ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

কিছু মনে করবেন না, একটা প্রশ্ন করি?

কতটুকু জানেন আপনি আপনার ছেলেকে?

– আমার ছেলেকে! আমার তো ছেলে নেই!

তাহলে আপনার মেয়েকে?

– আমি তো বিয়েই করিনি! আমার মেয়ে আসবে কোত্থেকে?

তাহলেও এই পোষ্ট খানা আপনি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতার জন্য যা প্রয়োজন।

অনেকেই মনে করেন, তিনি তাঁর ছেলেকে খুব ভালো জানেন। আমার ছেলেকে আমি জানবো না, তা কী করে হয়? সত্যিই কি তাই? সত্যিই কি আপনি আপনার ছেলেকে চেনেন? কতটা চেনেন? শুধু এই প্রশ্নটা যদি আপনি আপনাকে করতে জানেন, আপনার ছেলের বিপথে যাবার সম্ভাবনা ৫০% কমে যাবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে প্রতিটা মানুষ আলাদা ব্যাক্তিসত্বার অধিকারী। আপনার ঔরসজাত বা আপনার গর্ভের সন্তান হলেই যে সে আপনার মত হবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। সে তার নিজের মত করে চলতে বলতে জীবন যাপন করতে চাইতেই পারে। পরিবেশ পরিস্থিতি তাকে আরো অনেক দূরে নিয়ে যেতে পারে আপনার আদর্শ থেকে।

অনেকে মনে করেন ছেলে মেয়েরা একটু আধটু দুষ্টুমি করতেই পারে। এটা ঠিক। ছেলে বেলায় দুষ্টুমি কে না করেছে? তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, দুষ্টুমি আর অন্যায় আচরন এক নয়। ইঁচড়ে পাকামো আর কথাবার্তায় অশালীন শব্দচয়ন এক নয়।
আমি এমনও দেখেছি, দুই বছরের শিশু ছেলে “চুদির পুত”… “চুদির পুত”… (আমি দূঃখিত, অশালীন শব্দ দুটো এখানে এভাবে লিখতে হচ্ছে বলে) বলে বলে উঠোনের মাঝে বাবাকে দাবড়ানী দিচ্ছে আর বাবা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবার অবস্থা- দৌড়াচ্ছেন তিনি সারা উঠোন ময়। আর মা এক কোনে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসছেন। সুন্দর একটি সূখী পরিবার। এতে কোন সন্দেহ নেই।
বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে, ভালো মন্দ বুঝতে পারবে- এই ধারনাও ঠিক আছে।

তবে কথা হলো, আপনার ছেলে আপনার মেয়ে এই “বড়”টা কবে হবে? কবে থেকে সে ভালো মন্দ বুঝতে পারবে? কতটা বয়স হলে? প্রকারান্তরে প্রশ্নটা ঘুরিয়ে করলে, কবে থেকে আপনি আপনার ছেলের উপর নজরদারী শুরু করবেন? নজরদারী, গোয়েন্দাগিরী বা শাসন-মারপিট করে কি ছেলেমেয়ে আসলেও কন্ট্রোলে রাখা যায়?

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোন নির্দিষ্ট বয়স থেকে নয়, এমন কি জন্মের পর থেকেও নয়, শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয়ে যায় মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই।

আপনার চার বছরের শিশু ছেলে এক মুঠো চকলেট এনে একটা আপনার মুখে পুরে দিল। আর আপনি তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে চকলেটের স্বাদ নিতে শুরু করলেন। একবার জিজ্ঞেস করলেন না? এগুলো তুমি কোথায় পেলে? ছেলের হয়ে নিজে জবাব খুঁজে বের করতে যাবেন না। তাকে জবাব দিতে দিন।

স্কুল পড়ুয়া ছেলে যদি আপনার হাতে দু’শ টাকা এনে দেয়, খুশি হবার পরিবর্তে আপনার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়া উচিৎ সবার আগে। এটা তার পড়ার সময়। টাকা রোজগারের নয়। তাহলে কোথায় পেলো সে এ টাকা? সন্তোষজনক জবাব দেবার পূর্ব পর্যন্ত প্রশ্নবাণে জর্জরিত করুন তাকে। যদি সত্যিই চান আপনার ছেলে কোন সন্ত্রাসী বা চাঁদাবাজ বা ছিনতাইকারী না হয়ে সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেকে প্রতিমাসে টাকা পাঠাতে পাঠাতে ক্লান্ত আপনি। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এ দায়িত্ব আর বুঝি পালন করতে পারছেন না আপনি!

এমতাবস্থায় ছেলে জানালো এখন থেকে আপনাকে আর অত টাকা দিতে হবে না- কেঁদে ফেললেন আপনি- অর্ধেক পাঠালেই চলবে- খুশীর খবর। তবু স্বভাব সুলভ নৈতিক দায়িত্ব বোধে জানতে চাইলেন বাকী টাকা আসবে কোত্থেকে? ছেলে হয়তো জানালো পড়াশুনার পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করেছে সে। বুকের উপর থেকে পাথর নেমে গেল। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিলেন।
ছোট্ট একটা ভুল কি করলেন? ছোট একটা বাচ্চা ছেলে মিথ্যে কথা বলতে পারে। লেখাপড়া জানা বয়স্ক একটা “বাচ্চা” ছেলে মিথ্যে কথা বানাতে পারে। আপনি কী করে নিশ্চিত হলেন, ব্যবসার নামে সে টেন্ডার বাজী, চাঁদাবাজি, হল দখল, গাড়ি/মোটর সাইকেল চুরি বা ভাড়ায় মানুষ খুন করার মত গর্হিত কাজ করছে না? আপনি তার বাবা/ মা। সে নয়। যদি আপনি জানতে চান, সে আপনাকে ফাঁকি দিতে পারবে না। এখন কথা হলো, আপনি জানতে চাইবেন কিনা?

গুলিস্তান সিনেমার পাশে কোন এক হোটেলে বসে পাশের টেবিলের দুই ভদ্রলোকের কথা শুনছিলাম। আমার কাছাকাছি বসা লোকটির কথাগুলো স্পষ্ট ভেসে আসছিল আমার কানে।

– আরে ভাই আর বলো না, তোমার ভাতিজাতো এখন গায়ে গতরে বেশ বেড়ে গেছে। মহল্লায় অনেকে তাকে বড়ভাই বলে ডাকে। হাঃ হাঃ হাঃ!! ওর বাবা হিসাবে আমাকেও যথেষ্ট ভক্তি শ্রদ্ধা করে। কি যে ভালো লাগে!
– আরে না না, মাস্তান টাস্তান কিছু না। এমনিতেই ছেলেরা ওকে একটু ভয় পায় আর কি। আমি তো এতে দোষের কিছু দেখি না।
– কি যে বলেন ভাই? দেশে যে দিনকাল পরেছে, লোকেদের একটু আধটু ভয় না দেখালে কি চলে? আপনি তো মাথা সোজা করে হাঁটতেই পারবেন না।
– আচ্ছা আপনিই বলুন, ওর একটা বোন আছে। নিজের মেয়ে বলে বলছি না, বড়ই সুন্দরী। কলেজে যাওয়া আসা করে। আমার কলিজা শুকিয়ে থাকার কথা না? না, তাকে নিয়ে অন্ততঃ আমার কোন টেনশন নাই। আপনার ভাতিজা আছে না?
– আপনি সব কিছুকেই শুধু খারাপ ভাবে নেন। আরে ভাই আজ কালকার দিনে একটা ছেলে থাকার এইটাই তো সার্থকতা।

তো পাঠক! আপনি যদি এমন ছেলেই চান তাহলে আমার এই পোষ্ট পড়াটা আপনার সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।
আর যদি না চেয়ে থাকেন, বিষয়টা নিয়ে একটু ভাবতে পারেন।

মানুষের মাঝে বিষবৃক্ষের চারা রোপণ করলে একটা থেকে একটা নয়, শত-সহস্র হয়ে বংশ বিস্তার করে। যার বিষাক্ত ডালপালা আপনাকে, আপনার পরিবা‌র, আপনার সমাজ দেশ ও জাতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার ক্ষমতা রাখে।