ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

পাহাড়ের গা বেয়ে প্রবাহিত একটি স্বাদু পানির খাল। কী টলটলে পানি! খালের ওপর দিয়ে চোখ রাখলে দু’পাশে পাহাড়। এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে খালটি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, পাহাড়ের মাঝ দিয়ে। অপরূপ দৃশ্য।ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক শব্দে বাড়তে থাকে স্মৃতির সম্ভার। বেশ আঁকাবাঁকা রাস্তা। আবাদি মাঠের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া বহুদূর। একদম গ্রামের প্রতিচ্ছবি। মাঝে মাঝে প্যাঁকপ্যাঁক শব্দ করে ঝাঁক ধরে ঘুরে বেড়ানো সাদা রাজহাঁসেরও দেখা মেলে।

louachara photo (15)

সময় পেরিয়ে যায়। আমাদের রাস্তা শেষ হয় না। বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। শুধু অব্যবস্থাপনা আর অমনোযোগিতার কারণে এ শিল্পটি গড়ে উঠছে না। প্রশাসকদের উদাসীনতা আর প্রবহমান কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতির বাইরে এসে এর গুরুত্ব না বোঝাও এর অন্যতম কারণ।
প্রায় দু’ঘণ্টার লম্বা পথ পেরিয়ে আমরা ঢুকলাম মাধপুর চা বাগানে। অনেকেরই প্রথম দর্শন চা বাগান।’আরে, এগুলো চা গাছ! এই পাতা, এগুলোই আমাদের পানীয়!’ বিস্ময়ের উচ্ছ্বাস চোখেমুখে। প্রধান ফটক পেরিয়ে এগিয়ে যাই। অবাক হবার এখনও বাকি। উঁচুনিচু টিলা আর পাহাড়। এগুলোর গা বেয়েই তৈরি চা বাগান। বিস্ময়কর এক সৃষ্টি। স্রষ্টার প্রতি মাঝে মাঝে অনাস্থা এলেও সৃষ্টির অপরূপতা দেখে আস্থার বিকল্প ভাবতে ইচ্ছে করে না আর!
পাহাড়ের গা বেয়ে প্রবাহিত একটি স্বাদু পানির খাল। কী টলটলে পানি! খালের ওপর দিয়ে চোখ রাখলে দু’পাশে পাহাড়। এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে খালটি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, পাহাড়ের মাঝ দিয়ে। অপরূপ দৃশ্য।ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক শব্দে বাড়তে থাকে স্মৃতির সম্ভার। জাপানি বন্ধু মাসামির বিস্ময় ছিল চরমে।’তোমাদের এত্ত মানুষ, কত ছোট দেশ, কিন্তু কত সুন্দর জায়গা! তোমরা এ সেক্টরটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারো। দেশের অর্থনীতির জন্য এটা খুবই ইতিবাচক হবে।’ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি শুধু। মনে মনে বলি, মাসামি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার হালচাল যদি জানতে একবার…!
বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয় এ চা বাগানে। কেন জানি কোনো শ্রমিকের দেখা মিলল না। তার অভিব্যক্তি, দিন যাপনের কথা আর শোনা হলো না। ‘ঘোরা হলো শুধু, সাংবাদিকতা হলো না’_ গাড়িতে বসে টিপ্পনি শুনতে হলো বন্ধুদের।
এবার লাউয়াছড়া উদ্যান। চা বাগান থেকে আধা ঘণ্টার দূরত্ব। লাউয়াছড়ায় যাওয়ার পথটি আরও বৈচিত্র্যময়। রাস্তার দু’পাশে চা বাগান, পাহাড়, বন-বনানী, উঁচু-নিচু টিলা শ্রেণী, আনারস, লিচু ও লেবু বাগান। চা বাগান শ্রমিকদের ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। মাইক্রোবাসের গতির সঙ্গে কানে ভেসে আসে পাখির কূজন। চারদিকে সবুজের ছড়াছড়ি। যেন সবুজের স্বর্গরাজ্য।

louachara photo (8)
লাউয়াছড়ার প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামে। বেশ থ্রিলিংস। দু’পাশে বনবাদাড়। মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া কালো পিচের রাস্তা। আমাজান বনের মধ্য দিয়ে যেভাবে নদীগুলো এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে, এখানে তেমনি পিচের রাস্তা। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। যেন নিঝুমপুরী। কোলাহলমুক্ত এক্কেবারে জঙ্গলীয় পরিবেশ। কান পাতলে শোনা যাবে ঝিঁঝিঁ পোকার ক্লান্তিহীন ডাক। গাছে গাছে পাখির কিচিরমিচির। মূলরাস্তার দু’ধারে বিশাল বনজ বৃক্ষের বহর। কৃত্রিম, নাকি প্রাকৃতিক_ ধাঁধা লাগে। মনে প্রকৃতি যেন তার কাছে যাওয়ার পথটা তৈরি করে রেখেছে আমাদের জন্য। দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট। এর আকর্ষণীয় স্থানগুলোর একটি শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া রেইন ফরেস্ট। এ উদ্যানটি মূলত ভানুগাছ বনাঞ্চলের অংশ।
ব্যস্ত নগর জীবনে হাঁপিয়ে ওঠা প্রত্যেক মানুষেরই বিনোদন প্রয়োজন। আর এ প্রয়োজন মেটাতে সিলেটের শ্রীমঙ্গল অন্যতম স্থান। এখানে চা বাগানের নারী শ্রমিকদের কচি পাতা উত্তোলনের দৃশ্য আর দিগন্তরেখায় মিলিয়ে যাওয়া বিস্তৃত চা বাগানের সৌন্দর্য যেন এক অচেনা জগৎ। রয়েছে মিনি চিড়িয়াখানার নানাপ্রজাতির বিরল পশু-পাখি, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর মহামিলনের নান্দনিক সৌন্দর্যের অন্যতম স্থান লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। দেশে ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট হিসেবে খ্যাত এ পার্কটি বিনোদনের আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হয়েছে। উঁচু-নিচু পাহাড় ও ঝরনাধারায় পরিপূর্ণ দেশের প্রসিদ্ধ এ পিকনিক স্পটটি শীতের শুরু থেকেই অগণিত পর্যটকের পদভারে হয়ে ওঠে মুখর। দেশ-বিদেশের অজস্র ভ্রমণপিপাসু প্রতিনিয়তই ছুটে আসছেন আনন্দ ভ্রমণ কিংবা শিক্ষা সফরে।
উদ্যানের ভেতরে যাই। ক্রমেই বাড়তে থাকে বনের গভীরতা। পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও সংখ্যাটা উল্লেখযোগ্য নয়। নানা ভাবনা, ভয়, উত্তেজনা আর শঙ্কায় গা ছমছম করে ওঠে। এই বুঝি সামনে লাফিয়ে পড়ে বানরের দল! লাউয়াছড়ার অন্যতম প্রধান প্রাণী হলো উল্লুুুক। যদিও সময় স্বল্পতার কারণে তার দেখা ছাড়াই ফিরতে হয় আমাদের। এখানকার কর্মকর্তারা জানান, উল্লুুক দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাণী,বনমানুষ। এর দেখা মেলে শুধু এখানেই। হাজারো গাছপালা আর নানা প্রকার প্রাণীর মধ্যে রয়েছে আড়াই শতাধিক প্রজাতির পাখি, ১০ প্রজাতির সরীসৃপ, প্রায় অর্ধশত প্রজাতির বন্যপ্রাণী। মায়া হরিণ, লজ্জাবতী বানর, বনরুই, গন্ধগোকুল, উল্লুুক, বাগডাস, বনমোরগ, সজারু, অজগর সাপ, গুইসাপ, হনুমান, শিয়াল,মেছোবাঘ, চিতাবিড়াল, বনবিড়াল, শূকর, বেজি, কাঠবিড়ালী, বন্য কুকুর এবং আরও বিচিত্র প্রাণীর বসবাস থাকলেও আমাদের ভাগ্য খারাপ। শুধু বনজ সমাহার দেখেই ফিরতে হলো।
এ বনের আকর্ষণীয় আরেকটি দিক হলো, এর বুক চিরে বয়ে গেছে ঢাকা-সিলেট আন্তঃনগর রেললাইন।জায়গাটি বেশ আকর্ষণীয় আর সুন্দর। এ রেললাইন পার হলেই চোখে পড়বে দুর্লভ বৃক্ষ আফ্রিকান’টিকওক’ গাছের ভেঙে পড়া অংশটি। এটি ২০০৫ সালের এক ঝড়ে ভেঙে পড়ে যায়। অনেকের কাছে এ গাছটি ‘ক্লোরোফিল ট্রি’ নামেও পরিচিতি। বৃক্ষটির অদ্ভুত বৈশিষ্ট হলো, এর সংস্পর্শে এলে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যেত। দর্শনার্থী কমে যাওয়ার কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ বন বিভাগ গাছের এই অদ্ভুত ক্ষমতাটি ইনজেকশন দিয়ে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল। বর্তমানে লাউয়াছড়াতে আরও একটি ‘টিকওক’ গাছের চারার সন্ধান পাওয়া গেছে।

louachara photo (11)
উদ্যানের পশ্চিম প্রান্তে একটি খাসিয়া পল্লী আছে। ছোট একটি খাল পেরিয়ে যেতে হয় খাসিয়া পল্লীতে।মাটি থেকে বেশ উঁচুতে পাহাড়ি টিলার ওপর খাসিয়াদের বসবাস। মাচাং ঘর, আনারস বাগান ও তাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস পান চাষের বরজ বা ক্ষেত। সম্প্রতি বেশ পাকা বাড়িরও প্রচলন হয়েছে।খাসিয়াদের জীবনযাত্রাও বৈচিত্র্যময়। পুরুষরা চারা রোপণ, গাছের ওপর উঠে পান নামানো ইত্যাদি কাজ করে থাকে। মেয়েরা পান ধুয়ে আঁটি বেঁধে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে। সবাই মিলে খাসিয়াদের সঙ্গে বেশ কিছু ছবি ওঠালাম। এবার ফেরার পালা। মনে হলো ক্ষুধা লাগছে। শ্রীমঙ্গল শহরে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। তখন অবশ্য বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সাত রঙের চা খেলাম। মাসামি বেশ অবাক। এক কাপেসাত রঙের চা হয় কীভাবে? সময়ের অভাবে শ্রীমঙ্গলের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা চিড়িয়াখানাটি আর দেখা হলো না। গাড়ি চলল সিলেটের উদ্দেশে।

যেভাবে যেতে হবে
ঢাকার ফকিরাপুল, কল্যাণপুর, গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে হানিফ, শ্যামলী, সিলেট এক্সপ্রেস, টিআর ট্রাভেলসের গাড়ি পাওয়া যায়। রয়েছে রেল ব্যবস্থাও কমলাপুর থেকে। শ্রীমঙ্গল সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে লাউয়াছড়া উদ্যান।

কোথায় থাকবেন
লাউয়াছড়ায় রয়েছে ১টি ফরেস্ট রেস্ট হাউস। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সেখানে থাকতে পারেন। এ ছাড়াও শ্রীমঙ্গল-হবিগঞ্জ রোডে রয়েছে এসি, নন এসি, ঠাণ্ডা-গরম পানি, টিভি, ফোন, গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধাসহ ‘টি টাউন রেস্ট হাউস’। রয়েছে বেশ কিছু হোটেল।