ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। আমাদের সময় পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করি। আর ফিচার লিখি দুটি বড় জাতীয় দৈনিকে। এক সকালে সেই বড় দুটির একটি দৈনিকের ফটোগ্রাফারের ফোন, তখনো বিশ্ববিদ্যালয় বলতে গেলে ঘুমায়।

– হ্যালো ইমদাদ, কেমন আছো।

– জ্বী ভাইয়া। এত সকালে ফোন দিয়েছেন? দুর্ঘটনা কিছু?

– আরে নাহ মিয়া, সব জায়গায় নেগেটিভ খুঁজে বেড়াও। খবর আছে একটা। তখন আমার কাছে খবর মানে আর কি। ভাবতে পারছি না। আমার ঘুম তখন গেছে। শীতের সকালে কম্বল ফেলে বিছানায় উঠে বসলাম।

– ভাই, বলেন তো কি হয়েছে?

– না হয়েছে কি, আমি আর তোমার ভাবি কাল তোমাদের ক্যাম্পাসে আসবো, পাখি দেখতে।

– ও (আড়মোড়া দিয়ে।) আচ্ছা, আসেন।

– শোনো, তুমি কিন্তু সারা দিন সময় দিবা। আর তোমার সুন্দরী বান্ধবীদের বলে রাখবা, ক্যাম্পাস পাতার জন্য ছবি উঠাবো।

– কিন্তু ভাই, আমি তো সকালে বাড়ি যাবো। গ্রামের বাড়ি। দুদিন পরে ফিরবো।

– আরে ধুরর মিয়া। আমি বড় না বাড়ি বড়? পরে যেও বাড়িতে। আমি আসছি। তুমি থাকবা, আর কোনো কথা নেই। বলেই লাইনটা দিলেন কেটে।

ছবি ইন্টারনেট থেকে নেয়া।

আমি আর কি করি। পরদিন সকালে ডেইরি গেটে তাদের অভ্যর্থনা। সঙ্গে আমার আরো দু-তিন ফ্রেন্ড। তিনি বাসা থেকে নাস্তা করে আসছেন। আমাদের জোড়াজুড়িতে তার আবার খিদে লেগে গেলো। নাস্তার আইটেম আর ধরন দেখে অবশ্য মনে হলো তিন দিন থেকে হয়তো খাবার সময় পাননি। বিল দিতে গেলে জোড়াজুড়িতে প্রচেষ্টা নিবৃত্ত করলেন। সারাদিন ঘুরাঘুরি। বান্ধবীদের নিয়ে ফটোসেশন। আবার দুপুরে বটতলায় ঐতিহ্যবাহী ভর্তা খাবার। সঙ্গে হাঁসের মাংস। দুজনের বেশি ভুরিভোজ। অবশ্য বটতলার খাবারের স্বাদ অনন্য। আমরাও তৃপ্ত, মেহমানদারী করাতে পেরে। বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে এবার তার সরল স্বীকারোক্তি।

– ইমদাদ, আমি আর তোমার ভাবি তো তোমার অতিথি, তাই না?
– জ্বী ভাইয়া। কোনো সমস্যা নেই। আপনি রাতেও খেয়ে যাবেন।
– হা হা। তুমি দুষ্টু হয়ে গেছো। অবশ্য তোমাদের খাবারগুলি অনেক টেস্টি। (তৃপ্তির ঢেঁকুর তার)।

ইচ্ছে ছিল রাতেও হাঁস অথবা কবুতরের মাংস ভক্ষণের। ব্যস্ততা হয়তো তাকে সে সময় দিলো না। আরেক দিন আসবেন, বারবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন। ডেইরি গেটে গিয়ে বাসের টিকেট কেটে ( সে সময় হানিফ ও সুপারের টিকেট সার্ভিস ছিল) বাসে উঠায় দিলাম। তিনি বাস ভাড়া দেবার কথা মুখে বললেও হাত অবশ্য পকেটেই ছিল। শীতকাল বলে কথা।

মাস খানেক পরের ঘটনা। প্রিয় ফটোগ্রাফার ভাই আমাদের ছবি তুলে নিয়েছেন। পত্রিকায় ছাপবেন। আমাদের সেই ছবি দিবেন। মজা করে ফেসবুকে দিবো। উত্তেজনা আমাদেরও কম কি!

ফোন দেই, উনার ব্যস্ততা। বান্ধবীদের বলি, জানিস? দেশ বিখ্যাত ফটোগ্রাফার, কতগুলো আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। পাবি পাবি, ওয়েট কর। তখন তো অনেকেই তোদের পেছনে ঘুরবে, ছবির পাগল হয়ে। ভুলে যাবি শুভ্ররে। বান্ধবীরাও মজা করতে ছাড়ে না। কয়েক দিন ফোনে কথা বলার পর একদিন গেলাম অফিসে। ততদিনে আমার পত্রিকা চেঞ্জ হয়েছে। একটি করপোরেট পত্রিকায় ঢুঁকে গেছি। উনিও সেখানে সুইচ করেছেন।

পল্টন মোড়ে বিশাল করপোরেট হাউজ। ক্যান্টিনটাও চমৎকার। তিনি আমায় নিয়ে লিফট বেয়ে নিচে নামলেন। হাঁটার কষ্ট নেই, আমারও আপত্তি নেই। মুক্তি ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তিনি আমারে দুধ চা খাওয়ালেন। শোনালেন তার ফটোগ্রাফার হয়ে উঠার গল্প। বিশাল ইতিহাস।
– ভাই, একটা বই লিখে ফিলেন। আপনি তো জাতীয় লিজেন্ড।
– হা হা। কি বলো ইমদাদ। আমার মত ফটোগ্রাফার আর কে আছে বলো!

আলাপ চলে আরো আধাঘন্টা। ইনিয়ে বিনিয়ে ছবির কথা মনে করায় দেই।

– ভাইয়া, আমি তো ক্যাম্পাসে চলে যাবো। রাত ৮টায় বাস বঙ্গবাজার থেকে। ক্যাম্পাসের বাসে না গেলে ভোগান্তি হয়। ছবিগুলো যদি দিতেন।

– ও হ্যাঁ। তোমার ছবি না! হুম আছে তো। সুন্দর ছবি। তোমার বান্ধবীগুলো না অনেক কিউট। শোনো, সেদিন তোমার ভাবি ছিল, তাদের কার্ড দিতে পারিনি। এই নাও কার্ড, তোমার বান্ধবীদের যোগাযোগ করতে বলো। তাদের দারুন ফিগার আছে, অনেক সুন্দর ছবি হবে। তারা যেন অবশ্যই যোগাযোগ করে।

(বিরক্তির সাগরে তখন আমার ডুব। সঙ্গে মেজাজের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা। পকেট থেকে খ্যাল খ্যাল করে হেসে তিনি কতগুলো কার্ড আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন।)

– জ্বী ভাইয়া। সমস্যা নেই। দিয়ে দিবো। ওরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। কিন্তু আমাদের ছবিগুলো?

– ও ইমদাদ, শোনো ভাইয়া, তোমাদের ছবির মত সুন্দর ছবি আমি জীবনে কমই তুলেছি। এত সুন্দর হয়েছে। তোমার ওই বান্ধবীটার গালে টোল পড়ে, আরেকজন দেখতে লম্বা। সুন্দর। সুন্দর।

– জ্বী ভাইয়া (কঠিন করে বিরক্তির উপরে ইট চাপা দিয়েছি)।

– শোনো ইমদাদ, আসলে কি হয়, ছবির জন্য তো কিছু খরচ করতে হয়। তোমার ভাই এত দূর থেকে ক্যাম্পাসে গেলো, তোমাদের সারাদিন সময় দিলো। খরচ ছাড়া কি আর ছবি পাওয়া যায়?

– ও (পাংসু হয়ে গেলো আমার হাস্যোজ্জল মুখ)। তাই? আমি তো জানতাম না। আপনি বলেছিলেন দিবেন (গলার স্বরটাও কখন যে মিনমিনে হয়ে গেলো বুঝতেই পারিনি)।

– হুম। তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো। হ্যান্ডসাম ছেলে। এইটুকু ‘কমন সেন্স’ নেই তোমার?

– আচ্ছা। (ততক্ষণে কমনসেন্সের সঙ্গা গুলিয়ে ফেলেছি।) আচ্ছা ভাইয়া, কত দিতে হবে? মানে আমরা স্টুডেন্ট তো। বুঝতেই পারছেন। আপনি কষ্ট করে গিয়ে ছবি তুলে দিয়েছেন।

– আমার ছবিতে আসলে অনেক টাকা আসে, বুঝছো? (আরেক দফা ফিরিস্তি, কে কবে কোন ছবির জন্য কত টাকা দিয়েছে। হিসেব করলে মোটামুটি রাজধানীতে কয়েকটা ফ্ল্যাট হয়ে যাওয়ার কথা সেসব টাকা দিয়ে)। তুমি এক কাজ করো, সব ছবিগুলোর জন্য হাজার পাঁচেক টাকা দিও।

– অ্যাঁ, পাঁচ হাজার (পল্টনের মোড় তখন আমার কাছে বুড়িগঙ্গার কালোস্রোত। আমি একটা ডুব দিলে শান্তি পেতাম)। আচ্ছা ভাইয়া, কোনো সমস্যা নেই, আমি আজ টাকা আনিনি তো। এর পরে টাকা এনে ছবি নিয়ে যাবো। আমি এখন ক্যাম্পাসের বাস ধরবো। মাত্র ১০ মিনিট বাঁকি। আপনি ভাবিকে নিয়ে আরেকদিন আসিয়েন।

– ও শোনো, তুমি কিন্তু সামনের সপ্তাহেই আসবা। আমি ছবিগুলো সুন্দর করে এডিট করে রাখবো। আর আরেকদিন আমার এক বান্ধবীকে নিয়ে আসবো তোমাদের ক্যাম্পাসে।

– অবশ্যই ভাইয়া ( মনে মনে গুষ্টি গুনি কিলানোর জন্য)। আজ আসি।
পল্টন মোড় থেকে রিকসা নিলাম। ক্যাম্পাসের বাস ধরতে হবে।

***

খুব সকালে সেই ফটোগ্রাফারের ফোন।
– ইমদাদ, তুমি কি এখনো ক্যাম্পাসে আছো? আজ তোমাদের অ্যালামনাইয়ের পুনর্মিলনী। আমি আসবো। তুমি কি হলো আছো? হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো, (নেটওয়ার্ক এর এত প্রবলেম?)
সাত সকালে আর তাকে বোঝাতে চাইনি, আমাদের অনার্স-মাস্টার্স মিলিয়ে কয় বছর? লাইনটা কেটে দিলাম।