্তান কে সন্তান মনে করে একটি বার দেখতেই তো চেয়েছিল।

একটা মানুষ মৃত্যুর আগে এতবার আমায় দেখতে চাইলো, অথচ আমি তার ইচ্ছাটুকু পূর্ণ করলাম না। এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কি হতে পারে? মাগো, তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও। কথা দিচ্ছি, একদিন তোমার সাথে আমি দেখা করবোই।