ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ইমাম গাজ্জালী


[ইমাম আল গাজ্জালী]

[ইরানের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত তুস নগরীতে ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৪৫০ হিজরি সনে হুজ্জাতুল ইসলাম আবু হামেদ মোহাম্মাদ আল গাজ্জালী (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোহাম্মাদ আল-গাজ্জালী। ‘গাজ্জাল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সুতা কাটা । কারও মতে ইমাম গাজ্জালীর বংশের লোকেরা সম্ভবত সুতার ব্যবসা করতেন, তাই তাদের বংশ উপাধি গাজ্জালী নামে পরিচিত। এই মহামনীষী খ্রিস্টাব্দ ১১১১ সনের ডিসেম্বর মাস মোতাবেক ৫০৫ হিজরি সনে নিজ জন্মভূমি তুস নগরীতে সুস্থ অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মৃত্যুর দিন ভোর বেলায় তিনি ফজরের নামাজ আদায় করেন এবং নিজ হাতে কাফনের কাপড় পরিধান করেন এবং শুয়ে পড়েন। এভাবেই এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই মহান দার্শনিক। ইরানের অমর কবি ফেরদৌসীর সমাধির পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।] সূত্র: উইকিপিডিয়া

ইসলামী চিন্তার জগতে আল গাজ্জালী হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও মৌলিক চিন্তাবিদ। তিনি ছিলেন ইসলামী মতবাদের একজন বড় সংস্কারক ও দার্শনিক মতবাদের একজন সমালোচক। ধর্ম, দর্শন ও সুফীবাদে তার মৌলিক অবদানের জন্য তিনি একজন শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিধর্মী চিন্তাবিদ বলে মুসলিম দর্শনে স্বীকৃত ও প্রসংশিত। তার চিন্তাধারা মুসলিম ধর্মতত্ত্বের উচ্চতম বিবর্তন বলে বিবেচিত। ধর্ম, দর্শন ও সুফীবাদে তার মৌলিক অবদানের জন্য অনেক পন্ডিত হজরত মুহম্মদ (সঃ) এর পরে তাকে সর্বশ্রেষ্ট চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় সংস্কারক বলে মনে করে থাকেন।

আল গাজ্জালী অধিবিদ্য, যুক্তিবিদ্যা, নীতিবিদ্য, ধর্মতত্ত্ব, সুফীবাদ প্রভৃতি বিষয়ে চারশোর অধিক মুল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো- তাহাফাতুল ফালাসিফা, এহইয়াউল উলুমুদ্দিন, মাকসিদ উল ফালাসিফা। তবে তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে এহইয়াউল উলুমুদ্দিন সর্বশ্রেষ্ট। অনেক পন্ডিতের মতে যদি সকল মুসলিম চিন্তাধারা বিলুপ্ত হয় এবং উক্ত গ্রন্থ সংরক্ষিত থাকে তবে ইসলামের পক্ষে সে ক্ষতি সামান্য মাত্র। সুফীরা এ গ্রন্থকে কোরআনের পরে অন্যতম দ্বিতীয় গ্রন্থের মর্যদা দান করেন।

আল গাজ্জালী জ্ঞান বিষয়ক আলোচনায় মুল্যবান অবদান রেখে গেছেন। তিনি সন্দেহাতীত ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে পরম সত্যের জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। কারণ ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও প্রজ্ঞার জ্ঞান প্রতারণামূলক হতে পারে। এগুলো ছাড়াও মানুষের একটা শক্তি আছে যাকে বলা হয় স্বজ্ঞা। তার মতে মানুষের হৃদয়ে এমন একটি শক্তি আছে যার মাধ্যমে সে সত্যের জ্ঞান লাভে সমর্থ হয়। তিনি দ্বার্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করেন যে, এমাত্র স্বজ্ঞা মাধ্যমেই পরম সত্ত্বার জ্ঞান লাভ সম্ভব। কাজেই স্বজ্ঞাই হলো জ্ঞান লাভের প্রকৃত উৎস ও পথ।

কার্যকারণ তত্ত্বে বর্ণনা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গাজ্জালী ছিলেন তার সময়ের তুলনায় অনেক বেশী অগ্রগামী। অভিজ্ঞতাবাদী ডেভিড হিউম-এর ন্যায় অনুরূপ মত পোষণ করেন প্রায় সাত শত বছর পূর্বে। এ ব্যাপারে গাজ্জালী বলেন যে, কার্যকারণের মধ্যে কোন অনিবার্য সম্পর্ক নেই। কার্যকারণ সম্পর্ক হলো ঘটনার পূর্বাপর সম্পর্ক মাত্র। গাজ্জালী এ বিষয়ে বলেন যে, কোন প্রাকৃতিক বস্তু বা ঘটনা অন্য কোন বস্তু বা ঘটনার কারণ হতে পারে না। তিনি যে কোন একটি কার্যের কারণ হিসাবে একটি আদি কারণকে বিশ্বাস করতেন। এই আদি কারণ হল খোদা স্বয়ং।

আত্মা সম্পর্কে আল গাজ্জালীর আলোচনা লক্ষণীয়। আত্মা সম্পর্কে অনেক দার্শনিক কেবল আত্মাকে অমর বলেছেন। কিন্তু গাজ্জালী আত্মা ও দেহ-উভয়কে অমর বলেছেন। জন্মের সময় খোদা আদি আত্মার সাথে দেহের পূনঃ মিলন ঘটিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করতে পারেন। তার মতে আত্মা হলো আধ্যাতিক দ্রব্য। আত্মার ব্যাস বা বিস্তৃতি নেই।

ধর্মতত্ত্বে আল গাজ্জালীর অবদান সুদূরপ্রসারী। তিনি চরমপন্থী মুতাজিলা ও দার্শনিকদের তথা গ্রীক দর্শনের অশুভ প্রভাব থেকে ইসলামকে রক্ষা করেন। তিনি ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য দেখান এবং ধর্মকে দর্শনের উপর প্রাধান্য দেন। তিনি আশারিয়া মতবাদের সংস্কার সাধন করেন এবং মুসলমানদের কোরআন ও হাদীছের দিকে ফিরিয়ে আনেন এবং কোরআন ও হাদীছের মাহাত্ম পূনঃ প্রতিষ্ঠা করেন।

আল গাজ্জালীর প্রচেষ্টায় সুফীতত্ত্ব মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব। তিনি শরীয়তের সাথে মারেফতের সংযোগ সাধন করেন এবং যথার্থ জীবন ধারার রূপায়ন করেছেন। ডি বোয়ার-এর মতে আল গাজ্জালীর প্রভাবে সুফীবাদ ইসলামের জ্ঞানভান্ডারে মূল্যবান অবদান রাখতে সমর্থ হন।

ইমাম আল গাজ্জালী তদানিন্তন শাসক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে সরাসরি নৈতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাপ্রসূত পত্রাবলী বিনা দ্বিধায় প্রেরণ করতেন। কারণ তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, আধ্যাতিক পরিবর্তনের সাথে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশেষ প্রয়োজন। তিনি তার রাষ্ট্রদর্শনে রাষ্ট্রের প্রকৃতি, আইন, শাসনতন্ত্র ও ধর্ম, রাজস্ব আদায়, প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা, জ্ঞানীদের পরামর্শ গ্রহণ, শাসক ও প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের কর্তব্য প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন।

মুসলিম দর্শনের ইতিহাসে গাজ্জালী এত ব্যাপক বিষয়ে প্রাঞ্জল ও যুক্তিযুক্ত আলোচনা করেছেন, তা অন্যকোন মুসলিম দার্শনিকের বেলায় তা অনুপস্থিত। অধ্যাপক ম্যাকডোনান্ড এর মতে “আল গাজ্জালী ইসলামের শ্রেষ্ট ও সর্বাপেক্ষা সহনশীল চিন্তাবিদ। তার মতবাদ সমূহ তার ব্যক্তিত্বেরই অভিব্যাক্তি।” আরেক চিন্তাবিদ ইকবাল গাজ্জালী সম্পর্কে বলেন, “অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মানীর ইমানুয়েল কান্টের (দার্শনিক) এর মত গাজ্জালীর মহান উদ্দেশ্য ছিল প্রেরিত পুরুষের মতই।” গাজ্জালীর খ্যাতি শুধু মুসলিম জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল বিশ্বব্যাপি। তার মূল্যবান গ্রন্থ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

[ছবিসূত্র: উইকিপিডিয়া]