ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

Tarique-Rahman-Photo

সময়ের অভিমুখ থাকে কালের দিকে আর কালের স্হায়ীত্ব হয় ইতিহাসে – যেখানে বিশ্বস্ততা এবং গ্রহনযোগ্যতা ভাস্বর হয়ে থাকে । একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বা নিজের মতাদর্শ পরিত্যাগ করে নিরপেক্ষ অবলম্বনের মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরাই বুদ্ধিমান ইতিহাসবিদদের কাজ । কিন্তু বাস্তবে তারেক জিয়া কি করছেন ? স্বাধীন বাংলাদেশের স্হপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নামে মিথ্যা বানোয়াট কল্পকাহিনী ছড়াচ্ছেন । উনি যেখানে বসে নব্য ইতিহাসের অপদার্থ শিক্ষকের মত তার ছাত্রদের ইতিহাস শিখানোর দ্বায়িত্ব নিয়েছেন তাদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন বৃটেনে বসে বৃটেনের সংবিধান ও রানীর বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট ভিত্তিহীন কাহিনী বললে তারা বৃটেনে থাকতে পারবে কিনা ? আমার জানামতে লাথি মেরে বের করে দিবে ।

লেখাপড়াহীন যোগ্য মায়ের যোগ্য সন্তান তারেক জিয়ার পিতা জেনারেল জিয়ার দল গঠন সম্পর্কে পাকিস্তানের ” দি হেরাল্ড ” পত্রিকার ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে –

[অনুবাদ – জেনারেল জিয়া সেনাবাহিনীতে গোয়েন্দা বিভাগে অনেককাল ধরে কাজ করার ফলে তিনি গোয়েন্দা বাহিনীর সাহায্য নিয়ে নিজ দল বিএনপি গঠনে সমর্থ হন। একজন প্রাক্তন সামরিক গোয়েন্দা অফিসারের মতে বিএনপির জন্ম ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্হার নীল নকশার ফলশ্রুতি । এই দলের জন্য যে দর্শন নির্ধারিত করা হয় – তা হলো আওয়ামী লীগের দুর্বল স্হানে আঘাত করা, ইসলামের স্বপক্ষে ও ভারতের বিরুদ্ধে জনগনের অনুভূতিকে জাগ্রত করা । একজন প্রাক্তন ডিএফআই অফিসারের মতে – অনেক নিন্দিত আওয়ামীলীগকে জিয়ার দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল । ভাসানীর নেতৃত্বাধীন চরম বামপন্হী এবং মুসলীমলীগের লোকদের দলে শামিল করে শক্তিশালী করেন।] জিয়াউর রহমান যে পাকিস্তানি গোয়েন্দাবাহিনীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত দি হেরাল্ড পত্রিকার এই উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট হয় ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট নির্মম হত্যাকান্ডের পিছনে যে জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে প্রফেসর নুরুল ইসলাম রচিত ” Making of a Nation : Bangladesh ” পৃষ্ঠা নম্বর ১৬৬ – ১৬৯ এ । জিয়াউর রহমানের শাসনামল ও তথাকথিত ৭ নভেম্বর সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন ব্রিটিশ লেখক Anthony Meskarenhas তার রচিত ” Bangladesh : A legacy of blood ” গ্রন্হটিতে । এই বইটি ১৯৮৬ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় । মেজর রফিকুল ইসলাম এর রচিত ” রক্তাক্ত ৮১ ” বইটি পড়লেও যে কেউ বুঝতে পারবেন জেনারেল জিয়া কি পরিমান ক্ষমতালোভী ছিলেন এবং বিচার বিভাগকে ধ্বংস করে দিয়ে তিনি মার্শাল ল এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সাড়ে চার হাজার মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের বিচারের নামে প্রহসন সৃষ্টি করে রাতের আঁধারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক মিনিটের আদালতের মাধ্যমে কিভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের পর বেঈমান মোশতাককে ক্ষমতায় বসানো হয় । মোশতাক ক্ষমতায় বসেই জিয়াউর রহমানকে সেনা প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন । কিন্তু মোশতাক তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেননি । মোশতাকের পর প্রধান বিচারপতি সায়েম অস্হায়ী রাষ্ট্রপতির পদে নিয়োগ পান । কিন্তু সেনা প্রধান জিয়া অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জেনারেল এরশাদের সহায়তায় রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন । ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে জেলখানার ভিতরে হত্যাকান্ডের সময় জিয়া সেনা প্রধান ছিলেন । সেনা প্রধানের অনুমতি ছাড়া সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্হান জেলখানার ভিতর নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত হলো কিভাবে ? এই হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার কিছুদিন আগে বঙ্গভবন থেকে জাতীয় চার নেতার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয় মন্ত্রীসভায় যোগদান করার জন্য । কিন্তু তারা ঐ প্রস্তাবে রাজী হননি । যখন ঐ প্রস্তাব পাঠানো হয় তখন বঙ্গভবনে ছিলেন জিয়াউর রহমান, মোশতাক, ডালিম ও রশিদ সহ আরো কয়েকজন উচ্চভিলাষী ক্ষমতা লোভী পথভ্রষ্ট সেনা অফিসার ।

মার্শাল ল বহাল রেখে অস্ত্র দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করা কোন গনতান্ত্রিক বিধান কি না তা নব্য ইতিহাসবিদ তারেক জিয়াই বলতে পারবেন । সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ও অগনতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা দখল করে জনগনের সকল অধিকার হরণ করেছিলেন । ক্ষমতার মসনদ রক্তে রঞ্জিত করেছিলেন । ঐ রক্ত কিন্তু সেনা নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের ।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যতদিন ক্ষমতায় ছিলেন ততদিন সেনাবাহিনীর কোন সদস্যকে ফাঁসির হুকুম দেননি । একটি প্রানও ঝরেনি । কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেই ক্ষমতাকে আরও নিস্কন্ঠক করার জন্য একের পর এক অফিসার ও জোয়ানদের হত্যা করেছিলেন । এমনকি যে কর্নেল তাহের তাকে ক্ষমতায় বসতে সহায়তা করেছিলেন তাকেও তিনি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন । বিভিন্ন লেখকের জিয়ার শাসনামলের উপর লিখিত বই পড়ে এটা পরিস্কার বুঝা যায় যে ৭ নভেম্বর জিয়া নিজেই নিজেকে বন্দী করেছিলেন এবং কর্নেল তাহেরকে দিয়ে সৈনিকদের মাঝে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সরবরাহ করেছিলেন । বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরের প্রচন্ড চাপে জিয়া সৈনিকদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করেছিলেন । কিন্তু এর সুফল ভোগ করেছিলেন জিয়াউর রহমান । তাহের ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে তার স্ত্রীকে কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন । এই চিঠিগুলো অতি গোপনে তার আইনজীবি তার স্ত্রী লুৎফার কাছে পৌঁছে দেয় । ১৫ জুলাই ১৯৭৬ সালে তাহের যে চিঠি তাকে লিখেছিলেন আমি সেখান থেকে কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি —

[ জিয়ার বেঈমানী প্রসঙ্গে — this is only one example of such treachery in our history and that is of MIR JAFOR. আদালত এসব কথা রেকর্ড করতে অস্বীকার করে । এতে আমাকে বলতে চেয়্যারম্যানের উদ্দেশ্যে — I have seen small people in my life but never a smaller than you. অবশেষে এ প্রসঙ্গে আদালত রেকর্ড করে । Fortunately for us today is not 1757. Today is 1976. We have the revolutionary soldiers — we have the revolutionary people to frustrate the evil de – sing of a conspirator Ziaur Rahman.

জিয়াকে আস্তাকুড় থেকে তুলে দিয়েছিলাম সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান, কিন্তু সে আস্তাকুড়ে ফিরে গেছে । ইতিহাস আমার পক্ষে । ]

১৮ জুলাই ১৯৭৬ সালে তাহের তার স্ত্রীর কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন তার কিছু অংশ তুলে ধরছি । এই চিঠিই ছিল তাহেরের শেষ চিঠি । তার আগের দিন তাহেরকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল তথাকথিত গোপন আদালত ।

[ গতকাল বিকাল বেলা ট্রাইবুনালের রায় দেয়া হলো, আমার জন্য মৃত্যুদণ্ড । ———————— সবশেষে ট্রাইবুনাল আমার মৃত্যুদন্ড ঘোষনা করে বেত্রাহত কুকুরের মত তাড়াহুড়া করে বিচার কক্ষ পরিত্যাগ করিল । একই দিন আনোয়ার, ইনু, রব ও মেজর  জিয়াকে ১৪ বৎসর সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছিল । রায় শুনে সবাই হতবাক হয়ে গেল । সমস্ত আইনজীবিরা স্তম্ভিত হয়ে গেল । —————————– কিন্তু বিশ্বাসঘাতক ও চক্রান্তকারী জিয়া আমাকে জনগনের সামনে হেয় করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে । আতাউর রহমান ও অন্যদেরকে বলবে সত্য প্রকাশ করা তাদের নৈতিক দ্বায়িত্ব । ]

তাহেরকে সামরিক আইনের যে ধারায় ফাঁসি দিয়েছিল ঐ ধারায় কোন ফাঁসির কোন বিধান ছিল না । এবং তাহেরকে উচ্চ আদালতে আপীল পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি । এই হলো জিয়ার গনতন্ত্রের নমুনা । ৭ নভেম্বর হলো সৈনিক হত্যা দিবস । এবং বাঙালি জাতির জন্য এক লজ্জা যে বাংলাদেশের বুকে এই রকম জঘন্য এক চক্রান্তকারীর জন্ম হয়েছিল । তাহেরের আইনজীবি ছিলেন জিনাত আলী ও শরীফ চাকলাদার । তাদের মাধ্যমেই সব চিঠি তাহের তার স্ত্রীকে পাঠাতেন ।

মোট অভিযুক্ত — ৩৩ জন ।
প্রধান আসামি —— লেঃ কর্নেল আবু তাহের (অব:) বীর উত্তম ।
গ্রেফতার ——– ২৪ নভেম্বর ১৯৭৫ ।
আদালত গঠন ———- ১৪ জুন ১৯৭৬ (১ নং সামরিক আদালত) ।
চেয়ারম্যান ———— কর্নেল ইউসুফ হায়দার (রাজাকার ছিলেন)
কোর্ট মার্শাল শুরু —— ২১ জুন ১৯৭৬ ।
রায় ঘোষনা ———— ১৭ জুলাই ১৯৭৬। বিকেল ৩ টা ।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ————- ২১ জুলাই ১৯৭৬ ।
সর্বমোট কোর্ট মার্শালের কার্যক্রম ২৬ দিন ।

উচ্চ আদালতে আপীল করতে দেয়া হয়নি ।

(ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে)