ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ আমাদের প্রিয় দেশ; বাংলাদেশ। এটি কোন ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নয়, এটি ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু আমাদের দেশের জন্য ‘বাংলাদেশ’ নামটিও চয়ন করেছিলেন বাঙ্গালি জাতি ও তার ভাষার সাথে সামঞ্জস্য রেখে। পৃথিবীর প্রায় পঁচিশ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। তবুও উন্নত দেশে ‘বাঙ্গালী’ পরিচয়ে পরিচিত কাউকে সাধারণত বাংলাদেশী বলেই গন্য করা হয়। এর কারণ এই যে, যখন সমগ্র পৃথিবীতে যখন ঔপনিবেসবাদের পতন এবং একের পর এক স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটছিল, ঠিক তখনই পূর্ববাংলার বাঙ্গালীরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে  মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়ে বাঙ্গালী জাতি এবং বাংলা ভাষাকে নিয়ে গিয়েছিল সম্মানের শিখরে। এ বাংলার  মানুষ বার বার তার সংস্কৃতি রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ধর্ম তাদের কে কখনোই আলাদা করতে পারেনি।

ইসলাম ধর্মের প্রধান ভাষা আরবি (যেহেতু পবিত্র কোরআন আরবিতে নাজিল হয়েছে) হওয়া সত্ত্বেও, ৮০ ভাগ মুসলিম নিয়ে গঠিত বাঙ্গালি জাতি পাকিস্তানের আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব তাচ্ছিল্যের সাথে প্রত্যাখান করেছিল। ১৯৭১ সালে এ ভূখণ্ডে প্রায় ৮০ ভাগ মুসলিম থাকা সত্ত্বেও, সাংবিধানিকভাবে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান ধর্মের দোহাই দিয়েও বাঙ্গালির স্বাধীনতার সংগ্রাম কে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এ বাংলায় ধর্মীয় বিভেদ কখনো সাংস্কৃতিক ঐক্যের উপর বিজয়ী হতে পারেনি। এ বাংলা হিন্দু রবীন্দ্রনাথের বাংলা, মুসলমান নজরুলের বাংলা, এ বাংলা জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা, এ বাংলা অসাম্প্রদায়িক বাংলা।

ইসলাম ধর্মে পর্দার ব্যাপারে বেশ কড়াকড়ি নিয়ম রয়েছে। আমাদের দেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সাধারণত মুসলিম  নারীরা যেমন বাহিরে ঘোমটা ছাড়া চলাফেরা করেনা, তেমনি হিন্দু  নারীরাও তার ব্যতিক্রম নয়। ভাশুর বা শ্বশুরের সামনে বাড়ির বউরা তাদের ঘোমটা লম্বা করে, এবং বিনয়ে মাথা নিচু করে- এ সংস্কৃতি  উভয় ধর্মের নারীরাই চর্চা করে থাকে। তবে কি হিন্দু নারীরা মুসলমানদের পর্দাপ্রথা অনুসরণ করছে? না, মোটেও না, এটা বাঙ্গালী নারীর সংস্কৃতি। ধর্মের ফারাক এখানে বৈসাদৃশ্য সৃষ্টি করতে পারেনি।

বাংলাদেশ যে কতটা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র তা ইতিহাসখ্যাত অনেক ঘটনা দ্বারাই প্রমানিত। ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের দুর্ঘটনায় আহত হিন্দু শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে মাদ্রাসার ছাত্রদের রক্তদান, বছরের পর বছর বৌদ্ধ ভিক্ষু কর্তৃক গরীব মুসলিমদের জন্য ইফতারের আয়োজন,- পাঠককের জ্ঞাত এসব ঘটনা উৎরিয়ে আমি বিরক্তি সৃষ্টি করতে চাইনা । তবে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই।

কিছুদিন ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাচ্ছিলাম ট্রেনে করে। আমার সামনের সিটে একজন ভদ্রলোক তার দুই ছেলেকে নিয়ে বসেছে। বড় ছেলেটির বয়স আনুমানিক ১০ বছর। ছোট ছেলেটির বয়স আরো দুই তিন বছর কম হবে। বড় ছেলেটি যতটাই শান্ত, ছোট ছেলেটি ততোটাই চঞ্চল আর দুষ্টু। বড় ছেলেটিকে বেশ মায়া লাগলো। আলতো করে গাল চেপে তার নাম জিজ্ঞেস করলাম। বড় ছেলেরা লাজুক হয় – এই রীতি মেনেই হয়তো সে লজ্জা পাচ্ছে। পাশ থেকে তার বাবাই বললো, ‘মাশরাফি’।

আমি ঠাট্টার ছলে ভদ্রলোককে জিজ্ঞাস করলাম,  ছোট ছেলের নাম কি সাকিব আল হাসান? ভদ্রলোক  বললেন, ‘হ্যা’। প্রথমে মশকরা ভেবেছিলাম। পড়ে অবাক হলেও বিশ্বাস করতে হয়েছিল, কারণ পেছেনের সিট থেকে ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে কোন এক নারীর কন্ঠে ‘সাকিব’ নামটি উচ্চারিত হলো। পেছনের সিটে সাকিব আল হাসানের  মা আর বোন বসেছিল, আমার সিট থেকে তাদের দেখা যাচ্ছিলনা।

ক্রিকেট নিয়ে ভদ্রলোকের উৎসাহ স্বাভাবিকের চেয়ে ঢের বেশি। মুশফিক, মুস্তাফিজ, সাব্বির, সৌম্য; কেউই আমাদের আলোচনা থেকে বাদ যায়নি। আলাপের এক পর্যায়ে আবার ঠাট্টা করেই বললাম, ‘আপনার যদি আরেকটা ছেলে হয়, ‘নাম রাইখেন সৌম্য সরকার’। পরক্ষণেই বললাম, ‘ও সরি সরি, সৌম্য তো হিন্দু, আপনি রাইখেন সাব্বির রহমান’। লোকটি  হাসতে শুরু করলো। হাসার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। কারণ বললো না, আবার মুচকি হাসলো। তখন তার মুচকি হাসির কারণ আমি বুঝতে পারিনি।

ট্রেন ভৈরবের খুব কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে,  ভদ্রলোক পরিবার সমেত নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি নারী সামনে এসে লোকটিকে বললো, ‘তুমি সাকিবরে নামাইও, মাশরাফি আমার লগে নামবো’। সাকিব বললো, ‘আম্মু, আমি তোমার সাথে নামবো’। হঠাৎ  আমার চোখ পড়লো সাকিব আল হাসানের মায়ের দিকে। এই কি দেখছি আমি! মাশরাফি-সাকিবের মায়ের কপালে সিঁদুর! তাদের মা হিন্দু!

ভদ্রলোক নেমে যাওয়ার জন্য দাড়ালো, এবং হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘আমি সুমন শীল’। আমিও হাত বাড়ালাম, নিজের নামটা খুব আস্তে করেই বললাম। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল। অসাম্প্রদায়িকতার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কি হতে পারে, আমার জানা নেই।

বিগত ৪৫ বছর ধরে বাংলাদেশর  মতো এহেন অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা খুব কম রাষ্ট্রই দেখাতে পেরেছে। আমাদের দেশে দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী, বড়দিন ও বুদ্ধপূর্ণিমাতে সরকারি ছুটি পালন করা হয়। মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও কিন্তু মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী এবং বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমার  দিনে সরকারি ছুটি নেই। মিলেমিশে থাকার এমন আর দৃষ্টান্ত আর কোথায় আছে?

অল্প কিছু পথভ্রষ্ট মানুষের কারণে এতো বছরের এই অসাম্প্রদায়িক চরিত্র কি নসাৎ হয়ে যাবে? অধার্মিক কিছু বিপথগামী মানুষের ধর্মের দোহাইয়ে কি বাংলাদেশ আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তান হয়ে যাবে? না, এমনটা বাঙ্গালি জাতি কখনোই হতে দিবেনা। কেননা নেংটি পড়া কৃষকেরাও পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছিল। অনেক দামে কেনা এই দেশ, অটো স্বাধীন হওয়া জাতি আমরা নই। এখনি সময়, ঐ বিপথগামী মস্তিষ্কবিকৃত মানুষদের হাত থেকে আমাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করার। জাতির জনকের সেই আহবান পৌছে দিতে হবে বাংলার প্রতিটি প্রান্তরে। সমস্বরে বলতে হবে, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলো”। পিতা বেঁচে থাকলে  হয়তো এও বলতেন, “যার যা কিছু আছে, তা নিয়েই জঙ্গিবাদের মোকাবিলা করতে হবে”।

ইমাম মেহেদী
ব্লগার ও নাগরিক সাংবাদিক।
haque_cu@yahoo.com