ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস


[ছবিসূত্র]
শিক্ষা জাতীর মেরুদণ্ড হলে শিক্ষক নিঃসন্দেহে সে মেরুদণ্ডকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর উপযুক্ত করে তোলার কারিগর। শিক্ষা ছাড়া জাতী যেমন অসাড়,পঙ্গু ও চলৎশক্তিহীন তেমনি শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার কথা ভাবা আর না ভাবা সমান কথা। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষক ছাড়া জাতির শিক্ষার বিষয়টি ভাবনায় আনা যায় না। আরেকটি অতিপ্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষা ও শিক্ষকের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা হল শিক্ষার্থী। প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী ছাড়া ভাল শিক্ষার কথা ভাবা অবান্তর। যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী না থাকে বা অত্যধিক শিক্ষার্থীর ভারে প্রতিষ্ঠানটি জর্জরিত থাকে, তাহলে প্রকৃত শিক্ষা অর্জনে জাতি ব্যর্থ হতে পারে। কেননা, বিষয়গুলি একে অপরের সাথে সম্পর্কিত ও পরিপূরক।

একটি জাতির শিক্ষা যে মানে পৌঁছানোর কথা সে লক্ষ্যে এখনো পৌঁছানো না গেলেও, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের শিক্ষার হার যে বেড়েছে তা চোখে পড়ার মত। বিদ্যালয়ের সংখ্যা ও সাথে সাথে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাবলিক পরীক্ষাসমূহে শিক্ষার্থীর পাশের হারও অতি সন্তোষজনক। কেননা, বিগত পাবলিক পরীক্ষাসমূহের ফলাফল শতভাগ পাশের সাফল্য অর্জনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। বিষয়গুলি শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা দেয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু নেতিবাচক বিষয় শিক্ষার এই ইতিবাচক অর্জনগুলোকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অভিযোগ উঠছে সাংবিধানিক ‘শিক্ষা’ নামক মৌলিক অধিকারটি কিছু শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক তা বাণিজ্যের বেসাতিতে পরিণত করেছেন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মত অন্যান্য মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি শিক্ষাকেও শিক্ষার্থী ও তার অভিভাবককে অর্থ দিয়ে উন্মুক্ত বাজারে কিনতে হচ্ছে। ভাল শিক্ষার নামে ভাল বাণিজ্য যে শুরু হয়েছে তা আজ ওপেন সিক্রেট। ভাল অর্থ খরচ না করলে কিছু ভাল প্রতিষ্ঠানে বা ভাল শিক্ষকের কাছে পাঠদান পেতে সমস্যা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের শিক্ষার নামে বাণিজ্যের বিষয়টি অনেকদিন ধরে জাতির মাথাব্যথার কারণ ছিল। কারণ সার্বজনীন শিক্ষার থেকে জাতি ছিটকে পড়তে যাচ্ছিলো সচ্ছল অল্প-মানুষের শিক্ষাতে। আমাদের বেশীরভাগ অভিভাবকের পক্ষেই তার সন্তানকে ভাল মত পড়াতে শিক্ষাখাতে দ্বৈত অর্থ বা দ্বিগুণ অর্থ খরচ করতে পারে না। অনেক দরিদ্র অভিভাবক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খরচের পাশাপাশি প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টারের থেকে শিক্ষা নিতে পারে না। ফলে একই শিক্ষা পদ্ধতিতে একই মেধার অধিকারী ধনী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্যমূলক শিক্ষাধারার চলে আসছে যা জাতির ঐক্যের জায়গাতে ফাটল ধরাতে সক্ষম।

সম্প্রতি শিক্ষকদের শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিষয়টি জাতির কাছে আবারো তা মূর্ত হয়েছে। শিক্ষা পদ্ধতিতে কোচিং ও প্রাইভেট নামক শিক্ষা-বাণিজ্য অস্বীকার করা না হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন করে, জাতির প্রত্যাশা অনেকটা পূরণের চেষ্টা করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী। শিক্ষার ক্ষেত্রে এমন যুগোপযোগী সিন্ধান্তের জন্য সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু শিক্ষা বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধে ও জাতির সার্বজনীন শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা-২০১২ কি যথেষ্ট?

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও সম্প্রতি জারীকৃত: ‘শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’তে প্রাইভেট ও কোচিং ব্যবস্থাকে পুরোপুরিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক (সরকারী বা সরকার কর্তৃক অনুদান প্রাপ্ত মাধ্যমিক স্কুল , কলেজ, মাদ্রাসা) শিক্ষকদের প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যের উপর কিছু শর্ত ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। নীতিমালায় যা বলা হয়েছে তা হলো, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে শিক্ষকরা অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন তবে নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন না এবং তা সংখ্যায় ১০ জনের বেশী হতে পারবে না। এখানে নির্ধারিত ফি এর কথাও বলা হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা চাইলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষকরা নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে নিজ শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত ক্লাসও নিতে পারবেন। নিয়মনীতির বাইরে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ও অন্য কোথাও শিক্ষকরা ছাত্র পড়ালে তার জন্য সুনির্দিষ্ট কতৃপক্ষ বিভিন্ন শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবেন বলেও শিক্ষকদের সতর্ক করা হয়েছে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানো একেবারে নিষিদ্ধ করা হয় নি, কেবলমাত্র কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে মাত্র। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক নন এমন শিক্ষকরা কোচিং ও প্রাইভেট আগের মতই পুরোদমে পড়াতে পারবেন। তাহলে এমন আংশিক কেচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা প্রয়োগে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে কি শিক্ষা বাণিজ্য সহ বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা দূর করা সম্ভব হবে, যাতে করে শিক্ষাক্ষেত্রে সচ্ছল ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে?

(চলবে)

এ বিষয়ে পরবর্তি লেখা: শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধে ও শিক্ষার উন্নয়নে ঘোষিত নীতিমালাই কি যথেষ্ট?