ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

শৈশব, কৈশোর আর যৌবন। যেন চোখের সামনে পার হয়ে গেল সব। বয়সের হিসেবে যৌবনের দুরন্ত সময় এখন। নাটোরের বড়াল নদীর তীরে এক অখ্যাত পাড়াগাঁয়ে বাড়ি আমাদের। কৃষক বাবার একান্নবর্তী পরিবারে দু ভাই আর এক বোনের সংসারে আমি ছোট। সংসারের সম্পদ বলতে আছে অল্প কিছু জমি। তাতেই চাষাবাদ। সাথে বর্গা নেওয়া আরো কিছু জমি। তাতেও যখন হয় না, তখন অন্যের জমিতে চলে বাবার কামলাগিরি।

হেমন্তের শেষ দিকে গ্রাম জুড়ে চলতো নবান্ন উৎসব। শান্তা চাচা, মফিজ খালু বা ফরহাদ ভাইদের জমিতে তখন ধান কাটার ধুম। যেন পুরো এক উৎসব। খুব সকালে জমিতে কাস্তের ‘খ্যাস খ্যাস’ শব্দে চলত ধান কাটার হিড়িক। কে কত দ্রুত কাটতে পারে ধান, তা নিয়ে হত অলিখিত এক প্রতিযোগিতা। বেলা বাড়ার সাথে কুদু চাচার মহিষের গাড়িতে করে তা বাড়িতে আনা। ধান মাড়াইয়ের আধুনিক যন্ত্র আসেনি তখনো। উঠোনে মহিষ বা গরু ঘুরিয়ে চলত ধান আলাদা করার কাজ।

আমাদের আর কতটুকুই বা জমি। ওজন মাপার স্কেলে তা অল্প কয়েক মণে ঠেকে। তাই প্রায়ই দেখতাম বাবাকে অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতে। পাঁচ সদস্যের পরিবারে সব সময়ই কেউ না কেউ অতিথি হয়ে থাকত, মায়ের কূলের নয়তো বাবার কুলের। সাথে তিন ভাই-বোনের পড়ালেখার খরচ। সবকিছু সামলে নেওয়া বাবার পক্ষে সহজ ছিল না মোটেও।

স্কুলের পাঠে কেবল টু-থ্রি ক্লাসে পড়ি তখন। শিক্ষা উপকরণ ছিল রঙিন স্লেট, লাল রঙের টুবি-থ্রিবি পেন্সিল আর মহানগরের মোটা খাতা। সব মিলিয়ে ১৫-২০ টাকা লেগে যেত তাতে। সপ্তাহে হাট বসতো দুদিন- মঙ্গল আর শুক্রবার। আমার জন্য তা খুশির দিন। বাবার সাথে বাজারে গেলে গুড়ের মোয়া আর ‘দাঁতভাঙা’ নামের খাবার পাওয়া যেত। সাথে সুযোগ মতো আমার খাতা-কলম। তাই হাটবার এলেই তাই বাবার পিছনে পিছনে ঘুরতাম। কিন্তু হাটের দিন বাবার মুখটা মলিন থাকত প্রায়ই। মোটা চাল, তরিতরকারি, আর কখনো পাঙাশ বা সিলভার কার্প মাছ। বেশিরভাগ হাটের দিনে আমার খাতা-কলমের স্বপ্ন পূরণ হত না। বাবা বলতেন, সামনের বার ঠিকই কিনে দেব।

কচি হৃদয়ে মন খারাপের ছায়া। মুড়ি-মুড়কি খেতে খেতে বাজারের ব্যাগ কাঁধে বাড়ি ফিরতাম। প্রাইমারি, হাইস্কুল বা কলেজ, বেশিরভাগ সময়ই তো কাটল অপূর্ণ স্বপ্ন লালন করে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও। সহপাঠীদের সাথে এক্সকারসন কিংবা যে কোন ছুটিতে ঘুরতে বেরিয়ে পড়া সিলেটের জাফলং কিংবা সুন্দরবন- তাও তো হয়ে ওঠেনি।

হাসিমুখে বাবার কত স্বপ্ন বিনির্মাণ, বড় হলে সব পাবি দেখিস। এত ভাল কিছু পাবি, তখন আর এসব মনেই থাকবে না। স্বল্প শিক্ষিত বাবার চোখে-মুখে দেখতাম আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নের ঝিলিক।

কত ঈদই তো আসে যায়। সেই সময়ের ঈদের কথা ভুলতে পারি না এখনো। এক মাস রোজা শেষে পশ্চিমাকাশে চাঁদ দেখা দিলে শুরু হত এলাকার ছেলে-মেয়েদের আতশবাজি ফোটানো, হই-হুল্লোড় আর ঈদ এলো ঈদ এলো রে গানের কোরাস। এখন মনে হয়, সে সময় কেবল নীরব আর নিস্তব্ধ ছিল আমাদের পরিবারেই। রাত পোহালেই ঈদ। নতুন জামা তো দূরের কথা, সামান্য সেমাই-চিনি কেনার জন্য দরকারি একশ টাকাও কেন জানি জোগাড় হচ্ছিল না।

ল্যাম্পের কালি ওঠা আলোয় আমি পড়ার টেবিলে চুপচাপ, যেন স্থির। বাবা এসে পাশে বসলেন, ‘কি লাগবে তোর।’ বাবার মুখের দিকে তাকানোর সাহস ছিল না সে সময়। বললাম, কিচ্ছু লাগবে না বাবা। হাউমাউ করে কেঁদে উঠি। বাবা আগলে ধরেন বুকের মাঝে। বলে উঠেন, পাগল ছেলে। তুই একদিন ব্যাগ ভর্তি করে সবার জন্য শপিং করবি, ভ্যান ভর্তি করে বাজার নিয়ে আসবি। আর কটা দিন, দেখতে দেখতে চলে আসবে দেখিস।

ঘুম থেকে উঠে সকালে ঠিকই আমাদের সবার নতুন জামা-কাপড় পেয়েছি। আর ঈদের প্রয়োজনীয় বাজারও এনেছিলেন বাবা। রাজ্যের দুঃখ নিয়ে ঘুমানো এই আমি সকালে প্রিয় জুতা পেয়ে এত খুশি হয়েছিলাম যে আর কখনো এত খুশি হয়েছিলাম কি না মনে পড়ছে না।

আমার বাবা, স্বপ্নচারী একজন ব্যক্তি। স্বপ্ন লালন করতেন আর আমাদের ভাই-বোনদের মাঝে তা বিলিয়ে দিতেন। ছোটবেলায় বাবার চারপাশে ঘুরঘুর করতাম। বাবা গরুর লাঙল নিয়ে হই হই, ডানে ডানে, বামে বামে, থাম থাম করে উর্বর জমি চাষ করতেন। ঘামে নেয়ে পড়তো সারা শরীর। বাড়ি থেকে মাথায় করে বাবার জন্য ভাত আর পানি নিয়ে যেতাম। বিশ্রামের সময় বাবা খেতেন আর গল্প করতেন। খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতাম। ভাবতাম, বাবা এত জানেন কি করে?

পড়ালেখা শেষে আজ চাকরি করি। ব্যস্ততা এতই বেশি যে এক ঈদে ছুটি পেলে অন্য ঈদ কাটে অফিসেই। আজ সত্যিই ব্যাগ ভর্তি করে সবার জন্য শপিং করি। বাবার জন্য কয়েক প্রস্থ কাপড় কিনি, একটা পছন্দ না হলে অন্যটা পড়বেন। আর ঈদের বাজারসহ সংসারের প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের বাড়তি যোগান তো থাকছেই। এখন চাইলেই কিনতে পারি অনেক কিছু, ইচ্ছে হলেই ঘুরতে যেতে পারি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে। কিন্তু ছোটবেলায় ঘুম  থেকে জাগার পরে দেড়শ টাকার রঙিন জুতা পাওয়ার যে আনন্দ, সেই আনন্দের সিকিভাগও মনে টের পাই না।

বাবা আজ বয়সের হিসাবে ভর সন্ধ্যায়, শশ্রুমণ্ডিত দাঁড়ি তাঁর। ইবাদত-বন্দেগীতেই সময় কাটে। চেয়ে থাকেন পথপানে, কখন ছেলেমেয়ে বাড়িতে আসে? বাবা কি আজো আমাদের দেখেন? সেই ছোটবেলার শুভ্রদের (আমার ডাক নাম শুভ্র) বড় হয়ে যাওয়া, তরতর করে পরিণত হয়ে ছোট্ট বাবুদেরই আবার বাবা হওয়া? চাইলেই বাবা এখন শুভ্রদের দেখতে পারেন না, ছুঁয়ে দিতে পারেন না ছোট ছোট নাতি-পুতিদের। বাবার হৃদয়টা কি পুড়ে যায়, যেভাবে ছোটবেলায় পুড়ত শুভ্রদের আবদার পূরণ করতে না পারায়? আচ্ছা, বাবারা কি সারাজীবনই এভাবে পোড়েন?

এখন ঈদ এলেই মনে ভয় জাগে, ছুটি পাবো তো! নানা কাজে, নানা অসুবিধায় দেশের বাড়িতে আর যাওয়া হয় না। ঈদের সময় হুহু করে মনটা। সবার কথা মনে পড়ে যায়। আজ ব্যস্ত এই মেগাসিটিতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি নিজের পোশাকের জৌলুশ। মনে পড়ে ছোটবেলার পাওয়া না পাওয়ার ঈদের কথা। পুরনো পাঞ্জাবি টেনেটুনে ঈদগাহে যাওয়ার স্মৃতি। এসব মনেও থাকবে সারা জীবন।

মাকে মনে পড়ে যায়, মনে পড়ে বাবাকেও। কত ঈদ আসে, আসে কত বাবা দিবস, মুখ ফুটে তো কখনই বাবাকে বলা হয় না- বাবা, মিস করি তোমাকে। ভালোবাসি। নিজেকে প্রশ্ন করি, বাবার যা বলেছিলেন- সব পাবি, পেয়েছি কি সব? চাইলেই যে বাবাকে দেখতে পারি না, ছুঁতে পারি না মাকে। এটাকে কি সব পাওয়া বলে?