ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

জিয়াউর-রহমান1

আমি আমার পূর্বের এক লেখায় বলেছিলাম, আমি কোন ইতিহাসবিদ নই । কিন্তু বিভিন্ন দেশি ও বিদেশী লেখকদের ঐতিহাসিক বই গুলো সংগ্রহ করে পড়ার অভ্যাস আমার আছে । আমি গতকাল ( ৭ নভেম্বর ২০১৪ ) তারিখে ” তারেক জিয়া অশিক্ষিত অপদার্থ কান্ডজ্ঞানহীন ইতিহাস বিশারদ ” নামে একটি লেখা লিখেছিলাম । আজকে এই লেখা তার দ্বিতীয় অংশ ।

প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎস কর্নেল তাহেরের বিচারের সময় ঢাকায় ছিলেন । তিনি মামলা চলাকালে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কিরুপ অবস্হার সম্মুখিন হয়েছিলেন তার বিস্তারিত বর্ণনা তাঁর ” Bangladesh The Unfinished Revolution” গ্রন্হে প্রকাশ করেছেন । আমি শুধু কিছু কিছু চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরব । এই সাংবাদিকই ৬৯ এ শেখ মুজিবের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার রিপোর্ট করেছিলেন । তিনি তাঁর গ্রন্হে লিখেন ————

[ বাংলাদেশে আসার কিছুদিন পরই বিভিন্ন মন্ত্রনালয়, সেনাবাহিনী ও জাসদের পরিচিত সূত্র থেকে জানতে পারি ৬৯ এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পর দ্বিতীয় চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক মামলা শুরু হতে যাচ্ছে ।

তাহের ছাড়াও তেত্রিশ জনকে বিচারের জন্য তলব করা হয় । এর মধ্যে সেনাবাহিনীর বাইশ জন সদস্য ছিল । বেসামরিক আসামীদের সবাই ছিলেন কারা অন্তরীন জাসদ নেতৃবৃন্দ, শ্রমিক লীগের সভাপতি মোহাম্মদ শাজাহান, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ডঃ আখলাকুর রহমান এবং ইংরেজী সাপ্তাহিক ” ওয়েব ” এর সম্পাদক কে বি এম মাহমুদ । ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উঁচু হলদে দেয়ালের ভিতর একুশে জুন বিচার শুরু হয় । এ দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনও কোন মামলা জেলখানার ভিতর হয়নি । দেশের ভিতরে এই বিচারের খবর সম্বন্ধে পূর্ণ ব্ল্যাক আউট আরোপ করা হয় । ——————————- অন্তরীন থাকাকালীন সময়ে অভিযুক্তরা আত্বীয় পরিজনের সাথে দেখা করা ও আইনগত পরামর্শ পাবার সুযোগ প্রার্থনা করেন, যা সরাসরি প্রত্যাখাত হয় । ট্রাইবুনালের কাজ শুরু হবার পর পরই আমি হং কং এর ফার ইস্টার্ন রিভিও, বিবিসি ও দি গার্ডিয়ান ( লন্ডন ) এ খবর পাঠাতে শুরু করি কিন্তু সেন্সরশীপ এর জন্য ঢাকা থেকে এ রিপোর্টগুলো পাঠাতে পারিনি । ব্যান্ককের যাত্রী জনৈক ব্যক্তি তার সাথে করে রিপোর্ট নিয়ে যান ও পরে থাইল্যান্ড থেকে সরাসরি পাঠানো হয় । এভাবেই ঢাকাবাসীরা এই মামলার ব্যাপারে প্রথম সংবাদ পান বিবিসি বাংলা বিভাগের মাধ্যমে । ]

যোগ্য বাবা মায়ের যোগ্য সন্তান টেনে টুনে কলেজের গন্ডি পের হওয়া এক অশিক্ষিত ব্যাক্তির কাছ থেকে যদি নতুন নতুন ইতিহাস শুনতে হয় আর সেই ইতিহাসবিদই যদি বিএনপির আগামী দিনের কান্ডারী হয় তাহলে বিএনপির ভবিষ্যত যে অন্ধকার এটা বলাই বাহুল্য । বিএনপির হাতে যে দেশ ও ইতিহাস নিরাপদ নয় তা জিয়া আগেও প্রমান দিয়েছেন এবং এখন নব্য ইতিহাসবিদ তারেক জিয়া পুনরায় প্রমান করে দিচ্ছেন । আমি মুখে গনতন্ত্রের কথা বললাম আর গোপনে সেন্সরশীপ আরোপ করে দেশবাসীর সাথে প্রতারনা করলাম এটা কি ধরনের গনতন্ত্র তা মনে হয় আমাদের জানা নেই । ” Bangladesh The Unfinished Revolution” গ্রন্হটি পড়লেই বুঝতে পারবেন জিয়ার মুক্ত গনতন্ত্র চর্চার নমুনা । সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎস লিখেছেন —————-

[ অনুবাদ —- কেন এ বিচার এত গোপনীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে , সে সম্বন্ধে সরকারী বক্তব্য জানার জন্য আমি ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে কিছু শোনার আশা করছিলাম । কিন্তু সেদিন এগারটার সময় আমাকে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীন করা হয় । আমি যে ছবিগুলো তুলেছিলাম তার ফিল্ম    আমাকে ফিরিয়ে দিতে বলা হয় ।আমাকে অন্তরীনকারী লেফটেনন্যান্ট ও পুলিশ অফিসারদের আমি সরাসরি জানিয়ে দেই যে, আমি স্বেচ্ছায় ছবিগুলো দিব না । এরা তখনই জাতীয় গোয়েন্দা সংস্হা এনএসআই ও সামরিক আইন সদর দপ্তরে জানান । এক ঘন্টার মধ্যে ঘটনা মিমাংসার জন্য দশ জন অফিসার এসে হাজির হন । শামীম আহমেদ নামে একজন অফিসার আমার কাছে জানতে চান তাহেরের বিচার নিয়ে আমি এত উৎসাহী কেন ? আমি তখন বললাম যে , গোপন রাজনৈতিক বিচার তা ষ্ট্যালিন, ফ্রান্কো বা জিয়া যেই করুন না কেন আমি সমানভাবে উৎসাহিত হই । ] 

পরবর্তিতে এই সাংবাদিককে জেল থেকে বের করে গৃহবন্দী করে রাখা হয় এবং পহেলা জুলাই তাকে বাংলাদেশ থেকে বহিস্কার করে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয় । তাহেরের বিচার অনুষ্ঠানের উপর এটাই ছিল শেষ স্হানীয় ও বৈদেশিক সংবাদসূত্র । এর পর থেকে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে শুধু সরকারী ভাষ্যই প্রকাশিত হয়েছে । মূল ঘটনা বাংলাদেশের জনগন আদৌ জানতে পারেননি । জিয়ার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সংবাদপত্রের উপর সেন্সরশীপ আরোপ ছিল । জিয়া যতদিন ক্ষমতায় ছিলেন ততদিনে সশস্ত্রবাহিনীতে ২২ টি ক্যু সংঘটিত হয়েছিল । একমিনিটের আদালত বসিয়ে জিয়া প্রতিদিন রাতের আঁধারে মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সৈনিকদের হত্যা করতেন । কাউকেই আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি , উচ্চ আদালতে আপীল তো দৃরের কথা । জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়ে রাত দশটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত ঢাকায় প্রতিদিন কারফিউ জারি থাকত । একমাত্র রোগী বহনকৃত এম্বুলেন্স ছাড়া কোন গাড়ীই চলত না । আর এই সুযোগে জিয়া সব ধরনের কুকর্ম করে বেড়াতেন ।

তাহেরের বিচার নিয়ে জিয়া যে নাটক মঞ্চস্হ করেছিলেন সেই কুৎসিত নাটকে সরকার পক্ষের প্রধান কৌসুলি ছিলেন এটিএম আফজাল হোসেন । আর পরবর্তিতে এটিএম আফজাল হোসেনকে উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগ করে পুরস্কৃত করা হয় । সত্য চিরদিনই সত্য । সত্যকে কখনোই চাপা দিয়ে রাখা যায় না । যতই সেন্সরশীপ আরোপ করেন সত্য কিন্তু ঠিকই বের হয়ে এসেছে । “ফাঁসির মঞ্চে কর্নেল তাহের” গ্রন্হটির ৩২ পৃষ্ঠার একটি অংশ এখানে তুলে ধরছি ————-

[ প্রধান কৌসুলি একজন ছাপোষা চরিত্রর অধিকারী । জনাব আফজাল তার অন্যান্য সহকর্মীদের বলেন যে, মৃত্যুদণ্ডের রায় শুনে আমি নিজেই সবচেয়ে বেশি হতবাক হয়েছি । একজন কৌসুলী হিসেবে তিনি নিজে কখনই মৃত্যুদন্ড দাবি করেননি । এই রকম একটি সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ অবাস্তব । তাহেরকে যে অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় তার জন্য তাকে মৃত্যু দেয়া যায় এই রকম কোন আইনই দেশে ছিল না । তাহেরের ফাঁসি দেয়ার দশ দিন পর আইন মন্ত্রনালয় এই অসঙ্গতী দূর করে । ]

তারেকের কথামতে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবরের নামে যদি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা যায় তাহলে জিয়াকে কবর থেকে তুলে এনে সমস্ত কৃত কর্মের জন্য, সংবিধানের চারটি মৌলিক অধিকারকে তছনছ করে দেয়ার জন্য, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করার জন্য, রাজাকার আলবদর আলশামসদের পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য প্রকাশ্য আদালতে বিচার করে মরনোত্তর ফাঁসি দেয়ার অনুরোধ জানাই সরকারের কাছে ।

তথ্য সহায়তা ———

১। বাংলাদেশ দি আনফিনিশড রিভুল্যুশন ———– লরেন্স লিফশুলৎস

২। এ লিগেসি অব ব্লাড ———– এন্হনি মাসকারেনহারস

৩। বাংলাদেশের সামরিক শাসন ও গনতন্ত্রের সংকট ———— মেজর ( অব ) রফিকুল ইসলাম পিএসসি

৪। এখনই সময়, কর্নেল তাহের সংখ্যা

৫। কর্নেল তাহের মঞ্চ ———- আবু বকর

৬ । রক্তাক্ত  ৮১ ————- মেজর ( অব ) রফিকুল ইসলাম পিএসসি

মাহফুজুল ইসলাম

islam_mahfuzul@ymail.com

( একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্হায় কর্মরত )