ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

নেই কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন। কার্যক্রমও স্থগিত। কমিটির অধিকাংশ নেতা-কর্মীরাই ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত। এরপরও থেমে নেই এদের বিতর্কিত কার্যক্রম। সংগঠনের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ইভটিজিং, বিরোধী ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন, মুক্তমঞ্চে সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর হামলা, সাংবাদিক নির্যাতন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের শারিরীক ও মানষিক নির্যাতন, শিক্ষার্থীদের মাদক গ্রহণে প্ররোচনা, জমি দখল, চুরিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নামধারী এসব নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। তবে বিশেষ আনুকূল্যে কর্মকান্ড পরিচালিত হলেও এদের দায়ভার নিতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সম্প্রতি ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দলের জের ধরে গত সোমবার নিহত হন ছাত্রলীগ কর্মী জুবায়ের।

২০১০সালের ১৯মে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশেদুল ইসলাম শাফিনকে সভাপতি ও নির্ঝর আলম সাম্যকে সাধারণ সম্পাদক করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের পর অভ্যন্তরীন কোন্দল মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। অভিযোগ ওঠে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরের এলাকা গোপালগঞ্জের নাহিদুজ্জামান সাগর, এস এম শামিম, শেখ শরিফুল ইসলাম নতুন কমিটিতে পদবঞ্চিত হন। অবশ্য অপর নেতা শেখ নেয়ামুল পারভেজ সহ-সভাপতি পদ পেলেও তুষ্ট হতে পারেননি এ কোরামের নেতা-কর্মীরা। তবে ২০১০সালের ৫জুলাই অভ্যন্তরীন সংঘর্ষের পর কমিটির সভাপতি- সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় দু’শতাধিক নেতাকর্মী ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হয়। এরপর ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত করে কেন্দ্রীয় কমিটি। এসব নেতাকর্মীরাই এখন ক্যাম্পাস দাবড়ে বেড়াচ্ছেন।

এরপরও স্বাভাবিক থাকেনি এদের কার্যক্রম। গতবছরে বেশ কয়েকটি অভ্যন্তরীন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ২৬ জানুয়ারি মীর মশাররফ হোসেন হল ও আলবেরুনী (বর্ধিতাংশ) হলের ছাত্রলীগ কর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এরপর শহীদ সালাম বরকত হল, কামাল উদ্দিন হল ও আল বেরুনী হলের নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের নাটক চলাকালে সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপরও হামলা চালায়। এবছরের ১ফেব্রুয়ারী সহকারী প্রক্টর কামাল হোসেন ও সাব্বির আলমের তত্বাবধানে ৩০/৩৫ ছাত্রলীগ কর্মী সশস্ত্র অবস্থায় শেখ নেয়ামুল পারভেজ ও আজগর আলীর নেতৃত্বে প্রতিপক্ষ ছাত্রলীগ কর্মীদের ওপর হামলা করে প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেয় তারা। এছাড়া সারা বছরই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের কর্মীদের মারধর ও নির্যাতন করে এসব ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা।

প্রতিপক্ষের ওপর হামলা

প্রতিপক্ষের প্রতি আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ক্যাম্পাসে প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের নেতা-কর্র্মীরা ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত। ছাত্রলীগের হামলা ও নির্যাতনের ভয়ে ব্যাহত হচ্ছে প্রায় দুশতাধিক ছাত্রদল কর্মীদের স্বাভাবিক শিক্ষা জীবন। এরপর যারা জীবনের ঝূকি নিয়ে ক্যাম্পাসে আসেন পরীক্ষা দিতে, তারা প্রায় ছাত্রলীগের নির্যাতন ও হামলার শিকার হন। গতবছরে প্রায় ২৫/৩০জন ছাত্রদল কর্মীকে মারধর ও নির্যাতন করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। বিভিন্œ সময় ছাত্রদল সন্দেহে বের করে দেওয়া হয় আরো অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীকে। এদের নির্যাতন ও মারধরের হাত থেকে বাদ যায়নি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও। গত অক্টোবরে শহীদ রফিক জব্বার হলে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রফ্রন্টের প্রথম বর্ষের দু কর্মীকে মারধর করে।

ইভটিজিং

গত বছরে ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে প্রায় ৩০/৩৫ ছাত্রী ইভটিজিংয়ের শিকার হয়। ছাত্রলীগের কর্মীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রীদের প্রথমে প্রেমের প্রস্তাব দেন। ছাত্রীরা বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করলে ছাত্রলীগ কর্মীরা তাদের উদ্দেশ্যে অশ্লীল মন্তব্যসহ নানাভাবে উত্যক্ত করে। মওলানা ভাসানী হলের ছাত্রলীগ কর্মী ফেরদৌস রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম অর্নব, আফম কামাল উদ্দিন হলের ছাত্রলীগ কর্মী মিরাজুল ইসলাম ও নুরুনবী নবীন, মো. আশিকুর রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ছাত্রলীগ কর্মী মমিন উদ্দিন, রাবিব হাসান, রসায়ন বিভাগের ছাত্র জিকুর নেতৃত্বে অনিক সরকার সম্পদ, সাইফুল ইসলাম অপু প্রমুখ ছাত্রলীগের কর্মীরা দলবদ্ধভাবে ক্যাম্পাসে ইভটিজিং করে বেড়ায়। এছাড়া লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মুহিত উল আলমকে ইভটিজিংয়ের দায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়।

মাদকসেবন

সম্প্রতি মীর মশাররফ হোসেন হল, মওলানা ভাসানী হল, কামাল উদ্দিন হল, রফিক-জব্বার হলে মাদক সেবনের হার আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদকাসক্ত টিম দেখাশোনা করেন ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগের কর্মী স¤্রাট, রাজিব, মিশুক,রাহাত, চয়ন, অর্ণব, ফেরদৌস, মিঠুন। গত ১১ জুলাই ঘুমের ওষুধ না দেয়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মওলানা ভাসানী হলের ছাত্রলীগ কর্মী অর্ণব ৫-৬জনের একটি গ্রুপ ওষুধের দোকানে ভাঙচুর এবং দোকানীকে মারধর করেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা কিছু কর্মচারীদের যোগসাজশে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

র‌্যাগিং

ছাত্ররাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে হলের নতুন শিক্ষার্থীদের ওপর শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন (র‌্যাগিং) চালান সিনিয়ররা। কথা না শুনলে, মিছিলে না গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিকার হন ছাত্রলীগের নির্যাতনের। ভয় থাকে হলের সিট হারানোর। এছাড়া আনন্দ-ফূর্তির নামে র‌্যাগিং নামের নির্যাতনের ভয়ে আতঙ্কে থাকে ক্যাম্পাসের নবীন শিক্ষার্থীরা।

এদিকে গতবছর অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কাজে লাগিয়ে টাকার বিনিময়ে চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদপ্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারনায় জোর করে সাধারণ ছাত্রদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগ কর্মী লিটন, মইন, শরিফসহ ৪/৫জন এসকল প্রচারনায় সাধারণ ছাত্রদের বাধ্য করেন। তবে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এসব শিক্ষার্থীরা ওই এলাকার ভোটার নন। ছাত্রলীগ কর্মী স¤্রাট, চয়ন, সকাল, লিটন, মইন, শরিফসহ ১০/১৫জন এসকল প্রচারনায় সাধারণ ছাত্রদের বাধ্য করেছেন বলে জানা গেছে। তবে ছাত্রলীগ কর্মীরা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এছাড়া চাঁদার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংস্কারকাজও বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের চলা ১৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫শ টাকার বরাদ্দের সংস্কার কাজ বন্ধ কওে দেয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। মীর মশাররফ হোসেন হলের ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের দাবি, ছাত্রলীগ নেতা আসগর আলী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স নয়ারহাট ট্রেডার্সের কাছ থেকে ২৬ হাজার চাঁদা নিয়েছেন। ফলে এই হলের বঞ্চিত নেতা-কর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেন। এছাড়া ঢাকা- আরিচা মহাসড়কে চলাচলকারী সুপার, হানিফ, আনন্দ সুপার, শুভযাত্রা, তিতাস পরিবহনের বাস সমূহ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয় বলে জানিয়েছে ছাত্রলীগের বিশ্বস্ত একটি সূত্র। ছাত্রলীগ নেতা আসগর এসব চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে তাঁর ছাত্রত্ব শেষ হয়ে যাওয়ায় জুনিয়র নেতা-কর্মীদের মধ্যে এসব চাঁদাবাজির দখল নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। যেকোন সময়ে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আবারো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদ পরিবেশনের ক্ষোভ থেকে যেকোন অজুহাতে গতবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বেশ কিছু গণমাধ্যম কর্মীদের নির্যাতন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নামধারী শিক্ষার্থীরা। গত বছরের জানুয়ারীতে বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ৪জন সাংবাদিককে নির্যাতন করে মীর মশাররফ হোসেন হলের ছাত্রলীগ কর্মীরা। এছাড়া বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভোরের ডাক পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নাসির উদ্দিনকে কামাল উদ্দিন হলে ছাত্রলীগ কর্মীরা মারধর করে। এছাড়া গত নভেম্বরে জনকন্ঠের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আহমেদ রিয়াদকেও মারধর করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। এছাড়া গতকাল ছাত্রলীগের মিছিল চলাকালে ছবি ওঠাতে গেলে নিউএইজ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নাজমুস সাকিব রাফসানকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় ছাত্রলীগের কর্মী সুমন।

মীর মশাররফ হোসেন হলের ছাত্রলীগ কর্মী আশরাফুজ্জামান লিটন, ভাসানী হলের মেহেদী হাসান স¤্রাট, আল বেরুনী হলের সকাল জানান, ছাত্রত্ব শেষ হলেও এখন শেখ শরিফুল ইসলাম, এস এস শামিম, আসগর আলীই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের স্থগিতকৃত কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক সরকার আসগর আলী বলেন, ছাত্রত্ব শেষ হওয়ায় আমি এখন ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। তিনি তার ব্যাপারে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন।

শেখ শরিফুল ইসলাম নিজেকে এমফিলের শিক্ষার্থী দাবি করে বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীরা জয় বাংলা স্লোগান দেয়। কর্মসূচী পালন করে। ছাত্রলীগ কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। যে কেউ এ সংক্রান্ত কর্মসূচী পালন করে। উপাচার্যের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন তারা। শামিমের ফোনে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের স্থগিতকৃত কমিটির সভাপতি রাশেদুল ইসলাম শাফিন ও সাধারণ সম্পাদক নির্ঝর আলম সাম্য বলেন, আওয়ামী সরকারের আমলেই বর্তমান সরকারের উপাচার্য ছাত্রলীগের প্রায় দু’শতাধিক নেতা-কর্মীর শিক্ষা জীবন হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরাচারী রাজত্ব কায়েম করেছেন। অবিলম্বে ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা জীবন নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানান তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি অধ্যঅপক সুভাষ চন্দ্র দাস বলেন, ‘দলীয় মানসিকতা পরিহার করে প্রশাসকদের দায়িত্ব পালন করা উচিত। উপাচার্যের উচিত সকল শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক শিক্ষা জীবন নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া।’

এ ব্যাপারে উপাচার্য গতকাল সাংবাদিকদের কাছে এ ব্যাপারে কোন ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁর মোবাইল ফোনে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ এ প্রতিবেদককে বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কোন কমিটির কার্যক্রম চালু না থাকায় এর দায়িত্ব সংগঠন নেবে না। আমরা জানতে পেরেছি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কেউ নিজেকে জোর করে ছাত্রলীগ দাবি করে সুবিধা নিতে চাইলে কি করার আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।