ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। ছাত্ররাজনীতি বিহীন বর্তমান ক্যাম্পাসের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্টের পেছনে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সাধারণ শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শিক্ষার্থীদের মাদক গ্রহণে প্ররোচনা, জমি দখল, প্রার্থীদের টাকা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোর করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের কাজে সম্পৃক্তকরণ, চুরিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে এসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি মীর মশাররফ হোসেন হল, মওলানা ভাসানী হল, কামাল উদ্দিন হল, রফিক-জব্বার হলে মাদক সেবনের হার আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিয়মিত কিছু সেবনকারীর সঙ্গে প্রতিদিনই যোগ দেন নতুন ছাত্ররা। জুনিয়রদের রুম অথবা ছাদে বসে গাঁজা, হেরোইন ও মাদক সেবনের আসর। প্রায় প্রতিমাসেই হলের বিভিন্ন রুম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ৫/৬টি মোবাইলফোন। এছাড়া একাধিক ল্যাপটপ চুরির ঘটনাও ঘটছে। হলের মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীরা মাদকের পেছনে অর্থের জোগান দিতে চুরির পন্থা অবলম্বন করছেন বলে দাবি সাধারণ শিক্ষার্থীদের। মাদকাসক্ত টিম দেখাশোনা করেন ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগের কর্মী মুরগি চোর খ্যাত ও সাংবাদিক নির্যাতনকারী সম্রাট, রাজিব, মিশুক, রাহাত, চয়ন, অর্ণব, ফেরদৌস, মিঠুন। গত ১১ জুলাই ঘুমের ওষুধ না দেয়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মওলানা ভাসানী হলের ছাত্রলীগ কর্মী অর্ণব ওষুধের দোকানে ভাঙচুর এবং দোকানিকে মারধর করেছে। ওই দিন রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেট সংলগ্ন মার্কেটের মুনমুন ফার্মেসিতে গিয়ে এক পাতা ঘুমের ট্যাবলেট দাবি করে মওলানা ভাসানী হলের ইভটিজিংয়ের দায়ে স্থগিত বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ কর্মী জাহাঙ্গীর আলম অর্ণব। দোকানি সোহাগ ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ঘুমের ওষুধ দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় অর্ণবসহ আরো কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী দোকানের অন্যান্য ওষুধ বাইরে ফেলে দেয় এবং লাথি মেরে কাচ ভাঙচুর করে। তারা দোকানি সোহাগকেও মারধর করে। এ ঘটনায় অন্যান্য দোকানিরা প্রতিবাদ স্বরূপ তাদের দোকান বন্ধ করে দেয়। পরে মওলানা ভাসানী হলের মাদকসেবীদের প্রশ্রয়দানকারী ছাত্রলীগ নেতা আসগর আলী ঘটনাস্থলে এসে প্রান্তিক দোকান মালিক সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং অন্য দোকানিদের অকথ্য ভাষায় অশ্লীল গালিগালাজ করে এবং এই মুহূর্তে দোকান না খুললে মারধর করার হুমকি দেয়। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. আরজু মিয়াসহ প্রক্টরিয়াল বডির অন্য সদস্যরা ঘটনাস্থলে হাজির হয়। তারা দোকানিদের কোনো অভিযোগ না শুনেই দোকান খোলার নির্দেশ দেয়। দোকানি সোহাগ সাংবাদিকদের বলেন, আপনাদের কাছে বলেও কোনো বিচার পাব না। আমাদের আসলে কোনো স্বাধীনতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কাছে আমরা খুবই অসহায়। ভাসানী হলের ছাত্রলীগ নেতা আসগর আলী প্রান্তিক গিয়ে দোকানিদের বলেন, যদি কেউ দোকান বন্ধ করে তাহলে তার হাত-পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক আরজু মিয়া দোকানিদের বলেন, আপনারা দোকান খোলেন, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। উল্লেখ্য, ইভটিজিংয়ের দায়ে গত ২২ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বিধিমালার ৪ ও ৫ নং ধারাবলে অর্ণবকে এক বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে প্রশাসন। এছাড়া তাকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। ভাসানী হলের জুনিয়র ছাত্রলীগ কর্মীরা জানান, অর্ণব মাদকসেবী এবং সে নেশা করার জন্য ঘুমের ওষুধ কিনতে প্রান্তিকে যায়।

ছাত্ররাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে হলের নতুন শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালান সিনিয়র কর্মীরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বছরের শুরুর দিকে মিরপুর গিয়ে স্থানীয় এক নেতার পক্ষে টোকাই, রিকশাচালক ও দিনমজুরদের সঙ্গে মিছিল করতে বাধ্য করেন হলের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। বছরের মাঝামাঝি সময়ে হল থেকে কিছু ছাত্রকে সাভারের পাশে একটি খোলা ময়দানে নিয়ে যাওয়া হয়। ৩০-৪০ জন লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের তাড়া করলে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেন এক লোকের জমি দখল করে দেয়ার জন্য তাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

সম্প্রতি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলাচলকারী বাস থেকে অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজি শুরু করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হেলপার, সুপারভাইজারদের ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনাকে পুঁজি করে চাঁদাবাজি করা হয়। অনেক সময় ছাত্রলীগের জুনিয়র কর্মীদের শিখিয়ে দিয়েও এরকম ঘটনা ঘটানো হয় বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জুনিয়র কর্মী।

গত ২০ মে ঢাকা যাওয়ার সময় মীর মশাররফ হোসেন হলের ছাত্র মাহমুদ আল জামানের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয় আনন্দ সুপার পরিবহনের একটি বাস। এতে তিনি আহত হন। পরে মালিক পক্ষের সঙ্গে ৫০ হাজার টাকায় বিষয়টি সমঝোতা করা হয়। ২৩ মে প্রক্টর অফিসে বাসের মালিকপক্ষের একজন প্রতিনিধি ৪৫ হাজার টাকা মাহমুদের হাতে তুলে দেন। মাহমুদ হলে ফেরার পর ছাত্রলীগের সিনিয়র কর্মী মোল্লা আলমগীর হোসেন অমি ১৮ হাজার টাকা মাহমুদকে দিয়ে বাকি টাকা নিয়ে নেন। পরে সেই টাকা তিনিসহ বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্রলীগ নেতা এসএম শামিম ও হলের ৩/৪ জন ছাত্রলীগ কর্মী ভাগাভাগি করে নেন। মাহমুদ বিষয়টির প্রতিবাদ করেন। এছাড়া বিষয়টি ক্যাম্পাসে জানাজানি হলে ছাত্রলীগ কর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে গত ২৩ জুন রাতে মাহমুদকে মারধর করে হল থেকে বের করে দেয়। পরে হল প্রাধ্যক্ষ মাহমুদকে হলে তুলে নেয়ার আশ্বাস দিলেও হলের আবাসিক শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর সাব্বির আলমের সহযোগিতায় হলের ছাত্রলীগ কর্মীরা তাকে হলে উঠতে দেয়নি।

সম্প্রতি আনন্দ সুপার পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মীর মশাররফ হোসেন হলের মাজহার নামের এক ছাত্রলীগের কর্মীর সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝামেলার সূত্র ধরে ক্যাম্পাসে বাস আটকানো। সে সময় ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে ঘটনার মীমাংসা করা হয়। পরবর্তী ওই টাকার ভাগাভাগি নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয়। এরও আগে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক ছাত্রের কাছ থেকে গ্রীণওয়ে পরিবহনের একটি বাসের হেলপার মোবাইল ও টাকা ছিনতাই করেছে অভিযোগ করা হয়। পরে বাস আটকিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়।

এদিকে দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান কিংবা পরিকল্পিতভাবে কাউকে মারধরের আগে মদ থেরাপি ও নৈশভোজের আয়োজন করেন সিনিয়র ছাত্রলীগ কর্মীরা। মাহমুদকে মারধরের আগে ২৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইজারা দেয়া একটি লেক থেকে অবৈধভাবে প্রায় তিন মণ মাছ ধরে মীর মশাররফ হোসেন হলের ৪৫/৫০ কর্মীকে নৈশভোজ করানো হয়। লেকের ইজারাদার নুরুল ইসলাম জানান, মীর মশাররফ হোসেন হলের ছাত্রলীগ কর্মীরা প্রায় ৩ মণ মাছ ধরেছে।

এদিকে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কাজে লাগিয়ে টাকার বিনিময়ে চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদপ্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় জোর করে সাধারণ ছাত্রদের ব্যবহার করছেন হলের সিনিয়র কর্মীরা। গত ২৯ জুন অনুষ্ঠিত সাভার উপজেলা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে একজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর সঙ্গে হলের ভোট পাইয়ে দেয়ার আশ্বাসে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার টাকায় সমঝোতা হয় বলে জানা গেছে। এদিকে সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার পদপ্রার্থী মো. মানিকের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ২৫ জুন জনসেবা পরিবহনের একটি বাসে করে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীকে ভাকুর্তা নিয়ে যান ছাত্রলীগ কর্মীরা। সেখানে পৌঁছানোর পর একটি বাড়িতে ঘটা করে শিক্ষার্থীদের বিরিয়ানি খাওয়ানোর পর স্থানীয় সমর্থকদের সঙ্গে করে শিক্ষার্থীদের দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হয়। তবে মীর মশাররফ হোসেন হলের শিক্ষার্থীরা ওই ইউনিয়নের ভোটার নন। ছাত্রলীগ কর্মী লিটন, মইন, শরিফসহ ৪/৫ জন এ সকল প্রচারণায় সাধারণ ছাত্রদের বাধ্য করেছেন বলে জানা গেছে। তবে ছাত্রলীগ কর্মীরা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এছাড়া চাঁদার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংস্কার কাজও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের চলা সংস্কার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ১৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫শ টাকার বরাদ্দের সংস্কার কাজ এখন বন্ধ আছে। মীর মশাররফ হোসেন হলের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দাবি ক্যাম্পাসের আদু ভাই ছাত্রলীগের কথিত নেতা আসগর আলী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স নয়ারহাট ট্রেডার্সের কাছ থেকে ২৬ হাজার চাঁদা নিয়েছেন। ফলে এই হলের বঞ্চিত নেতাকর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেন। তবে আসগর আলী পাল্টা অভিযোগ করে দাবি করেন, মীর মশাররফ হোসেন হলের ছাত্রলীগ কর্মীরাই চাঁদার দাবিতে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। চাঁদার দাবিতে বটতলায় এক খালার দোকান বন্ধ করে দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে । কামাল উদ্দিন হলের ছাত্রলীগ কর্মীরা বাবুল ও মোস্তাফিজের নেতৃত্বে ১৫ হাজার টাকা দাবি করে দোকান বন্ধ করে দেয়ার জন্য হুমকি দেয়।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগ জাবি শাখার সভাপতি রাশেদুল ইসলাম শাফিন বলেন, ক্যাম্পাসে অবস্থানরত ছাত্রলীগ নামধারী কিছু সন্ত্রাসী এসব অপকর্ম করছে। তিনি এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এসব বিষয়ে একাধিক অভিযোগ থাকলেও বিষয়টির খোঁজ নেয়া হচ্ছে বলেই দায় এড়িয়ে যান হলের প্রাধ্যক্ষ ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আরজু মিয়া বলেন, নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শরীফ এনামুল কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে ফোন কেটে দেনে। চেষ্টা করেও তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।

***
লেখাটি ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে: www.shaptahik.com