ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
ছাত্রলীগের নির্মমতার বলি জুবায়ের

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন শিক্ষার্থী জুবায়ের। ঘটনার এক বছর অতিক্রান্ত। লড়াই কি শেষ? আজ মঙ্গলবার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে বিক্ষোভ-মিছিল ও সমাবেশ শেষে উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

০৮/১/২০১৩
বরাবর,
মাননীয় উপাচার্য
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।
বিষয় : জুবায়ের হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে।
জনাব,
আপনি অবগত আছেন যে, আমরা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’-এর ব্যানারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিগত ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদের হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ‘সন্ত্রাস বিরোধী আন্দোলন’ শুরু করি। সেই ছাত্র আন্দোলনের চাপে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অপরাধীদের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা এবং সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তানুযায়ী ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার ও অবাঞ্ছিত করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, আন্দোলন ও হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক বছর যেতে না যেতেই গ্রেফতারকৃত সন্ত্রাসীরা যেমন জামিনে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে, তেমনি হাইকোর্ট তাদের এই শাস্তির ব্যাপারে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। এর সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে চলাফেরা করছে। ইতোমধ্যে অপরাধীদের অনেকে হাইকোর্টের ঐ আদেশের বলে পরীক্ষাতেও অংশগ্রহণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হাইকোর্টের এই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতে আপিল করার পরও অপরাধীরা ক্যাম্পাসে চলাফেরা করাটা বিভ্রান্তিকর। এ কারণে এই মামলার বর্তমান অবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তরফ থেকে আরও কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেসব ব্যাপারে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছি আমরা।

আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, ঐ হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা ব্যানার থেকে আমরা আরও কিছু সম্পূরক দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর দিয়েছিলাম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সেই সম্পূরক দাবিগুলো অদ্যাবধি আলোর মুখ দেখেনি। অথচ আমাদের সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত প্রদান করেছিল। আমাদের বোধগম্য নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও কেন সেই দাবিগুলো এখনও অপূর্ণই থেকে গেল? আমরা পুনরায় সেই দাবিগুলো আপনার বরাবর তুলে ধরছি যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেগুলো পূরণে আপনার নেতৃত্বাধীন প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি বিকেলে সন্ত্রাসীরা জুবায়েরের উপর নৃশংস হামলা চালায়। ৯ জানুয়ারি ভোরে জুবায়ের শাহাদাৎ বরণ করে। ৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় সুসংগঠিত-সুশৃঙ্খল ছাত্র আন্দোলন। যে আন্দোলন পুরো বাংলাদেশের সামনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। আন্দোলন চলাকালীন ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি বছর জুবায়ের-হত্যার দিনটিকে ক্যাম্পাসে ‘সন্ত্রাস বিরোধী দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে।

আপনি জানেন, সেই ছাত্র আন্দোলন একটি চেতনাকে ধারণ করে সংগঠিত হয়েছিল। অত্যন্ত সুসংহত-সুসংগঠিত-সুশৃঙ্খল প্রতিবাদ-প্রতিরোধ রচনা করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছিল। রাষ্ট্রব্যাপী যেভাবে সন্ত্রাসের কালো থাবা আজকের তারুণ্যকে ধ্বংসের মুখোমুখি করেছে, জাহাঙ্গীরনগরকে সেই বলয় থেকে মুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছিল প্রতিটি আন্দোলনকারীর কণ্ঠে। কিন্তু যেভাবে সন্ত্রাসীরা স্বাধীনচেতা হয়ে ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করছে তাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরই দায়িত্ব তাদেরকে নির্মূলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রথমবারের মতো খুনিদের শাস্তির মুখোমুখি করার যে দৃষ্টান্ত আমরা স্থাপন করেছি সেটা ভূলণ্ঠিত হোক তা আমরা কোনভাবেই প্রত্যাশা করি না। কেননা অপরাধীরা পাড় পেয়ে গেলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তা একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপিত হবে। শুধু তাই নয়, এটা ভবিষ্যতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রেরণাও যোগাবে। যা কোনো মতেই কাম্য নয়। সন্ত্রাসের প্রশ্রয়দাতা নয়, দেশের অন্যতম শীর্ষ এই বিদ্যাপীঠ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে উদাহরণ হয়ে উঠুক এটাই আমাদের সুতীব্র প্রত্যাশা।

দাবিসমূহ
১. বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের তৎকালীন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খুনিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে যে শাস্তি হয়েছে তা কার্যকর ও বলবৎ রাখতে হবে।
২. খুনিদের হাইকোর্টে আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়কে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে তার ফলাফল বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করতে হবে।
৩. খুনিদের নাম-পরিচয়-ছবি সংবলিত পোস্টার পুরো ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. রাষ্ট্রীয় আইনে দ্রুততম সময়ে বিচারের ব্যবস্থা ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নিতে হবে।
৫. খুনিদের মদদদাতা ও ইন্ধনদাতাদের সনাক্তকরণে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
৬. অনতিবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল গড়ে তুলতে হবে।

বিনীত,
‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’-এর পক্ষে
১. আফিফা রাজ্জাক
২. জাহিদুল ইসলাম জিন্নাহ্
৩. মৈত্রী বর্মন
৪. কলি মাহমুদ
৫. ফিয়াস শরীফ তমাল ৬. রাইয়ান রাজি ৭. সাকলাইন আল মামুন