ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

খুনি ধর্ষকের বিচার চাই, এই ক্যাম্পাসে তাদের ঠাঁই নাই, ধর্ষকের আস্তানা, এই ক্যাম্পাসে রাখবো না। প্রভৃতি স্লোগানে বারবার প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন। একসময় উপাচার্য ক্রুদ্ধ হয়ে অফিস থেকে বের হয়ে আসলেন। উত্তেজিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কে ধর্ষনের শিকার হয়েছো? মুহূর্তেই পিনপতন নীরবতা। একটু পর একটি হাত জেগে ওঠে, তারপর আরেকটি, এভাবে উঠে আসে সবগুলো হাত। সমস্বরে প্রতিধ্বনিত হয়, আমি ধর্ষণের শিকার হয়েছি। ধর্ষণের বিচার চাই। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনের একটি চিত্র একটি।

২০১১ সালে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ ও সচেতনতায় যৌন নিপীড়নে ধর্ষণের ঘটনা না ঘটলেও অহরহ ঘটছে ইভটিজিংয়ের ঘটনা। মাত্র পাঁচ মাস হলো ক্যাম্পাসে এসেছি। এর মধ্যেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ১০/১৫ বার ইভটিজিং এর শিকার হতে হয়েছে। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। এর মধ্যেই আমার এক ফুফাত ভাই ক্যাম্পাসে বেড়াতে আসলে ক্যাম্পাসে আসার অপরাধে তাকে মারধর করে রক্তাক্ত করে ৭/৮ জন। ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয় দিয়ে তারা ক্যাম্পাসে পুনরায় না আসার নির্দেশও দেয় ভাইয়াকে। বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সুখপ্রিতা (ছদ্মনাম) এভাবেই কথাগুলো বললেন। প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর প্রতিনিয়ত ইভটিজিং করেও ক্ষান্ত হননি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ছাত্রলীগ কর্মীরা বরং ক্ষোভ মেটাতে ওই ছাত্রীর এক আত্মীয়কে রক্তাক্ত করলেন তারা। গত ১৪ মে মুন্নি চত্বরের ঘটনা এটি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গেসঙ্গে পাল্টেছে যৌন নিপীড়নের ধরণ। ঘটছে সারা দেশেই । তবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সাহসী উচ্চারণ উচ্চারিত হয়েছিল প্রথমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই। এখনও প্রতিবাদের ধারা অব্যাহত। তবে প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক ভূমিকায় বারবারই পার পেয়ে যায় অভিযুক্তরা।

জাবি ক্যাম্পাসের ধর্ষক প্রতিরোধকারী নারী শিক্ষার্থীরা

খুনি-ধর্ষক প্রতিরোধ দিবস
১৯৯৯ সালের ২ আগস্ট। নতুন দিনের সকাল দেখাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ ধনুর্ভঙ্গপণ লড়াইয়ে। পুরো নব্বই দশক জুড়ে যে বিশ্ববিদ্যালয় অন্যায়-রক্ষণশীলতা-শোষণ-শাসন-প্রতিবন্ধকতা-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনকে নতুন রূপে গৌরবান্বিত করেছে, তার অনিবার্য পরিণতি ২ আগস্টের সেই সকাল। এদিন ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয় খুনি ও ধর্ষক গোষ্ঠী।

যৌন নিপীড়ক, রক্ষক ও এর পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে সফল এক আন্দোলনের একযুগ পূর্তি হল এ বছর। অন্যায় আর অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল দশদিক কাঁপানো এই দিনটি। ১৯৯৮ সালে কিছু ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শুরু হয় সংঘবদ্ধ আন্দোলন। ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্র ফ্রন্টসহ প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন সমুহের নেতৃত্বে ‘সাধারণ ছাত্র ঐক্য’র ব্যানারে সংগঠিত হয় প্রথম ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন। আন্দোলন চলাকালে ২৩ আগস্ট ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদকে শারিরীকভাবে লাঞ্চিত করে। ২৪ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেট সদস্য আফরোজান নাহার রাশেদা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হাতে লাঞ্চিত হন। শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য ধর্ষক-খুনিদের কবল থেকে ক্যাম্পাসকে মুক্ত করা। ২ আগস্ট সফল এক আন্দোলনের মাধ্যমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস খুনি-ধর্ষক মুক্ত হয়। তখন থেকেই ২ আগস্ট খুনি-ধর্ষক প্রতিরোধ দিবস।

যৌন নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৯৮ সালে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা ও আইনের দাবি প্রথম উত্থাপিত হয়। আন্দোলনরত ছাত্র ও শিক্ষকদের সামগ্রিক প্রচেষ্টায় নীতিমালার একটি খসড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে উত্থাপন করা হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। নীতিমালা ও আইনের দাবিতে চলতে থাকে আন্দোলন। এরপর বিভিন্ন সময় নারী নির্যাতনের ঘটনায় একই দাবি বারবার সামনে আসতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি এই খসড়াটি নিয়ে আরো সমৃদ্ধ করে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী আইন-২০১০’ নামে আইন পরিষদে জমা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উদ্যোগে মহিলা পরিষদ, নারী আন্দোলন, সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও একটি নীতিমালা গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এর কোনো অগ্রগতি আর দেখা যায়নি।

যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক যৌন নিপীড়নের ঘটনার প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১৪ মে তারিখে আদালত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্থাপিত খসড়ার কিছু সংশোধনী সংযোজনী সহ একটি নির্দেশনা জারি করে। এতে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১০ মার্চ তারিখে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রথম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই গঠিত হয় যৌননিপীড়ন বিরোধী সেল ‘অভিযোগ কমিটি’। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. খুরশীদা বেগমকে এ সেলের প্রধান করে গঠিত হয় ৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মদদপুষ্ট ব্যক্তিরা এ সেলের সদস্য মনোনীত হওয়ায় এর সুষ্ঠ ভূমিকা পালন নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়। এ সেল গঠিত হওয়ার পর প্রগতিশীল ভাবধারার এ ক্যাম্পাসে আলোচিত তৎকালীন সহকারী প্রক্টর আব্দুল্লাহেল কাফির বিরুদ্ধে উত্থাপিত নারী শিক্ষককে নিপীড়নের অভিযোগসহ বেশ কিছু অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

অধ্যাপক ড. খুরশীদা বেগম
সভাপতি
যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত একাধিক যৌন নিপীড়নের ঘটনার প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশনার আলোকে যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল গঠিত হয়। সেল গঠিত হওয়ার পর স্বাধীনভাবেই কাজ সম্পাদিত হচ্ছে। স্পর্শকাতর বিষয়ে কাজ করতে হওয়ায় এ সেলের প্রতিটি সদস্যকেই সদা তৎপর থাকতে হয়। এ দায়িত্ব নিঃসন্দেহে পরিশ্রমের ও জটিল। বাধার কথাটি প্রাসঙ্গিক হলেও এ ক্ষেত্রে এক্বেবারেই স্বাধীন ও নিজমত করতে পেরেছেন এর সদস্যরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, প্রভাবশালী মহল কিংবা অন্য কোন বিশেষ গোষ্ঠীর নগ্ন হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত পরিবেশে এ সেল তার দায়িত্ব পালন করেছে। হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে অভিযোগের আলোকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য মাত্র ৬০ কর্মদিবস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন ঝামেলায় এত অল্প সময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া যায় না। তখন হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকেই সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হয়। এ সেলের কাজ হচ্ছে অভিযোগের আলোকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

মিসেস সেলিনা আক্তার
সদস্য
যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রশাসনের প্রভাবমুক্ত পরিবেশে কাজ করছি। আপাতত কোন সমস্যা নেই। অভিযোগের আলোকেই কেবল এ সেল কাজ করে। হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে এ সেলের সভাপতি ও অর্ধেকের বেশি সদস্য নারী। একারণে কাজ করতে সুবিধা হয়। তবে মাঝে মাঝে কারিগরী ঝামেলায় পড়তে হয়। একটি অভিযোগের আলোকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষত প্রয়োজন সাপেক্ষে মোবাইলের কললিস্ট নেওয়ার জন্য মোবাইল কোম্পানিগুলোর দ্বারস্থ হতে হয়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা পেলে কাজটি করতে সহজ হয়। এ কাজের জন্য সকলের সহযোগিতামূলক মনোভাব একান্তভাবেই কাম্য।

যৌন নিপীড়নের ইতিহাস
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানির প্রথম ঘটনা ঘটে ১৯৯২ সালে। এরপর ১৯৯৮ সালে তৎকালীন ছাত্রলীগ সেক্রেটারি জসিম উদ্দিন মানিক ধর্ষণের সেঞ্চুরী করে গর্ব করে তা উদযাপন করে। এরপর যৌন হয়রানির ঘটনা এই ক্যাম্পাসে ধারাবাহিক ঘটনায় পরিণত হয়। ২০০৫ সালে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক তানভীর আহমেদ সিদ্দিক, ২০০৬ সালে বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. গোলাম মোস্তফা, ২০০৮ সালে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের তৎকালীন সভাপতি ছানোয়ার হোসেন সানি যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ২০১০ সালের মার্চে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের এক ছাত্র কর্তৃক একই বিভাগের এক ছাত্রী ধর্ষনের শিকার হন। একই বছর অভিযোগ ওঠে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সভাপতি আব্দুল্লাহ হেল কাফির বিরুদ্ধে। ২০১১ সালে ঘঠে বেশ কয়েকটি ইভটিজিংয়ের ঘটনা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তের পক্ষে অবস্থান নেয় প্রশাসন।

বর্তমান অবস্থা
যৌন নিপীড়ন সেল গঠিত হলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইভটিজিং হয়রানীর অবস্থা মোটেও সন্তোষজনক নয় । দিনদিন বেড়েই চলেছে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের ইভটিজিং সন্ত্রাস। এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় বারবারই বিতর্কিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গত ৫ মাসে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২৫ ছাত্রী ইভটিজিং এর শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাদের কাছে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করেও রেহাই পাচ্ছেন না ভূক্তভোগী এসকল ছাত্রীরা। ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় ভুক্তভোগী এক ছাত্রীর আত্মীয়সহ এক সাধারণ ছাত্রকে মারধর করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ইভটিজিং এর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে ৩টি। বিভিন্ন বিভাগের সভাপতি ও শিক্ষকদের কাছে মৌখিক অভিযোগ করা হয়েছে দুটি। বাকিগুলো ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতাদের মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের মুচলেকা অথবা স্থগিত বহিষ্কারের মতো হাস্যকর শাস্তি দিয়ে বিচারের নামে প্রহসন করেছে প্রশাসন বলে দাবি ক্যাম্পাসের সচেতন শিক্ষার্থীদের। সর্বশেষ গত ২৭ মে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের মাস্টার্সের এক ছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এক ছাত্র শারিরীকভাবে লাঞ্জিত করার চেষ্টা করে। পরদিন বিচারের দাবিতে প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী। অভিযোগের ২ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি প্রশাসন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য প্রক্টর ও উপাচার্যকে বারবার ফোন দেওয়া হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি। এছাড়া খুনি ধর্ষক প্রতিরোধ দিবসের এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জোটসহ প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণ করলে বিশেষ এক গোষ্ঠী এ কর্মসূচী বাস্তবায়নের বাধা দান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মাহি মাহফুজ বলেন, বিচারের নামে প্রহসনে যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত আবদুল্লাহেল কাফির বিরুদ্ধে আন্দোলন আবারও দানা বেধে ওঠতে পারে। এই শঙ্কায় সংশ্লিষ্ট মহলটি উদ্বিগ্ন। তারা আমাদের কর্মসূচী বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরীর চেষ্টা করছেন। এ কাজে সাংবাদিকদের অপব্যবহারের অভিযোগ করেন তিনি।

অপরিচিত নম্বর বলে
সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইভটিজিংয়ের ঘটনা মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রতিকারে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাসে পোস্টারিং করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে পরিচয় গোপনের আশ্বাস দিয়ে ইভটিজিংকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য ভুক্তভোগীদের উৎসাহিত করা হয়। এতে রেজিস্ট্রার, প্রক্টর ও মহিলা সহকারী প্রক্টরসহ ২জন সহকারী প্রক্টরের মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। কিন্তু এই নম্বরধারীর রেজিস্ট্রার, প্রক্টর ও মহিলা সহকারী প্রক্টরসহ ৩ জনই মোবাইল ফোন রিসিভ করেন না। সাংবাদিকরা এর কারণ জানতে চাইলে বলেন, তারা অপরিচিত কোন নম্বরের ফোন রিসিভ করেন না। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাজনীন বলেন, তাহলে পোস্টারে তাদের নম্বর দিয়ে ঢঙ করার কি দরকার ছিল?

ড. নাসিম আখতার হোসাইন
ধর্ষন বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী
অধ্যাপক
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

যৌন নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালাটি সকল শিক্ষার্থীর সামনে তুলে ধরতে হবে এবং এ ঘটনায় শাস্তির বিষয়টিও সবাইকে জানাতে হবে। বারবারই যৌন নিপীড়নের ঘটনায় শাসকগোষ্ঠী অভিযুক্তের পক্ষ অবলম্বন করেন। রাজনৈতিক বা অন্য কোন কারণে তাকে পৃষ্ঠপোষকতার অপপ্রয়াস চালান। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে আরো উদার হতে হবে। কার্যকরী ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো সাহস দেখাতে হবে। সম্প্রতি সারাদেশেই ইভটিজিং এর ঘটনা বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে সকলকে এর প্রতিরোধ করতে হবে। ইভটিজিং এর অভিযোগ করার পর প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময়ক্ষেপণের মধ্য দিয়ে অভিযোগকারীকে দুর্বিসহ ও ভীতিকর পরিস্থির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। তাই তাৎক্ষণিকভাবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

আনু মোহাম্মদ
ধর্ষন বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী
অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

খুনি ধর্ষক প্রতিরোধ আন্দোলন সফল হয়েছে। কিন্তু এর সফলতা পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে, প্রতিবাদে রাজপথ ও ক্যাম্পাস প্রকম্পিত হয়েছে, এখনও সন্ত্রাস বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে। এ আন্দোলনের ফলে নারী নীতিমালাও প্রণীত হয়েছে। শিক্ষক শিক্ষার্থীরাও সচেতন। সমাজে সচেতনতা বেড়েছে। সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্রতর হচ্ছে। তা সত্বেও সারা দেশে এ নিপীড়নের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এর কারণ শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা। বৃহৎ ভাবে এ আন্দোলনের পরিধি বিস্তৃত হওয়া দরকার। শাষকপক্ষের উচিত রাজনৈতিক বিবেচনার উর্ধ্বে উঠে এসকল ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

আফরোজান নাহার রাশেদা
শিক্ষাবিদ

আন্দোলনের একটি যুগ পার হয়ে গেছে। আন্দোলন এখনও হচ্ছে। তবে যৌন নিপীড়ন বন্ধ করার জন্য যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা এখনও নেওয়া হচ্ছে না। কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কর্মসূচী গ্রহণের বিষয়টি শাসকগোষ্ঠীর কারণে বারবার বিতর্কিতই থাকছে। তবে ইতিবাচক দিক হচ্ছে, মেয়েরা প্রতিরোধে এগিয়ে আসছে। রাস্তায় দাড়িয়ে মানববন্ধন করছে, স্লোগান দিচ্ছে। অভিভাবকরাও তাদের আন্দোলনে স্বতস্ফূর্ত সহযোগিতা দিচ্ছেন। তারা সমাবেশ করছেন। নৈতিক আন্দোলনে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছেন। এর কারনে অভিভাবকরা নির্যাতিত হচ্ছেন। খুন হচ্ছেন। এর পেছনে অপরাজনীতি ও অপসংস্কৃতি প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করছে। বারবার এসব ঘটনায় সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনটিই অভিযুক্ত হচ্ছে। দিনে দিনে নৈতিক অবক্ষয় এর কারণ। পালে হাওয়া দেওয়ার রাজনীতি পরিহার করতে হবে। সুষ্ঠ রাজনীতি ও সংস্কৃতি লালন করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের বিকাশ ঘটাতে হবে। নৈতিকতা অর্জনের মাধ্যমে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে।

রেহনুমা আহমেদ
ধর্ষন বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী
তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক
নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

যৌন নিপীড়ন, অন্যায় আর নোংরামির বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূচনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হয়েছিল তা এখন সারা দেশেই বিস্তৃত। এধরনের নিপীড়নের ঘটনা শুধুমাত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সারা দেশেই বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত হয়। তবে সাহসিকতার সঙ্গে প্রথম প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ হয়েছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়েই। অদম্য ভূমিকায় শিক্ষার্থীদের সাহসী ভূমিকার কারণেই খুনি ও ধর্ষক বিরোধী আন্দোলনটি সফল হয়েছিল। এর সুফল আজ সারা দেশে বিস্তৃত। এখন সারা দেশেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়। আন্দোলন হয়। শিক্ষার্থীরাও সচেতন। তারপরেও এধরণের ঘটনা বারবার ঘটে যাচ্ছে। এটি দুঃখজনক। প্রশাসনের কার্যকরী ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বাস্তবায়নই এ ক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের ঘটনা হ্রাসে সহায়তা করবে। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের পাশাপাশি আন্দোলনের ভাষাটাও আয়ত্ত্ব করতে হবে।

***
ফিচার ছবি: কামাল উদ্দিন -এর ’প্রসঙ্গঃ জাহাঙ্গীর নগর -৭ ( বিদায় )’ শীর্ষক পোস্ট থেকে সংগৃহিত [প্রথম আলো ব্লগ, ২৭ জানুয়ারি ২০০৯, ০৯:৩৯]