ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইড্রো উইলসন ছিলেন রুথসচাইল্ড এজেন্ট এডওয়ার্ড হাউসের ক্রীড়নক। অন্য কোনো আকারে নয়, বেলফোর ঘোষণা একটি চিঠির আকারেই লর্ড লিওনেল রুথসচাইল্ডের ঠিকানায় প্রেরিত হয়েছিলো। শুরু থেকেই ইসরাইল ছিলো রুথসচাইল্ডের ব্যক্তিগত প্রকল্প। ইহুদিদের ‘আবাসভূমি’ হিসেবে এর কখনই প্রয়োজন ছিলো না। কমিউনিজম এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের ধারণা ছিলো লুসিফারের [ফ্রিম্যাসনদের সর্বদর্শী আরাধ্য দেবতা] উদ্দেশ্যে নিবেদিত রুথসচাইল্ডের দ্বারা শাসিত বিশ্ব রাষ্ট্রের অহং-স্ফীত ধারণার দুটি শক্তিশালী বাহু। পৃথিবীর ভবিষ্যত রাজধানী ইসরায়েলের অর্থায়নের জন্য রথসচাইল্ড মার্কিন সরকারের উপর তাদের প্রভাব খাটিয়েছেন। মার্কিনরা ইরাকে মারা যাচ্ছে তাদের এজেণ্ডা অগ্রসর করার জন্য।

***

ফিলিস্তিন প্রশ্নটি সহজ উচ্চারিত অথচ অত্যন্ত জটিল মানবিক এক সমস্যা। এ সমস্যার মূল হচ্ছে একই ভূ-খণ্ডের উপর আরব ও ইহুদিদের দাবি এবং পরিণামে আরব মুসলিম ও ইহুদি জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে সহিংস সংঘাত। এ দুটি জাতির পরস্পর বিরোধী দাবির প্রেক্ষিতে সংঘর্ষ হওয়া যে অবশ্যম্ভাবী সে কথা বিশ শতকের প্রারম্ভে খ্রিস্টান আরব লেখক নজিব আজুরী ভবিষ্যত্বাণী করেছিলেন। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত তার পুস্তকে আজুরী মন্তব্য করেন-
Two important phenomena of identical Character but never the…

ফিলিস্তিন নিয়ে আরব ও ইহুদিদের দাবির ভিত্তি কি এ সম্পর্কে অবগত হওয়া ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘর্ষ সম্পর্কে ধারণা লাভে আবশ্যকীয়। ইহুদিদের দাবি প্রধানত ঐতিহাসিক স্মৃতি। এ অতীত স্মৃতির একদিক হচ্ছে Old-Testament এ বর্ণিত বিশ্ব প্রভুর সাথে তার ‘মনোনীত ইহুদি জাতির পবিত্র অঙ্গীকার।’

Old-Testament এ বর্ণিত ঘটনাবলী গিডিয়ান, বোয়াজ ও ডেভিডের বীরত্ব, রূথের প্রেম ও আত্মত্যাগ, দেবোরা, লিয়াহ, রেবেকা, র‌্যাসেল ও অন্যান্য নারীদের কীর্তিকাহিনী এবং সল, ডেভিড ও সলেমান কর্তৃক ফিলিস্তিনে এক বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপনের স্মৃতি যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

আরবদের দাবির ভিত্তি দুটি ঐতিহাসিক স্মৃতি ও বাস্তব পরিস্থিতি। ইহুদিদের উদ্বেলিত করা ঐতিহাসিক স্মৃতির এক বড় অংশের উত্তরাধিকারী আরবগণও। বহু মহাপুরুষ দুই ধর্মাবলম্বীদের নিকট ঐশী পুরুষ রূপে সম্মানিত। তাছাড়া কিছু ঐতিহাসিক স্মৃতি মুসলমানদের একান্ত নিজস্ব। রাসূল সা. এর মিরাজ গমনের সাথে জেরুজালেমের সম্পৃক্ততা, হযরত উমরা রা. এর খিলাফতকালে ফিলিস্তিনে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন, কুব্বাত উস-সাখরা ও মসজিদে আকসার ন্যায় ঐতিহ্যমণ্ডিত হর্মরাজী (স্থাপনা) এবং দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ক্রুসেডারদের নিকট থেকে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহ. ও মামলুক সুলতানগণ কর্তৃক ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার এই স্মৃতির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক।

বাস্তব পরিস্থিতিও এই দাবি সমর্থন করে। প্রথমত সপ্তম শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আরব মুসলমানগণ কর্তৃক বিজিত হবার পর থেকে ফিলিস্তিন আরব জাহানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। মাত্র ১৯০ বছরের কিছু বেশি সময় [১০৯৯-১২৯১] এই দেশের কিয়ংদশ ক্রুসেডারদের দখলে ছিলো। দীর্ঘকাল আরব শাসনাধীনে থাকার ফলে এখানে ইসলামি মূল্যবোধে পরিচালিত একটি সমাজ সৃষ্টি হয়েছিলো। দ্বিতীয়ত বিভিন্ন স্থানের আরব [খ্রিস্টান-মুসলমান] এখানে বসতিস্থাপন করে। সর্বদিক বিবেচনায় আরব মুসলমানদের দাবিই অধিক যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত।

ফিলিস্তিন সমস্যার শেষ অংকে দেখা যায়, এই দেশটির উপর কোনো দেশের দাবি কতটা ন্যায় ও যুক্তিসঙ্গত কিংবা ঐতিহাসিক সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত তা সমস্যা সমাধানের সূত্র হিসেবে গৃহিত হয় নি। বরং লক্ষ্য অর্জনে কোনো দল কতটা সুসংগঠিত হতে পেরেছে এবং বৃহৎ শক্তিসমূহের উপর চাপ প্রয়োগ করতে কতটা সক্ষম হয়েছে, তাই সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে গণ্য হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইহূদিগণ অধিকতর সাফল্যের দাবিদার।

ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা বিভিন্ন দেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। তবে কোনো দেশেই তারা স্থানীয় জনসাধারণের সাথে মিশে নি। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার প্রবণতা এবং সাধারণ খ্রিস্টান কর্তৃক ইহুদিদেরকে ‘যিশুর হত্যাকারী হিসেবে’ চিহ্নিত করার ফলে ইহুদিরা খ্রিস্টানদের সাথে মিলেমিশে এক সমাজ গড়ে তুলতে পারেনি।

প্রথম মহাযুদ্ধে মার্কিন অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক ইহুদিবাদী এবং ব্রিটিশ সরকারের মাঝে পারস্পরিক বিনিময়ের ভিত্তিতে রচিত চুক্তির ফল বৈ আর কিছু নয়। ১৯১৬‘র দিকে ব্রিটিশরা যুদ্ধক্ষেত্রে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় এবং মার্কিন সাহায্য তাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠে। জায়নবাদীরা মার্কিন সাহায্যের প্রতিশ্র“তির বিনিময়ে ১৯১৭’র বেলফোর ডিক্লারেশনের [Declaration] ওয়াদা আদায় করে নেয়। বেলফোর ঘোষণাতেই ফিলিস্তিনে জায়নবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেয়া হয়। স্টেটস সিক্রেটস (১৯৭৫) নামক গ্রন্থে লীওন দোঁ পনসাঁ একজন সুবিখ্যাত ব্রিটিশ জায়নবাদীর নাম উল্লেখ করেছেন যিনি ঐ গোপন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। ‘দি জায়নিস্ট’ পত্রিকার সম্পাদক স্যামুয়েল ল্যাণ্ডম্যান ইউনাইটেড কিংডমস্থ জায়নিস্ট কাউন্সিলের সচিব ছিলেন। জায়নিস্ট এসোসিয়েশনের পৃষ্ঠপোষকতায় তার বই ‘গ্রেট ব্রিটেন’ এবং ‘দি জিউস এণ্ড প্যালেস্টাইন’ (১৯৩৬) প্রকাশিত হয়। এই বই দুটিতে ব্রিটেনকে তার প্রতিশ্রতি সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। ল্যাণ্ডম্যান লেখেন উইড্রো উইলসনকে ১৯১৭’র প্রথম মহাযুদ্ধে প্ররোচিত করার একমাত্র পথ হলো- ‘এখন পর্যন্ত সংশয়াতীতভাবে শক্তিশালী আমেরিকা এবং অন্যান্য জায়গায় অবস্থানরত জায়নবাদী ইহূদিদের পারস্পরিক বিনিময়ের চুক্তির ভিত্তিতে মিত্র শক্তির পক্ষে জড়ো করা এবং চালিত করা।’

গ্রেট ব্রিটেনের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র স্বতস্ফূর্ত, মানবতাবাদী এবং রোমান্টিক কোনো মহানুভবতা নয়- ১৯১৭’র বেলফোর [Belfur] ঘোষণা ছিলো মূলত ১৯১৬’য় সম্পাদিত ‘ভদ্রলোকদের’ গোপন সমঝোতার প্রকাশ্য স্বীকৃতি… [লীওন দোঁ পনসাঁ, পাতা ১৩ – Emphasis mine]। দো পনসাঁ অধ্যাপক এইচ এম ভি টেমপারলীয়র উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বেলফোর ঘোষণা [Declaration] অবশ্যই ব্রিটিশ সরকার এবং সংঘবদ্ধ ইহূদিবাদের মধ্যকার একটি চুক্তি’… [History of the Peace Conference in Paris– পাতা ১৭৩]।

কোনো হিটলার, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় এবং ইসরাইলের সম্ভাবনাই ছিলো না যদি প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানি বিজয়ী হতো। জায়নবাদীদের ক্ষমতার উৎস কোথায়? মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইড্রো উইলসন ছিলেন রুথসচাইল্ড এজেন্ট এডওয়ার্ড হাউসের ক্রীড়নক। অন্য কোনো আকারে নয়, বেলফোর ঘোষণা একটি চিঠির আকারেই লর্ড লিওনেল রুথসচাইল্ডের ঠিকানায় প্রেরিত হয়েছিলো। শুরু থেকেই ইসরাইল ছিলো রুথসচাইল্ডের ব্যক্তিগত প্রকল্প। ইহূদিদের ‘আবাসভূমি’ হিসেবে এর কখনই প্রয়োজন ছিলো না। কমিউনিজম এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের ধারণা ছিলো লুসিফারের (ফ্রীম্যাসনদের সর্বদর্শী আরাধ্য দেবতা) উদ্দেশ্যে নিবেদিত রুথসচাইল্ডের দ্বারা শাসিত বিশ্ব রাষ্ট্রের অহং-স্ফীত ধারণার দুটি শক্তিশালী বাহু। পৃথিবীর ভবিষ্যত রাজধানী ইসরায়েলের অর্থায়নের জন্য রুথসচাইল্ড মার্কিন সরকারের উপর তাদের প্রভাব খাটিয়েছেন। মার্কিনিরা ইরাকে মারা যাচ্ছে তাদের এজেণ্ডা অগ্রসর করার জন্য। এ অশুভ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সাম্রাজ্যবাদের উন্মত্ত আগ্রাসনে পৃথিবী প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষত হয়ে চলেছে।