ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

আজকের ছাত্র আগামী দিনের কর্ণধার। তারাই ভবিষ্যতে দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিবে, নতুন দিকের পথ দেখাবে। প্রতিবন্ধকতার দেয়াল টপকে সম্ভাবনার পথ উন্মোচন করবে। একারণে ছাত্রাবস্থায় থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম, কম্যুনিটি সার্ভিস, মানবসেবা, স্বেচ্ছ্বাসেবীমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়া উচিত।

এসব কার্যক্রমের জন্য সর্বোত্তমপন্থা ছাত্ররাজনীতি। কারণ ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমেই এসকল কাজের চর্চা হয়ে থাকে। আদর্শ ছাত্ররাজনীতির অন্যতম অনুষঙ্গ মানবসেবা ও জনকল্যাণে কর্মসূচী গ্রহণ করা। এটা নেতৃত্বের বিকাশে খুবই ইতিবাচক। সাম্প্রতিক কালের কলুষিত ছাত্ররাজনীতির কারণে ভিন্ন কথা হয়তো উঠতে পারে। আপাতত ইতিবাচক দিকটাই পর্যালোচনা করছি।

ছাত্ররাজনীতির উপযুক্ত ক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে মুক্তচিন্তা লালন ও পালনের উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান। এপরিবেশকে কাজে লাগিয়ে একজন শিক্ষার্থী ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যারা পরবর্তী জীবনে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে কিছু ইতিবাচক চিন্তা লালন করে, বিশ্ববিদালয়ে ছাত্ররাজনীতিচর্চার মাধ্যমে সে চিন্তার প্রাথমিক প্রয়োগ ঘটাতে পারে। আমাদের অতীত ছাত্ররাজনীতি সে শিক্ষাই দিয়ে থাকে।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বই এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এদেশের ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল অগ্রগামী। সেসময় অন্যরা তাকিয়ে থাকতো ছাত্রসমাজের গৃহিত কর্মসূচীর দিকে। পরে অন্যরা এসে সে আন্দোলনে যোগ দিতো মাত্র। আন্দোলনের বেগের পূর্ণতা পেত। সফল হতো দাবি আদায়ের সংগ্রাম।
একবিংশ শতাব্দী আমরা অতিক্রম করেছি আজ।

এখন ডিজিটাল যুগ। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াও চলছে পুরোদমে। চারিদিকে এখন তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার। মানুষ এখন আর শুধু নিজেকে নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়। চারপাশ অতিক্রম করে সে চিন্তার জগৎ আজ মহাবিশ্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষত তরুণ সমাজ ফেসবুক, গুগল, টুইটার, অর্কুট, ব্লগ, ইমেইল প্রভৃতি বিকল্প মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে গোটা বিশ্বের সঙ্গে। যেকোন ইতিবাচক চিন্তা ভাবনার স্বতস্ফূর্ত প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তা বাস্তবায়িত হয়ে যায়। বলা যায় আজকের তরুণ সমাজ অনেক আপডেট, সময়ের সঙ্গে তাদের জ্ঞানের ধারাও সমান্তরাল। এটা খুবই আশার একটি দিক।

এই সময়েই যদি আমাদের সম্ভাবনাময় ছাত্ররাজনীতির দিকে তাকাই তাহলে কলুষিত একটি দৃশ্য দেখতে পাবো। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধমে যেখানে ছাত্ররাজনীতির উজ্জল ধারা বিকশিত হওয়ার কথা, সেখানে তারা আরো সঙ্কুচিত। ছাত্ররাজনীতি মানেই বিশেষ একটি দলের লেজুড়বৃত্তি করা, বিশেষ কোন নেতার রাজনৈতিক এসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করা। চলমান প্রেক্ষাপটের ছাত্ররাজনীতি বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যেই আমার এ লেখনি।

এই সময়ে ছাত্ররাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্যকোন ছাত্র সংগঠনের অস্তিত্ব খুঁজতে মাইক্রোস্কোপ লাগবে। ঠিক আছে, অন্যান্য ছাত্র সংগঠন যেমন ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করেছে, ছাত্রলীগও একই ধারা বজায় রেখেছে। যদিও ঐতিহ্যবাহী এ ছাত্রসংগঠনটির কাছ থেকে এটা অপ্রত্যাশিত।

তবুও আওয়ামী সরকারের সময়ে এ ছাত্রলীগ দেশ ও জাতির উন্নয়নে, প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়তে, নিরক্ষরতা দূরীকরণে কতটুকু ভূমিকা রাখছে এটাই এখন বিবেচ্য বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মুক্ত চিন্তার লালন করবে, মুক্তভাবে পর্যালোচনা করবে। দেশের উন্নয়নে কর্মসূচী ঘোষণা করবে। অথচ বাংলাদেশের বৃহৎ ও সবচেয়ে প্রাচীন এ ছাত্রসংগঠনটি নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। এর কারণ প্রতিপক্ষ কোন ছাত্র সংগঠন নয়, বাইরের কোন শত্রু নয়, নিজেদের শুভাকাঙ্খীরুপী (!) কতিপয় স্বার্থন্বেষীমহল।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে প্রগতিশীল ভাবধারায় মুক্তধারার ছাত্ররাজনীতির চর্চা হয়ে থাকে। সব সরকারের রাজনৈতিক সময়েই এ ক্যাম্পাসটিতে সকল ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ বছরের ইতিহাসে বর্তমান আওয়ামী সরকারের সময়ই ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রদলকে বিতাড়ন করে। শুরু হয় নতুন নগ্ন এক রাজনীতির। ক্যাম্পাসের আপামর জনসাধারণ যে বিষয়ে কখনও চিন্তাও করতে পারেনি, তারা তাই দেখলো। ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত প্রায় দু‘শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত।

ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগও যে সুবিধা মতো জায়গায় আছে, বিষয়টি তেমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ হাজার শিক্ষার্থীর অভিভাবক (!) উপাচার্য যখন নিজ মর্যাদা ভূলে, নিজের দায়িত্ব অস্বীকার করে, বিশেষ একটি রাজনৈতিক স্বার্থে কতিপয় অঞ্চল ও গ্রুপ ভিত্তিক ছাত্রদের একটি গ্রুপকে ছাত্রলীগের নামে পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তখন দু:খ প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। এ ক্যাম্পাসে আর কিছু করারও উপায় অবশ্য নেই। তাহলে ভাগ্যে জুটবে বহিষ্কার।

ভাবতে অবাক লাগে, বর্তমান আওয়ামী সময়েই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাতীয় নেতৃত্ব তৈরীকারী একটি প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগেরও রাজনীতি নিষিদ্ধ! এ সংগঠনের প্রায় দু‘শতাধিক নেতা-কর্মীরাও ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত। তারাও নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত। তাদের স্বাভাবিক ছাত্রত্ব থেকে বিচ্যূত। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের অনিচ্ছায় তারা মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারেন না। হাইকোর্টের আদেশ, নির্দেশও বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আওয়ামী কর্তাদের কাছে নগন্য। তাঁরা যা ভালো মনে করেন, তাই করেন। কাউকে মানে না, দল দেখেন না, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও তাদের কাছে গৌণ। তাহলে কি তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেই ভূল করেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করাই কি তাদের অপরাধ, শেখ হাসিনার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করার মানসিকতাই তাদের জন্য কাল ?


হায় সেলুকাস, হায় বিচিত্র এ দেশ! ধিক! ধিক, এদেশের রাজনীতি! ধিক, এদেশের প্রশাসন ব্যবস্থার! আর কটা শিক্ষার্থীর মতো ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত শিক্ষার্থীরাও এক বুক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন এ ক্যাম্পাসে। তাদেরও ছিল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় পরিকল্পনা। তাদের পিতা-মাতা, অভিভাবকগণ আজও বাড়ি থেকে চেয়ে থাকেন, তাদের সন্তান বড় কিছু হবে, তাদের মুখে হাসি ফুটাবে। তাদের দু:খের দিন ঘুচাবে। তাদের আগমনে সংসারের ছোট ভাইবোনের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠবে বাড়ির আঙ্গিনা। কিন্তু ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত শিক্ষার্থীরা কোন মুখ নিয়ে বাড়ি ফিরবে?

ক্যাম্পাসে সংঘটিত একটি সংঘর্ষের ঘটনায় তারা আজ বহিষ্কৃত! আদালতের বহিষ্কারাদেশও প্রশাসন থোরাই কেয়ার করে। একারণে মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারেননি অনেকে। আওয়ামী সরকারের আমলে যদি আওয়ামী মনোনীত উপাচার্য দ্বারাই এরা ২বছর কিংবা সারাজীবনের জন্য বহিষ্কৃত হন, তাহলে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকলে এদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হতো? হয়তো বা ফাঁসিই দিয়ে দেওয়া হতো!

গত বছরের ৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের আল বেরুনী হলে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। বলা হয়, উপাচার্য আগের দিন রাতে একটি পক্ষকে বাসায় ডেকে সংঘর্ষের ইন্ধন দিয়েছেন। এমনকি মারামারির সময় উপাচার্য উপস্থিত থেকে বলেছেন, মারামারি তোরা কর, বিচার করবো আমি। এ ব্যাপারে একাধিক তথ্য প্রমাণও রয়েছে।

তাহলে ব্যাপারটি কি দাঁড়ায়, ছাত্রলীগের রাজনীতি করলেই হবে না, ব্যক্তি পূঁজা করতে হবে। এখানে দলীয় কোন ব্যাপার দেখা হয়না, ব্যক্তিস্বার্থ বিবেচনা করা হয়। তাহলে যারা ছাত্রলীগের রাজনীতি করতে ইচ্ছুক, তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিসর্জন দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামূল কবিরের আদর্শ চর্চা করলেই হবে। তাহলেই নির্বিঘ্নে ছাত্রজীবন শেষ হবে। উপাচার্যের দয়া হলে ক্যাম্পাসে জুটতে পারে প্রশাসনিক অফিসার অথবা নিরাপত্তাকর্মীর চাকরী।

ঢাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ছাত্ররাজনীতির এরকম দৈন্যদশা দেখে আশ্চর্য হতে হয়। তাহলে কোথা থেকে তৈরী হবে আমাদের জাতীয় নেতৃত্ব? একরাশ প্রশ্নমালা শুধু উত্তর খূঁজে ফেরে।