ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি


হারমোনিয়াম ছালাম করে গান শুরু করলো ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘কোন মেস্তোরি নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়’, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু, ফিরে যাইবা যদি’…। জায়গাটা সুনামগঞ্জ দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের ছোট্ট একটি কুঠির। জ্বী, আপনি ঠিক ধরেছেন, আমি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের বাড়ি থেকে বলছি। আমরা গানগুলো একে একে শুনতে থাকি, তবে নেই সেই সম্রাট। তাতে কি? তার নাতি ‘শাহ নুর আলম ঝলক’ এবং খুব কাছের শাগরেদ ‘বাউল দুখু মিয়াঁ’ যেন মন্ত্র মুগ্ধকারী হয়ে গেয়ে চলেছেন একের পর এক জনপ্রিয় গান, তাও আবার সম্রাটের সমাধির ঠিক ৩০ গজের মধ্যে ছোট্ট একটা ঘরে! আমি নিজেও একটা খঞ্জনি নিয়ে তাল না জেনেই তাল দেয়ার চেষ্টা করতে থাকি। ছোটভাই সজিব যে খুব উপভোগ করছে তা তার আচরণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মিম আর ম্যানিসা চুপটি করে শুনছে গানগুলো।

এই গান আগে এভাবে কখনো শোনা হয়নি। এভাবে বলছি কারণ আমরা ইউটিবে যে গান শুনি বাউল শাহ আব্দুল করিমের সেখানে রিমিক্স আর শব্দের অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে, এমন কি আমার স্বল্প জ্ঞান বলে অনেক জায়গায় সুরও পরিবর্তন করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তার গানের মাঝে রয়েছে ভাটি গাঁ এর এক অনাবিল প্রশান্তি আর ভালোলাগা, রয়েছে এক ভাটির মানুষের জীবন উপলব্ধি আর সরল সহজ শব্দের মায়ামোহ।

বাউল শাহ আব্দুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কালনির কোলে ছোট্ট গ্রাম উজান ধলের এক দরিদ্র পরিবারে। জীবনে মাত্র ৮ দিন স্কুলে যাওয়া এই মানুষটি এক মহান ভাটির মানুষ হয়ে যায় কালের আবর্তে। রচনা করেন প্রায় দেড় হাজার গান, কিন্তু সংগ্রহে আছে মাত্র পাঁচ শতাধিক জনপ্রিয় গান। তার প্রকাশিত বই এর সংখ্যা ৭টি। ১০টি গান ইংরেজি তে অনুবাদ করেছে বাংলা একাডেমি। তার গান শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার।

ভাটি অঞ্চলে সে অনেক আগে থেকেই জনপ্রিয় থাকলেও শহরের ইট-পাথরের ভেতর ঢুকতে তার সময় লেগে গিয়েছিলো জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগেই তার গান সারা বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাউল সাধনাকারী এই অমর মানুষ যে গান লিখে আর সুর দিয়ে গেছেন তা আমাদের নিয়ে যায় এক অন্য জগতে। শাহ আব্দুল করিমের ১০২তম জন্মদিন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার বিকেলে তার গ্রামের বাড়িতে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। আলোচনা সভা শেষে গান পরিবেশন করবেন বাউল সম্রাট শিষ্য ও ভক্তরা।

সিলেট অঞ্চল অনেক শিল্পী, কবি আর বাউলের পীঠস্থান। বাউল শাহ আব্দুল করিম লালন ফকির, হাছন রাজা, রাধারমন, শীতালং শাহ, আরকুম শাহ, দূরবীন শাহ, উকিল মুন্সী, শেখ বানু এসম মানুষকে ধারণ করতেন নিজের ভেতর তাদেরকে লালন করতেন মনের মাঝে। তার গানে অসাম্প্রদায়িকতা, জাতি কুলের ধার না ধরা, ভাটি অঞ্চলের জীবন প্রবাহ, প্রেম, আধ্যাত্মবাদ ইত্যাদি খুব বেশি লক্ষ্যণীয়। মালজোড়া, বিচ্ছেদ, ধামাইল, জারি, সারি, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি, গণসঙ্গীত এবং একই সাথে অন্যান্য ধারার গান ও রচনা করেছেন। তার গানের অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিলো তার ২য় স্ত্রী সরলা এবং এই নামটাও তার দেয়া।

২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়া দ্বিতীয় ‘সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে এই বাউল সম্রাটকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। ২০০০ সালে ‘কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরি পদক’ পান।


আমি একটু সময় নিয়ে বাড়ির পিছনটা দেখতে গিয়েছিলাম যেখানে এই শীতে ছোট হয়ে আশা কালনী নদী বয়ে চলেছে আপন মনে। কথা বলেছিলাম তার বেশকিছু শিষ্যদের সাথে। আমদের গাড়ি যখন উজান ধল দিরাই এর দিকে ফিরে যাচ্ছিলো হাওয়ের মাঝের রাস্তা দিয়ে, বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিলো উঠানের মাঝখানে সরলার পাশে চির নিদ্রায়মাণ বাউল শাহ আবদুল করিমের কবরখানি। আমি আস্তে করে ছেড়ে দিলাম হাবিব এর কণ্ঠে কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি।

তার বাড়িতে যাওয়ার ব্যবস্থা একদম ভালো না, যদি এই যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো করা হয় তাহলে দেশের অনেক মানুষ একবার হলেও ঘুরে আসতে পারবে উজানধলের বাউল শাহ আবদুল করিমের বাড়ি থেকে। সচক্ষে দেখে আসতে পারবে এই মহান ভাটির মানুষের জন্মস্থান আর বেড়ে ওঠার ইতিকথা।