ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

প্রত্যন্ত গ্রামেও পাক বাহিনীর নৃশংসতা। যে যেভাবে পারছে, সীমনা পেরিয়ে ছুটছে। সন্ধ্যার ঠিক পরেই, আলো আঁধারিরর খেলা। একদল নারী পুরুষের সঙ্গে যাচ্ছি আমরাও। রাস্তা অচেনা। গন্ত্যবও অনির্ধারিত। শুধু এতটুকু জানি, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যেতে হবে। পেতে হবে নিরাপদ আশ্রয়। প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরতে হবে মুক্তিযুদ্ধে। হানাদারদের কালোহাত থেকে মুক্ত করতে হবে মাতৃভূমিকে। রক্ষা করতে হবে মা-বোনের ইজ্জত।

12222
হাঁটছি তো হাঁটছিই। এমন সময় এক যুবকের আবির্ভাব। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনারা থামুন। এখনই এ রাস্তা দিয়ে পাক বাহিনীর গাড়ী আসবে। সঙ্গে আসুন, আমি মুক্তিযোদ্ধা। কিছু না বলেই তাকে অনুসরণ করি। কিছুক্ষণ পর দেখি, রাস্তার ঠিক পাশেই বিশাল এক পুকুরের পানিতে কয়েক শ মানুষ। গলা চুবিয়ে বসে আছে। কারো মুখে কথা নেই। আমরাও চুপ করে পানিতে শরীর ডুবালাম। আমাদের সঙ্গে এক মহিলার ৩ বছরের বাচ্চা ছিলো। সে ক্রমাগত কেঁদেই চলেছে। কোনোভাবেই তাকে থামানো যাচ্ছেনা। একটু পর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এসে সেই মাকে অনুরোধ করলেন, মা, আপনার ছেলে কে দয়াকরে থামান। আমাদের জীবন বিপন্ন। একটু পর কয়েকটি জীপ গাড়ি ভর্তি পাক সেনারা আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। কমান্ডার এসে সেই মাকে তার সন্তান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। মা কিছু না বলে তার মৃত সন্তানের নিথর দেহ পানি থেকে তুলে ধরলেন। তার ভাষ্য, কোনোভাবেই তার কান্না থামছিলনা। বাধ্য হয়ে পানিতে চুবিয়ে মারলাম তাকে। দেশের জন্য, হাজার সন্তানের জন্য আমার একটি সন্তানকে বিসর্জন দিলাম। হাউমাউ করে উঠলো উপস্থিত সবাই।

গল্পটি শুনছিলাম মুক্তিযুদ্ধ একাডেমির চেয়ারম্যান ড. আবুল আজাদ স্যারের মুখে। অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী বিদ্বান এ মানুষটির কাছে যখনই যাই, স্বভাবসুলভভাবেই তিনি একটা গল্প শুনিয়ে দেন। দেখা হলে, ফোনে যোগাযোগ করলে, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও তার কাছ থেকে শিখছি ক্রমাগত। বয়সের ফ্রেমে তারুণ্য পেরিয়েছেন বেশ আগেই। পঞ্চাশ পার হলেও নিরন্তর পরিশ্রমী মানুষটিকে দেখার বোঝার উপায় নেই। হাড় কাঁপুনি শীত, গ্রীষ্মের প্রখরতা কিংবা অবিরাম বর্ষাতেই তিনি ছুটতে পারেন, ছুটে চলেন সমানতালে। ড. আবুল আজাদ প্রগতিশীল মুক্তচিন্তা ও সংস্কৃতির প্লাটফরম রাইটার্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশেরও চেয়ারম্যান। কাজ করছেন সাউথ এশিয়ান মিউজিক ইন্সটিটিউটের জেনারেল সেক্রেটারী হিসেবে। মুক্তযুদ্ধ, প্রগতিশীল ভাবনা, সৃজশনীল বেশ কিছু উদ্যোগের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত। তিনি একজন লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি, সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয় প্রতিষ্ঠার দাবিসহ জাতীয় পর্যায়ের বহু আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে গত তিন দশক যাবৎ তিনি যুক্ত। তার সহজ-সরল লেখার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেন সমাজের অসঙ্গতি। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। অধিকাংশ বই-ই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও কুসংস্কারবিরোধী। বরাবরই মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ড. আজাদের। এ কারণে রাজাকার, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত গোষ্ঠীর চক্ষুশুল তিনি। এর আগে বেশ কয়েকবার তাকে মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়েছে। এজন্য বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধাপরাধী প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠী তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে। তার কর্মস্থল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানায় কাফনের কাপড়ও পাঠানো হয়েছে।

 

aa
তবে বিস্ময়কর ব্যাপার, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেও তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত যোগযোগ থেকে জানি, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে স্যারকে বেশ ছুটোছুটি করতে হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, বিজয় দিবসের কয়েকটি বড় প্রোগ্রাম করেন তিনি। বিজয়ের এ মাসে আপামর বাঙালি বিজয় উদযাপনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে অভিযুক্তদের ফাঁসির রায় বাস্তবায়নের পর প্রথম বুদ্ধিজীবী দিবস এটি। এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে দেশের সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। ঠিক এ রকম এক সময়েই ড. আজাদকে আবারো হুমকি দেওয়া হলো।

ডিসেম্বর শুরু হওয়ার পর থেকেই তাকে হুমকি দেওয়া শুরু হয়। পরপর কয়েক দিন অব্যাহতভাবে মুঠোফোনে তিনি হুমকি পান। প্রথমে মুঠোফোনে কল আসে প্রাইভেন নম্বর থেকে। এরপর সেটি আননোন নম্বর হিসেবে প্রদর্শিত হয়। এ কারণে মোবাইলের অপারেটর কিংবা নম্বর সনাক্ত করা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় তিনি জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আশুলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

এর আগে দুইবার তিনি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর আক্রমনের শিকার হন। হত্যার উদ্দেশ্যে এসব আক্রমণ করা হয়েছিল সন্দেহ নেই। এ বিষয়ে তিনি কুমিল্লা, সাভার ও আশুলিয়া থানায় বেশ কয়েকবার জিডি করেছেন। দেশে এখন যুদ্ধাপরীদের বিচার হচ্ছে। ঘৃণ্য এ কাপুরুষদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসিও দেওয়া হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী কলঙ্কমোচন শুরু হয়েছে। প্রগতিশীল নেতৃত্ব এখন দেশে বিরাজমান। এমনি মুহুর্তে একটি গোষ্ঠী কর্তৃক বারবার হত্যার হুমকি পাওয়া অস্বাভাবিকই নয় কেবল, চরম উদ্ধতেরও বহিঃপ্রকাশ। থানায় জিডি করার পর বিশেষ নিরাপত্তা হিসেবে তাকে দু‘জন গানম্যান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘরের কোণে চুপটি করে থাকার মত চরিত্র ড. আজাদ নন। সৃজনশীল, প্রগতিশীল ও উদারচিন্তা সংশ্লিষ্ট কাজে তাকে অবিরত ছুটে চলতে হয় রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে, সারাদেশে। গানম্যাান কেবল আশুলিয়া থানার মধ্যেই দায়িত্বপালন করবেন বলে জানানো হয়েছে।

 

1111
এ অবস্থায় ড. আজাদ পরিবারের সদস্যসহ চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর আগে করা জিডিগুলোর প্রেক্ষিতে যদি ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে হুমকিদাতারা এত বেপরোয়া হয়ে উঠতো না। মুক্তমনা ব্লগার, লেখক, প্রকাশক হত্যার ধারাবাহিকতায় কি এ হুমকি দেওয়া হচ্ছে? হুমকির বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়ায় আবারো কি চরম আতঙ্ক ও নির্মমতার প্রত্যক্ষ করতে হবে? বিজয়ের মাসে উদ্ধত মৌলবাদ গোষ্ঠীকে রুখে দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের, বিজয়েরই চেতনার মূলমন্ত্র। তবে, রুখে দেওয়ার দায়িত্বপালন করবে কে?