ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী বলেই তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হল, সে তার চারপাশের বস্তুসমূহের মূল্য নির্ধারণ করে বস্তুটিকে মূল্যবান বা মূল্যহীন করে তোলে এবং তদানুসারে সে তার আচরণকেও পরিচালনা করে। কিন্তু মূল্যেরই স্বয়ং বা স্বতঃমূল্য আছে কী না, বিষয়টি নিয়ে মানুষের ভিন্নমত ও বিতর্ক বহু দিনের। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে বিষয়টিকে নিয়ে মানুষ ভেবেছে গভীরভাবে। মানুষের বিভিন্নমুখী আচরণ তথা মানুষের নৈতিক ও নান্দনিক মূল্য নির্ধারণে মূল্যের ভূমিকাকে মূল্যহীন বলা যায় না। মূল্য সংক্রান্ত বিষয়সমূহ মানুষের নৈতিক আচরণ, ভাষা ও সৌন্দর্য বোধকে প্রভাবিত করে।

মূল্য (Value) বস্তুতে থাকে বলেই কোন বস্তুকে মানুষ মূল্যবান মনে করে, না মানুষই স্বয়ং বস্তুর মূল্য নির্ধারণ করে বস্তুটিকে মূল্যবান করে তোলে, -বিষয়টিকে নিয়ে যুক্তিযুক্ত আলোচনা সূত্রপাত ঘটে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার হিসাবে পরিচিত, গ্রীক নগররাষ্ট্রের রাজধানী এথেন্সের কিছু চিন্তাশীল মানুষের মধ্যে। এক্ষেত্রে সোফিষ্ট ও সক্রেটিসের চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে বিষয়গুলোর পক্ষে যেমন মত এসেছে তেমনি বিপক্ষেও কথা কম হয় নি।

গ্রীক নগর রাষ্ট্রের এক শ্রেণীর গৃহশিক্ষক বা ভ্রাম্যমাণ শিক্ষক যারা সোফিস্ট নামে পরিচিত হতেন, তারা এ বিষয়টিতে মূল্যবান মতামত রেখেছেন। তার মূল্যকে একান্ত ভাবে ব্যক্তি নির্ভর বলে মনে করতেন। তারা এটাও মনে করতেন যে, ‘মানুষই সব কিছুর পরিমাপক’। মানুষই সব কিছু মূল্য নির্ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে বস্তুর আলাদা কোন মূল্য নেই। এক একজন ব্যক্তি মানুষ বস্তুকে যেভাবে দেখে সেভাবে সে বস্তুর মূল্য নির্ধারণ করে। বিষয়টি এমনই যে, ‘গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম সুন্দর/সুন্দর হলো সে।’ এখানে যেন, সুন্দরের কোন ভাবেই আলাদা অর্থ নেই। মানুষই বিষয়বস্তুকে সুন্দর করে তোলে বা মনে মনে বিষয়টিকে সুন্দর ভাবে বলেই সেটা সুন্দর। অর্থাৎ, যে কোন মূল্য যা ব্যক্তি নির্ধারণ করে তা অবশ্যই ব্যক্তি নির্ভর, আর তা ব্যক্তি নির্ধারণ করে বলে ব্যক্তিতে মূল্য নির্ধারণে পার্থক্য থাকে। যে ব্যক্তির সাহিত্যের প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ আছে তার কাছে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বা লেখা যতটা মূল্যবান ততটা একজন অশিক্ষিত কৃষকের কাছে মূল্যবান নয়। কেননা সে সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে অক্ষম এবং এ বিষয়ে তার আগ্রহের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। এখানে প্রয়োজনের সাথেও মূল্য সম্পর্কিত কী না, সেটাও বিবেচ্য বিষয়। যা প্রয়োজন তা ব্যক্তির কাছে মূল্যবান আর যা অপ্রয়োজনীয় তা মূল্যহীন।

সোফিস্টদের ‘মানুষই সব কিছুর পরিমাপক’ কথাটিকে যদি স্বীকার করে নেওয়া হয় তাহলে বস্তুতে আলাদা কোন মূল্য থাকে না। এখানে সব কিছুই ব্যক্তি নির্ভর। কিন্তু এ মতকে যদি কথার কথা হিসাবে স্বীকারও করে নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে, বস্তুর স্বয়ং মূল্য বলে কি কিছু নেই?

জ্ঞান-বিজ্ঞানের আদি গুরু মহান দার্শনিক সক্রেটিস বিষয়টিকে দেখেছেন সার্বজনীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে। সোফিস্টদের মানুষই সব কিছুর পরিমাপক কথাটির তিনি যথেষ্ট সমালোচনা করেছেন। সোফিস্টদের কথা সত্য হলে সার্বজনীনতা বলে যে কথা প্রচলিত আছে, তার কোন অর্থ থাকে না। যেখানে সব কিছুই ব্যক্তি নির্ভর সেখানে সার্বজনীন কোন নীতি থাকতে পারে না। অথচ আমরা জানি যে, কিছু নীতি আছে যা সার্বজনীন এবং তা সার্বজনীন বলে সকল মানুষের কাছে সমান সত্য। ব্যক্তির উপর সব কিছুর মূল্যায়ন নির্ভর করলে সত্য, নৈতিকতা ও সৌন্দর্যবোধ ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ভিন্ন হবার কারণে এগুলোর আলাদা কোন অর্থ না থাকাতে তা অর্থহীনতায় পর্যবসিত হবে। যেমন: কোন মানুষ যদি কখনো এমনটি ভেবে বসেন যে, তিনি মরণশীল নন, তাহলে অন্তত চিন্তার ক্ষেত্রে ‘সকল মানুষ মরণশীল’- একথা সত্য বলে স্বীকার করতে পারি না। অথচ, অন্য যে কেউ মানুষের মরণশীলতা নিয়ে যা কিছু ভাবুক না কেন, মানুষ অবশ্যই মরণশীল এবং তা একটি সার্বজনীন নিয়ম। কোন ব্যক্তি মানুষের ইচ্ছার উপর এগুলো নির্ভরশীল নয়। কোন ব্যক্তি বিশেষের মূল্যায়নের সাথে রবীন্দ্রনাথের লেখার সাহিত্য মূল্য নির্ভরশীল নয়। বরং তা নিজগুণে গুণান্বিত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, কোন মূল্যবান বস্তুর মূল্যায়ণ ব্যক্তি সাপেক্ষ নয় বরং তা ব্যক্তি নিরপেক্ষ। আর্থাৎ, সোনাকে (Gold) কেউ যদি মূল্যহীন ভেবে দূরেও ঠেলে দেয় তবুও তা সোনা এবং এক্ষেত্রে তার মূল্য কমে গিয়ে মূল্যহীনের পর্যায়ে পড়ে না। সোনা নামক উজ্বল ধাতুটি মূল্যবান বস্তু বলেই মানুষ সেটাকে পেতে চায়। আর কোন কিছু পেতে চাওয়াতে মানুষে-মানুষে পার্থক্যের জন্য বা আগ্রহের কম-বেশীর ভিত্তিতে মূল্যমানেরও তারতম্য ঘটে।

[লেখায় যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তার সূত্র]