ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

বাংলাদেশ স্বাধীন এক দেশ। বিশ্ব মানচিত্রে পতপত করে ওড়ে হাজারো বাঙালীর গর্বের লাল সবুজের পতাকা। শ্যামল ছায়া মাখা এ দেশটি হাজারো স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন। কিন্তু স্বাধীন এ দেশটির স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রেক্ষাপটটা সুখকর ছিল না। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্ম চল্লিশ বছর আগে। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বিশ্বের মানচিত্রে নতুন স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করেছি।
দীর্ঘ এক সংগ্রামের পর বিশ্ব দরবারে আরেকটি স্বাধীন দেশ হিসেবে নতুন মর্যাদা অর্জন করে লাল সবুজের এ দেশটি। স্বাধীন এ ভু-খন্ডকে নিজস্ব পরিচয় দিতে অসংখ্য মানুষ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
পাক বাহিনীর বর্বরতা ছিল খুবই ভয়াবহ। নির্যাতনে মানব জীবনের অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পিতা, মাতা, স্বামী, সন্তান, ভাই, আতœীয়-স্বজন হারিয়ে মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। রাস্তায় মানুষ বুভুক্ষ অবস্থায় পড়ে থাকে। অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও হারিয়ে ফেলে এ দেশের জনগণ। পাক বাহিনীর বর্বরতা আর বাংলাদেশের জনগণের সীমাহীন দুর্ভোগ দেখে বিশ্ব বিবেক হত বিহব্বহল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নির্যাতিত বাংলাদেশের খবর প্রকাশিত হলে বিভিন্ন দেশ ও জাতি সহানুভুতি প্রকাশ করে। বাড়িয়ে দেয় সহযোগিতার হাত।

বিদেশীরাও পাকিস্তানের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এমনকি বিবেকের তাড়নায় অংশ নেয় স্বাধীনতা যুদ্ধে। নিজের জীবনকে বিপন্ন করে, নিজ সংসারের মায়া ত্যাগ করে বাংলাদেশ কে পাক হানাদারদের ভয়ংকর থাবা থেকে মুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে। মাতৃভুমি ছাড়া অন্যদেশের পক্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহনের মতো ঘটনা ইতিহাসে বিরল।

পৃথিবীতে এমন উদাহরণ সৃষ্টিকারী বীরের সংখ্যা খুবই কম যে, যাদের স্বাধীনতার তীব্র বাসনা প্রতিপক্ষের দমন-নিপিড়ন থেকে মুক্ত করে বিজয় ছিনিয়ে এনে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এজাতীয় উদাহরণগুলোই স্বদেশ অথবা অন্য দেশের স্বাধীনতা অর্জনে অনুপ্রেরণা যোগায়। সর্বোচ্চ পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করেও লক্ষ-পানে পৌঁছার অনন্য উদাহরণ মহৎপ্রাণ বিদেশী ওডারল্যান্ড। বাংলাদেশের যখন অস্তিত্বের লড়াই শুরু হয়, তখন ওডারল্যান্ড বাটা সু কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে কর্মরত ছিলেন। মনের তাগিদে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।

যোগ দেন সেক্টর-১ এ। পরবর্তীতে সেক্টর-২ এ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। যোগাযোগ রক্ষা করতেন সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। শত্র“দের পরাজিত করার জন্য কৌশল উদ্ভাবন করতেন। কঠিন দিনগুলোতেও হাসি ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখতেন সহযোদ্ধাদের। বলতেন অতীত ইতিহাসের কথা। শোনাতেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা। অনুপ্রেরণা জোগাতেন, উতসাহ দিতেন। সকল মুক্তিযোদ্ধাকে ভালবাসতেন নিজের সন্তানের মতো।
উইলিয়াম এ এস ওডারল্যান্ড এদেশের জন্য যে ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যি ইতিহাসে বিরল।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ওডারল্যান্ড টঙ্গীস্থ বাটা কোম্পানীতে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশের শ্যামল প্রকৃতি ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সরলতার ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি বাংলাদেশের সাহসী সেনাদের সাথে যুদ্ধে যোগ দেন। সে সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও যুদ্ধ পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি তিনি নিজেও দখলদার পাকিস্থানী বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। রণাঙ্গনে স্বক্রীয় অংশ গ্রহণের সাথে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার, ঔষধ, অর্থ দিয়ে ফান্ড গঠনের চেষ্টা করেন। এভাবেই তিনি কখনো গোয়েন্দা, কখনও গেরিলা, কখনও ট্রেনার এবং সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে প্রত্যক্ষ ভুমিকা পালন করেন।

দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের সৈনিক জীবনের পুরো অভিজ্ঞতা কাজে লাগান তিনি বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে। নিজের নিরাপত্তায় ব্যবহৃত অস্ত্রটিও দান করেন মুক্তিযোদ্ধাদের। পরবর্তীকালে ওডারল্যান্ড পাকিস্থানী বাহিনীর গণহত্যা ও নৃশংসতার ছীব ও ঘটনা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। স্বাধীনতা পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধাদের একটি স্বাধারণ তালিকা প্রণয়ণ করা হয়। এতে ওডারল্যান্ডের স্থান ছিল ৭৮ নম্বরে। যেখানে বাংলাদেশের কিছু লোক স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে, এদেশের স্বাধীন অস্তিত্বেও বিরোধিতা করে, সেখানে ওডারল্যান্ড স্বাধীনচেতা, মুক্তমনার পরিচয় দিয়ে স্বশরীরে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর অনন্য এ অবদানের জন্য তাঁকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘বীর প্রতিক’ খেতাবে ভুষিত করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তরুণ প্রজন্ম বঞ্চিত হয়েছে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস হতে। অথচ স্বাধীন বাঙালির যারা স্রষ্টা, তারা এখনও জীবিত রয়েছেন। তা সত্বেও সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের সন্দিহান করে তোলা হয়েছে। আমরা দ্বিধান্বিত মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক নিয়ে।

ওডারল্যাণ্ড একজন বিদেশি মানুষ হয়েও শত্র“র বুলেটের ভয় না করে এদেশের মানুষের নিজ থেকেই সাহায্য করেছেন। ওডারল্যান্ডের জীবনী এদেশের তরূণ সমাজ কে দেশ গড়ার জন্য আলোড়িত করবে, উৎসাহিত করবে নিঃসদেহে।