ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 
20150612_142045-4000x3500

গতকাল আমার নিবন্ধন পরীক্ষা (কলেজ পর্যায়) ছিল। সিট পরেছিল চট্টগ্রাম মহিলা কলেজে। চবি ক্যাম্পাস থেকে শাটল ট্রেনে ষোলশহর স্টেশন পর্যন্ত যাই। এরপর স্টেশন থেকে কলেজ অবধি আমি আর বন্ধু শাহিন আলফালাহগলির পথ ধরে হেঁটে হেঁটেই যাচ্ছিলাম। কলেজের খুব কাছাকাছি, হঠাৎ থমকে গেলাম, হুইল চেয়ারে বসা সন্তানসমেত শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষটিকে দেখে। ছবিটি ভালো করে লক্ষ্য করলে স্পষ্টই বুঝা যায় লোকটার দুটো হাত আর দুটো পা  অচল। নিজের চেষ্টায় হুইল চেয়ারে ওঠতেও পারে না, নামতেও পারে না। শুধুই কি পা? শরীরের যা কাঠামো, এক গ্লাস পানিও নাকি সহসায় তুলে খেতে পারে না ।

পাশে যে মহীয়সী নারীটি কে দেখতে পাচ্ছেন, সে ঐ প্রতিবন্ধী মানুষটার ভাগ্যহীনা স্ত্রী, যে স্ত্রী হয়ে স্বামীর দায়িত্ব পালন করছেন। সারাদিন হুইল চেয়ার ঠেলছে, ভিক্ষে করছে, এমন কি স্বামীর গোছলটুকুও তাকেই করাতে হচ্ছে। সংসারে আরো কত কাজ! সবইতো তার সামলাতে হয়। আর যে ছোট বাচ্চাটিকে দেখতে পাচ্ছেন, সেটি এই হতভাগা সাইফুল-জরিনা দম্পতীর কলিজার টুকরা।

আমি যখন বললাম, ‘আপা, আপনারা সবাই একটু একসাথে দাঁড়াবেন? একটা ছবি তুলবো’। তখন আপা তার আঁচল দিয়ে একবার সন্তানের মুখটা মুছলেন, আরেক বার স্বামীর মুখটা । পাছে ছবিতে তাদের অসুন্দর দেখায়!!
কি আশ্চর্য ! নিজের মুখটা একবার মুছলেন না। এটাই হলো মা, এটাই স্ত্রী, এটাই সর্বংসহা নারী।

আর এ নারীর প্রতিই আমাদের এত অসম্মান, এত অবজ্ঞা, এতো নির্যাতন।

আচ্ছা, জরিনাও কি তার স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়? মনে হচ্ছে, না। নির্যাতন করার ক্ষমতা যে সাইফুলের নেই!

জরিনা, তুমি ভাগ্যহীনা নও । তোমার স্বামীটি সুস্থ সবল কেউ নয়, এটা তোমার ভাগ্য বলতে হবে !!

কেননা, ঐ সুস্থসবল স্বামীগুলোই যৌতুকের জন্য তার স্ত্রী কে দিনের পর দিন নির্যাতন করছে, কেউ কেউ নাকি পুড়িয়েও মারছে। অকারনেও নির্যাতন করে । এমন অনেক সুস্থ-সবল স্বামী(!) আছে, যারা স্ত্রীকে পতিতাবৃত্তিতেও বাধ্য করছে। কেউ কেউ আবার বন্ধুদের নিয়ে স্ত্রীকে ধর্ষণ করছে- এমন খবরও কাগজে পড়ি। আহারে স্বামী!!
এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে জরিনাই সুখী। সাইফুলের দুটো হাত আর দুটো পা জরিনার কি কাজে আসতো? পেটে ভাত, গায়ে কাপড়?? সেটা হয়তো হতো। কিন্তু এই হাত-পা যে জরিনার পেটে লাথি আর গায়ে কিল-ঘোষি বয়ে আনতো, সেটা একরকম নিশ্চিত করেই বালা যায়।

জরিনা, অন্য সকল নারীর মতো আজ তোমাকে অবজ্ঞা আর বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে না, নিরুপায় হয়ে হলেও সাইফুল তোমাকে অনেক ভালোবাসে, প্রাপ্য সম্মানের চেয়ে অধিক সম্মান তোমায় দেয়। তোমাকে ছাড়া সাইফুল এক মুহূর্তও চিন্তা করতে পারে না !

জানো জরিনা, সাইফুল যদি কবিতা আবৃত্তি করতে পারতো, তবে তোমায় তুষ্ট করতে নজরুলের এই কয়টা লাইন প্রতিদিন শোনাতো,
“হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে
কুড়াই ঝরা ফুল একেলা আমি
তুমি কেন হায় আসিলে হেথায়
সুখের সরগ হইতে নামি।।

চারিদিকে মোর উড়িছে কেবল
শুকানো পাতা আর মলিন ফুলদল
বৃথায় সেথা হায় তব আঁখি জল
ছিটাও অবিরল দিবস যামিন।”

বোন জরিনা, এই পুরুষার্থ সমাজে তুমিই সুখী। অন্য জরিনারা যেখানে প্রজা আর দাসী সেখানে তুমি রাণী আর দেবী । বেঁচে থাকো রাণীর মত।