ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমার ভূতুড়ে জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মা আমাকে মামাবাড়িতে পাচার করে দিলেন। আমি সবেমাত্র তখন প্রাথমিক শেষ করে থানা সদরে মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছি। পড়ালেখায় নেহায়েত মন্দ ছিলাম না। মা আমাকে ( ভূত হতে) মানুষ করার জন্য মামাদের হাতে সোপর্দ করলেন। আমি যেন অথৈ সাগরে পড়লাম! মামারা ছিলেন প্রচণ্ড রাশভারী প্রকৃতির। আর নানা তো সাক্ষাৎ যম! পাড়া গ্রামের সাধারণ লোকেরা তার সামনে মাড়াতে সাহস করতো না। শুনেছি নানা আইয়ুব খানের সময় চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই সুবাদে লোকেরা তাকে যমের মত ভয় করতো। মামারা পর্যন্ত তার সামনে জড়সড় হয়ে যেতেন। আমাকে সকালে-বিকালে তার সামনে পড়তে বসতে হত। কি যে ভয় পেতাম!

আমার শোবার বন্দবস্ত হলো মামাদের ঘরে। মামারা যে ঘরে থাকতেন সে ঘরটি মাটির দোতলার উপরের ঘর। নানা থাকতেন নিচের ঘরে। উপরের ঘরে উঠার জন্য নানার শোবার ঘর দিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপর তলার ঘরে উঠতে হতো। মেঝেতে ছিল কাঠের পাটাতন। একটু জোরে হাঁটলে খট-খট শব্দ হতো। অমনি নিচ থেকে নানা হুংকার ছেড়ে বলতেন “কে রে অত জোরো হাঁটছে?” হুংকার শুনে ভয়ে গুটিয়ে যেতাম। আর মনে মনে মায়ের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতাম।

নানী বেঁচে ছিলেন না। আমাদের জন্মানোর অনেক আগেই গত হয়েছেন। বাড়িতে মেয়ে মানুষ বলতে একমাত্র মামী। মামাদের মধ্যে মেজ মামা কেবল সাহস করে (প্রেম করে) বিয়ে করেছেন। মেজ মামা আমার স্কুলের শিক্ষক। শিক্ষক হলে কি হবে? নানার সামনে দাঁড়ালে দেখেছি তারও পা জোড়া থরথর করে কাঁপে। আর মামী? সেতো নতুন বৌ। সবেমাত্র মামাদের সংসারে এসেছেন। বাড়ির নিয়মকানুন এখনও পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেন নি বলে তাকেও মাঝে-মধ্যে নানার হাতের বকা খেতে হতো। নানার ভাষা গত একটা অসঙ্গতি ছিলো। ছেলে-বৌ, নাতী-নাতনী সবাইকে ‘শালা’ বলে সম্বোধন করতেন। আমাকে নিত্যদিন কয়েক ডজন শালা (গালি/সম্বন্ধ) সম্বোধন হজম করতে হতো।

এইভাবে ভয়ে-ডরে আমার মামাবাড়ির দিনগুলি কাটছিল। আমি আস্তে-আস্তে মামাবাড়ির আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম আর একটু একটু করে ভূত থেকে মানুষ হচ্ছিলাম। আমার আচরণে স্থিরতা এলো। কথা-বার্তায় স্থির হলাম। আমি যেন বয়সের তুলনায় অনেকটা বড় মানুষের মত আচরণ করতে লাগলাম।

মামার সঙ্গে সকালে স্কুলে যেতাম, স্কুল থেকে ফিরে মামীর হাতে খাবার খেয়ে সেই নানার কাছে পড়তে বসা। সন্ধ্যার নামতে শুরু করলে নানা আমাকে ছেড়ে দিতেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবারও রাতে মামার কাছে পড়তে বসা। এভাবে মামাবাড়িতে প্রচণ্ড নিয়মের বাড়াবাড়িতে আমার জীবন প্রায় ওষ্ঠাগত। একমাত্র মামী ছিলেন আমার কাছের মানুষ। একেবারে মায়ের মত বা মায়ের চেয়েও বড় কিছু। জ্বালাতন কররে মা মারতেন কিন্তু মামী শত অপরাধ করলেও বকাবকি করতেন না। আমি মামীর চেলা বনে গেলাম। আমার মামাবাড়ির জীবনে এ যেন মরুভূমির বুকে এক পশরা শান্তির বৃষ্টি।

তখন আমি মাধ্যমিকের শেষ ক্লাসের ছাত্র। স্কুলে শিক্ষা সফর। মামাবাড়ির কড়া নিয়মের বেড়াজালে মনটা বাইরে বেরুনোর জন্য ছটফট করছিল। আমার পনের-ষোল বছর জীবনে বাইরে বেড়ানোর কোন সুযোগ পায়নি। এবার অন্তত: দু-একদিনের জন্য হলেও কড়া শাসনের হাত থেকে মুক্তি পাব। শিক্ষা সফরের দিনটি যতই কাছে আসতে লাগলো আমার মনটা ততই অস্থির হতে থাকলো। আমি দিনগুলিকে দুহাত দিয়ে ঠেলে পার করতে লাগলাম। কিন্তু সময় তো চলে ঘণ্টা-সেকেন্ডের হিসাবে। যতই দিনকে পিছনে ফেলতে চাইতাম, দিন আর ফুরায় না। অনেক অপেক্ষার পর অবশেষে দিনটি এলো। সকাল ৬টায় স্কুল থেকে আমাদের বাসটি মংলার বন্দরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। আমাদের সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাস ধরতে হবে। আমি যাব মামার সাথে। আমি সারারাত না ঘুমিয়ে জেগে রইলাম। পাছে ঘুমিয়ে গেলে বাস ধরতে দেরী হয়। রাত আর কাটে না। এত দীর্ঘ রাত বুঝি আর আমার জীবনে কখনও আসে নি। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে ফজরের নামাজের সময় বিছানা খেকে চুপি-চুপি উঠলাম। পাছে হাঁটার ঠকঠক শব্দে নিচের ঘরে নানা না জেগে যায়। নিঃশব্দে কলতলায় যেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই জামা-কাপড় পরে মামার উঠার অপেক্ষায় মামার ঘরের সামনে যেয়ে পায়চারী করতে লাগলাম। অনেকক্ষণ পায়চারী করলাম। না মামার ঘুম ভাঙ্গছে না। কিছুক্ষণ মামার ঘরের দরজায় কান পেতে শুনতে চেষ্টা করলাম মামার ঘুম ভেঙ্গেছে কি না। না কোন সাড়া শব্দ নেই। আর দ্রুত ও শব্দ করে পায়চারী করতে লাগলাম। না কিছুতেই মামার ঘুম ভাঙ্গছে না। আমি মনে মনে শঙ্কিত হলাম এই ভেবে যে বাসটি হয়তো আমাদের না নিয়েই ছেড়ে দেবে। আমি প্রাণপণ পায়চারী করে মামার ঘুম ভাঙ্গাতে চাইলাম। আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম। মামার ঘুমটা যেন এখুনি ভাঙ্গে, মামা যেন এখুনি জেগে উঠে…………………..

অবশেষে ঈশ্বর আমার প্রার্থনা কবুল করলেন। মামার ঘরের দরজা খোলার খুট করে শব্দ হলো। আমি দ্রুত দরজার সামনে থেকে সরে আসলাম। পাছে দরজার সামনে দেখে কি না কি মনে করে। আমার বুকে মধ্যে ধুকধুকানি অনেকগুণ বেড়ে গেল। আমি মামার বেরিয়ে আসার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। যেন তর সইছি লো না আর। মনের ভিতরটা প্রচণ্ড ভাবে আলোড়িত হচ্ছিলো। আর কিছুক্ষণ পর মামাবাড়ির কড়া শাসনের বেড়াজাল হতে বেরিয়ে বাংলার বিস্তৃত দিগন্তে হারিয়ে যাব।

না মামা নয়, চোখ কচলাতে কচলাতে মামী বেরিয়ে এলেন। আমাকে এত সকালে দরজার সামনে দেখতে পেয়ে কিছুটা অবাক হয়ে বললেন “কি ব্যাপার, তুমি এত সকালে, এখানে কি করছো?”

আমি দ্রুত মামীকে আমাদের শিক্ষা সফরে যাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। মামী নিচে গেলেন আমাদের জন্য নাস্তা তৈরি করতে। আমিও মামীর পিছে পিছে গেলাম, যদি কোন সাহায্যের প্রয়োজন হয়। মামী চুলা ধরিয়ে আমাদের জন্য রুটি তৈরি করতে লাগলেন। আমিও এটা সেটা করে মামীকে সাহায্য করতে লাগলাম। মামী আমাদের জন্য আলু ভাজি করতে চাইলেন। আমি বারণ করলাম, পাছে ভাজি করতে গিয়ে দেরী হয়ে না যায়। আমি রান্নাঘরেই একটি রুটি মুখে গুজে এক গ্লাস পানি গিলে নাস্তাটা শেষ করে ফেললাম। আমার খাওয়া শেষ হলে মামার জন্য গোটা দুয়েক রুটি নিয়ে মামী দোতলায় মামাকে নাস্তা করাতে গেলেন। আমিও দ্রুত মামীর পিছে পিছে মামা উঠেছে কি না দেখতে গেলাম।

না, মামার এখনও ঘুম ভাঙ্গে নি। মামী যেয়ে মামার ঘুম ভাঙ্গালেন। আমার তখন কি যে মনের অবস্থা। বারবার যেন মনে হচ্ছিল এতক্ষণ হয়তো আমাদের শিক্ষা সফরের বাসটি মংলার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। সকাল ৬ টায় ছাড়ার কথা। আমার হাতে ঘড়ি ছিল না। এমন কি আমি যে ঘরে থাকি সে ঘরেও ঘড়ি নেই। তাই এখন কটা বাজে তা জানতে পারছি না। শীতের সকাল। কুয়াশা ফুটে তখন একটু একটু করে সূর্য পূব আকাশে উকি দিতে শুরু করেছে। আমি প্রচণ্ড শীতেও ভ্রমণের উত্তেজনায় দরদর করে ঘামতে লাগলাম আর মামার রেরুনোর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। অবশেষে মামা একহাতে গুলের কৌটা হাতে বেরিয়ে এলেন। মামার ছিল একটা বদ অভ্যাস। সকাল বিকাল দীর্ঘ সময় গুল দিয়ে দাঁত মাজতেন। সেটা ছিল তার একমাত্র নেশা। আমি আরও শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। কত যে দেরী হবে তা ঈশ্বরই জানেন। বুকের ধুকধুকানি আরও বেড়ে গেল। আরও বেশী করে ঘামতে শুরু করলাম।

মামা দোতলার রেলিং এর ধারে বসে দাঁতে গুল মাখা শুরু করলেন। আমি একটু দূর থেকে মামাকে দেখতে লাগলাম আর ঈশ্বরের কাছে আবারও প্রর্থণা করতে লাগলাম। সময়টা যেন দ্রুত বয়ে যাচ্ছিলো। সূর্য অনেকটা উপরে উঠে গেছে। একটু একটু করে রোদ পড়তে শুরু করেছে।

মিনিট বিশেক গুল মেখে মামা উঠে দাঁড়ালেন। আমি আড়ি পেতে মামাকে দেখছিলাম। মামা ঘুরে দাঁড়ানোতে আমি দ্রুত ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। যেন আমাকে দেখতে না পায়। মামা তার ঘরে ঢুকতেই আবারো মামার ঘরের দরজার সামনে অবস্থান নিলাম আর আড়াল থেকে মামার গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলাম।

আরো মিনিট বিশেক মামীর সাথে সংসারের কথা-বার্তা সেরে নাস্তা করে মামা কাপড়-চোপড় পরতে শুরু করলেন। আমার তখন প্রায় মরে যাওয়ার মত অবস্থা। আর স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। হা-পা উত্তেজনায় কাঁপছিলো। আর একটু হলে হয়তো পড়ে যেতাম।

মামা ঘর থেকে অবশেষে বেরুলেন, পিছনে মামী। আমাকে দরজার সামনে দেখে মামা একটু মুখ টিপে হাসলেন আমার অবস্থা দেখে। আমি খানিকটা লজ্জা পেলাম।

তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। মামাকে ঘড়িটা দেখার জন্য বলতে চাইছিলাম। কিন্তু ভয়ে বলতে পারলাম না। পাছে ধমক দেয়। আমরা স্কুলের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে চলতে শুরু করলাম। মাইল খানেক পথ। জোরে হাঁটলে হয়তো আধা ঘণ্টায় পৌঁছানো যাবে। ইটের এবড়ো-থেবড়ো রাস্তা। আমি খুব জোরে-জোরে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে-হাঁটতে পিছনে ফিরে দেখলাম মামা আমার অনেক পিছনে। একটু থামলাম মামাকে সাথে নেওয়ার জন্য। আবারও হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু পথ আর ফুরায় না। মনে হচ্ছিলো এই পথ আমাদের অনন্তকাল ধরে চলতে হবে। আর স্কুলে পৌঁছাতে বেশী দূর নেই। আর কয়েকশো গজ মাত্র। স্কুল যতই কাছে আসছিলো মনটা আমার ততই উতলা হয়ে উঠছিলো। বাসটি এখনও আমাদের নিতে আছে তো? আমাদের কথা ভুলে বাসটি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়নি তো? এ রকম হাজারো চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আমি আরও দ্রুত পা চালালাম। শেষে দৌড়াতে লাগলাম। আর স্কুল কয়েক গজ মাত্র। দূর থেকে স্কুল গেটটি দেখা যাচ্ছে। বোধ হয় স্কুল গেটের মধ্যে বাসটি আমাদের নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। পিছন ফিরে তাকালাম, মামা আমার অনেক পিছনে। মামার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। মামাকে সাথে নিয়ে স্কুল গেটে ঢুকতেই স্কুলের দপ্তরীর সাথে দেখা। মামাকে দেখে তিনি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন “স্যার আপনি এখানে? শিক্ষা সফরে যান নি?”
আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো! একি বলছে দপ্তরী! ভুল বলছে না তো! বাসটি আমাদের নিতে সামনের রাস্তায় দাড়িয়ে নেই তো! ………….

আমি কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে দপ্তরীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের দিকে তাকিয়ে সে মিটমিট চোখে হাসছে। ভাবলাম, দপ্তরী আমাদের সাথে মস্করা করছে না তো? আমাদের দপ্তরী বেটে-খাট শ্যামলা মানুষ। খুর রসিক মানুষ। সব সময় পান চিবুতেন। কথা বলতেন হেঁয়ালী করে। সবার সাথে মস্করা করতেন। বয়সে বেশী বলে দপ্তরীর কথায় কেউ কিছু মনে করতো না। তার কোন কথা সত্য আর কোনটি মিথ্যা তা ঠাওর করতে সবারই সময় লাগতো। ভাবলাম আমাদের ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য বুঝি আমাদের সাথে মস্করা করছে। আমি দ্রুত দপ্তরী কোন কথা বলার আগেই দৌড় লাগালাম স্কুল ভবনের দিকে। যেখানে বাসটি থাকার কথা।

গেট পেরুলে স্কুলের প্রকাণ্ড মাঠ। মাঠের উত্তর পার্শে আমাদের স্কুল ভবন। স্কুল ভবনের সামনে শানবাঁধানো আমগাছ। শিক্ষা সফরের বাসটি সেখানে থাকার কথা। আমি দ্রুত চোখ ফোরালাম আম গাছটির দিকে। চোখ ফেরাতেই বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠলো। না, বাসটি সেখানে নেই! বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটার শব্দ শুনতে পেলাম। কিছুক্ষণের জন্য বোধ হয় চিন্তাশক্তি লোপ পেয়েছিল। যখন একটু সুস্থির হলাম ভালভাবে দেখলাম আমচত্ত্বরে বাস তো দূরের কথা কোন মানুষ পর্যন্ত নেই। এবার কিন্তু কেঁদে ফেলার মত অবস্থা। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছিলো। অনেক কষ্টে জল সম্বরণ করলাম পাছে একটু দূরে দাড়িয়ে থাকা মামা দেখতে না পায়। তখনই মাথায় আরেকটা চিন্তা এলো। আমাদের স্কুল মাঠের পূর্ব পার্শে স্কুল বোর্ডিং। দূর-দূরান্তের অনেক ছাত্র সেখানে থেকে পড়াশোনা করে। বাসটি যদিও আমচত্ত্বরে থাকার কথা কিন্তু কোন কারণে তা স্কুল বোর্ডিং-এর কাছে থাকতে পারে। মুহূর্তকাল দেরী না করে চোখ ফেরালাম স্কুল বোর্ডিং-এর দিকে। আরও হতাশ হলাম। কোথাও কেউ নেই। গোটা বোর্ডিং খালি। কোন ছাত্র চোখে পড়লো না। এবার আর চোখের জল আটকাতে পারলাম না। দু’চোখের’কোন বেয়ে বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। চেষ্টা করে কিছুতেই জল আটকাতে পারলাম না। লুকিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছলাম।

মামা বোধ হয় আমাকে লক্ষ্য করছিলেন। আমার কান্নাও বোধ হয় টের পেয়েছিলেন। আমাকে মাঠের মধ্যে একাকী দাড়িয়ে কাঁদতে দেখে আমার কাছে এসে বললেন “ চল তো দেখি, বাজারেও বাসটি থাকতে পারে।” মামার কথায় যেন আসমানের চাঁদ হাতে পেলাম। তাই তো? বাসটি তো আমাদের নিতে বাজারেও দাড়িয়ে থাকতে পারে? আমাদের স্কুলের শ’গজ মত দূরে রাস্তার পূর্ব পার্শে বাজার। গোটা পঞ্চাশেক দোকানঘর। আমরা মাঝে-মধ্যে বাজারে টিফিনের সময় খাবার কিনতে যেতাম।

এবার আর লজ্জা, ভয় না করে মামা দূত বাজারে যাবার জন্য বললাম। মামা আমার মানসিক অবস্থা কিছুটা হলেও টের পেলেন। আমরা দ্রুত বাজারের পথে পা বাড়ালাম।

স্কুলের গেট পেরুলে ডিস্ট্রিক বোর্ডের এবড়ো-থেবড়ো ইটের রাস্তা। আমাদের শহরে যাওয়ার একমাত্র পথ। আর শিক্ষা-সফরের বাসটি এই রাস্তা ধরে যাবে। আমার দ্রুত পা চালালাম। তখন বেলা অনেক হয়ে গেছে। শীতের সকাল হলেও কুয়াশা কেটে সূর্যটা অনেকখানি তাপ দিচ্ছিল। আমি তখন নেয়ে-ঘেমে একেবারে একাকার। শরীর বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছিলো। হা-পা উত্তেজনায় কাঁপছে। বুকের মধ্যে জোরে-জোরে হাতুড়ি পেটার শব্দ। যেন আমি কান না পেতেও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। এই শেষ সুযোগ। শেষ সম্ভাবনার দিকে যাচ্ছিলাম আমরা। সেখানে যদি বাসটি না থাকে তাহলে সব শেষ! বাসটি পাওয়ার আর কোন সম্ভাবনা থাকবে না। আমার ঘড়ি ছিল না বলে তখন সময় কতটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একবার মামার হাতের ঘড়ির দিকে আড়চোখে তাকালাম। ঠিক কতটা বাজে তা বুঝতে পারলাম না। জোরে হাঁটা শুরু করলাম। মামাও এবার আমার সাথে সাথে জোরে হাঁটতে শুরু করলেন। বাজার মাত্র মিনিট দু-তিনেকের পথ। এই সামান্য পথটি পেরুতে যেন আর তর সইছিলো না। আমি হাঁটছিলাম আর বাজারের দিকে তাকাচ্ছিলাম। যদি বাসটি দেখতে পায়। অনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলাম। না কোন বাস দেখা যাচ্ছে না! আর জোরে হাঁটতে লাগলাম। বাজারে প্রায় পৌঁছে গেছি। তাও কোন বাস নজরে আসছে না। ভাবলাম হয়তো বাসটি কোন দোকানের আড়ালে আটকানো থাকতে পারে। তাই নজরে আসছে না। আশায় বুক বাঁধলাম।

বাজারে পৌঁছে গেছি। বাসের দেখা নেই। মামার দিকে ঘুরে তাকালাম। দেখলাম আমার সামান্য দূরে দাড়িয়ে আছেন। চোখে-মুখে উত্তেজনার কোন চিহ্নমাত্র নেই। ভাবলাম মামা হয়ত বাসটির খোঁজ পেয়েছে। মামার কাছে দৌড়ে এসে বাসের কথা জিজ্ঞাস করলাম। মামা আমার কথার তখন কোন উত্তর দিলেন না। আমি মামার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম উত্তরের আশায়। কিছুক্ষণ পর মামা একটি দোকানদারকে ডেকে আমাদের বাসের কথা জিজ্ঞাস করলেন। দোকানদার উত্তরে যা বললো তা শুনে আমার হৃদপিণ্ড প্রায় বন্ধ হবার মত। বাসটি প্রায় ঘণ্টা দুয়েক আগে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে করে বাজার ছেড়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। আমি হতভম্বের মত দাড়িয়ে রইলাম। আমার চোখ বেয়ে তখন অঝোর ধারায় কান্নার জল গড়িয়ে পড়ছিলো………