ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

আগে যা হয়েছে…

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সত্তর দশক যে-বর্শাফলক নিয়েই হাজির হোক না কেন, আমার কাছে সে প্রাথমিক বিখ্যাত পুরুলিয়া-ভ্রমণের জন্যে। বাড়ির ছোট ছেলেটাকে স্কুলের পরীক্ষা-শেষে উদ্বাস্তু বাপ-মায়েরএই ছিল বচ্ছরকার উপহার — সঙ্গে করে হাওড়া-চক্রধরপুর সারারাত্রিব্যাপী ঢিকির-ঢিকির প্যাসেঞ্জারে পুরুলিয়া ঘুরিয়া আনো। কেননা, সেখানে আমার বড়দা জুতোর দোকানে সেলসম্যান এবং ওপরের চার ভাই তার ঘাড়ে চেপে মানুষ হচ্ছে। তো, সেটা দাদাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের নবীকরণও; বাড়ন্ত বয়েসের সবাই, প্রতি বছর নতুন করে আলাপ-পরিচয় করতে হতো।

আলাপ হতো আরও কিছুর সঙ্গে — “আমরা সত্তরের যীশু”।

11092584_1640400389516700_1333902581_n

 

পুরুলিয়া চকবাজারের গমগমাট ভিড়, তরকারির দোকান (তখনও সবজি বলতে শিখিনি), ঘুপচির মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ধোঁয়াটে কাচের পেছনেহলদে রসে নিখুঁতি-র বিজকুড়ি কাটা, লোকলস্কর, কালীমন্দির আর সেখানে পুজোয় ধুলোরাস্তা পর্যন্ত গড়ানো ছাগবলির ‘মাই নেম ইজ রেড’ — এই সবকিছুর মধ্যে আমি যিশুকে আবিষ্কার করি। দেখতে পাই, তারা আসলে দুজন, মুখে সবুজ চাপদাড়ি নিয়ে ছোট্টখাট্টো, খিদে-পাওয়া হাওয়াই চটিতে ফটর-ফটর নির্মল হালদার আর অনেক চুপচাপ শ্যাম শিমূলতুলোর মতো শ্মশ্রু, সৈকত রক্ষিত। প্রথমজন কবি আর দ্বিতীয় গল্পকারের সেই পত্রিকার সাইজ কিছুটা প্র্যাকটিক্যাল খাতার মতো, যা ওয়ান-বাই-ফোর ব’লে পরে আমার জ্ঞান হবে। কালো ভূশণ্ডি মলাটের বাঁয়ে ছোট্ট-ওপরে সাদা চকখড়িতে খ্রিস্টের অবয়ব, মানে যিশুর সংখ্যাসর্বমোট তিন।

পত্রিকার ভেতরে সেই সব কবিতা যার সবটুকু না বুঝলেও দারুন-লাগা আটকায় না, সেই সব গল্প যার মৃত্তিকার রঙ আকাশি!আমার ভেতরে কোনও গ্রন্থন বিভাগ তারা লুকিয়ে খুলে দিয়েছিল কিনা কী করে বলব, কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ারপুন্যিফলে আমি যে আরও তিন বন্ধুর সঙ্গে পত্রিকা বের করার ফিকিরে মেতে যাব, তাহা কি নিজেও বুঝিয়াছিলাম?

11158142_1640400486183357_1368626607_n

আমাদের প্রথমের নাম ‘প্রোফাইল’। বাসভাড়ার দশ পয়সা জোটে না বলে তিন কিলোমিটার হেঁটে যাকে কলেজ করতে হয়, সে যে কোনও হিসেবেই ভিখিরি। কাজেই লোকাল ট্রেনে কৌটো ঝাঁকিয়ে (বলতে গেলে, বাঘা বাঘা কম্যুনিস্ট পার্টিও একই ‘ভঙ্গিমায়’ হাত পাকিয়েছে) চার আনা আট আনা করতে করতে পাঁচশো টাকা! তখন আমাদের কেমন সন্দেহ হল, এভাবে ফান্ড কালেকশান করে পৃথিবীর কোথাও খুদে পত্রিকা জন্ম নেয়নি। এখন সন্দেহউঠে গেছে, স্থায়ি হয়েছে বিশ্বাস।

ভেঙে যাওয়ার যে কত যথার্থ আবার কত গাঁজাখুরিকারণ থাকতে পারে! যে কোনও ভাঙনইকারণ-সম্পদে এত বড়লোক যে প্রতিটি বিচ্ছেদকে আমি সমর্থন না করে পারি না। মাধুকরী-সম্বল প্রোফাইল থেমে গেল, যেহেতু আমরা চাকরি পেলামদিনে দিনে। আর যে পায়নি, লেখাই ছেড়ে দিল সেই বন্ধু!
এবার একা হাত পোড়ানোর পালা দ্বিতীয় পত্রিকার আগুনে —“ঋতীয়া”। মানে কী, লোকে জিগেস করে। ঘৃণার অন্যান্য নাম, জবাব দিই — অপ্রসাদ, বিতুষ্টি, বৈরক্ত্য, রীঢ়া…ঋতীয়া।

 

ঘেন্নার আয়ু ফুরিয়ে যেতে চাইলে আমি তাকে নিঃসঙ্গতা দিয়ে শুকনো ক’রে মেখে জ্বালিয়ে রাখতাম। এইভাবে পাত্রী-দেখায় বাতিল হওয়া রোগা মেয়ের মতোদু’তিন ফর্মার পত্রিকার হঠাৎ আত্মপ্রকাশ, তো তারপরেই লম্বা ডট ডটের বিরতি…এই করতে করতে শূন্য মাঠের ভেতর একদিন আমারই পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়ে আমার ঘোড়সওয়ার, ৫টা ওষধি-সংখ্যা দিয়ে মরে যায় ঋতীয়া।

 

দ্বিতীয় এপিসোড

তারপর অন্তত পাঁচটি শতাব্দী — যাকে পাঠক পাঁচ বছরের বেশি আয়ুকাল বলে মানতে নারাজ হবে — কলকাতার বইমেলা, নন্দনচত্বর অথবা বৃহৎ বঙ্গের মহাজাগতিক শূন্যতার মধ্যে আমি ভটকতা-হুয়া-রাহী অবশেষে এক ছায়া-বন্ধুর দেখা পেয়েছিলেম যে-কর্ণকুণ্ডলাআমাতে আপাদমস্তক নজর বুলিয়ে বঙ্কিম হেসে জিগেস করবে, পথিক তুমি কি ম্যাগাজিন হারাইয়াছ? তার কিছুদিন পরেই চেহারা পালটিয়ে হবে দু হাজার তিন সালের যিশুঃ আইস, আমি তোমাকে গ্রন্থি দিব।

 

গ্রন্থিপ্রথম সংখ্যাঃ বইমেলা ২০০৪

নাম তো ঠিক হল, কিন্তু তাকে লিখে দেবে কে? ফস করে ঠিকানা খুঁজে ছুটলাম আঁকিয়ে শুভাপ্রসন্নের বাড়ি। সব শুনে হাঁকিয়ে তো দিলেনই না, যেদিন আসতে বলেছেন, গিয়ে দেখি লেটারিং-সমেত একটা সুন্দর লোগো অপেক্ষা করছে।

প্রথম সংখ্যায় নারীবাদী ভাবনা নিয়ে দুটো গদ্য থাকল, লেখক নন্দিতা ভট্টাচার্য আর লিপি চক্রবর্তী। কবিতা লিখলেন স্বদেশ সেন, দেবদাস আচার্য, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুব্রত সরকার, মন্দাক্রান্তা সেন, বিভাস রায়চৌধুরীরা। এই সংখ্যার জন্যে একটা মজার প্রশ্ন রেখেছিলাম তিন সেলিব্রিটি শিল্পীর কাছেঃ কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত, কত্থক নাচিয়ে অমিতা দত্ত আর ঊর্মিমালা বসুআবৃত্তিকার। আচ্ছা, যদি এমন একটা গভীর প্রেম এসে পড়ে জীবনে যেখানে প্রেমিক ভালোবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তার অধিকারপ্রবণতা আপনার মুক্ত সত্তায় বাধাও ডেকে আনছে কখনও বা। কোন দিকে যাবেন তাহলে এই প্রেম ভার্সাস নারীবাদের যুদ্ধে?

তিনজনেই খুব হাত খুলে উত্তর দিয়েছিলেন।
11158180_1640400299516709_1540075660_n

গ্রন্থির প্রথম সংখ্যার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক অবশ্য কবি স্বদেশ সেনকে নিয়ে ক্রোড়পত্র। এই অংশে পাঠকেরা পেয়েছেন তার ঊনিশটা কবিতা, স্বপন রায়-কৃত কবিতা-আলোচনা আর স্বদেশের চমৎকার সাক্ষাৎকার।

প্রথম সংখ্যার ভূমিকায় লিখেছিলামঃ

…ভাই পাঠক, গ্রন্থি-র পাতা ওলটালে আচমকা মাথায় কী উড়ে এসে পড়বে, চামচিকে না চক্রবাক পাখি, তা তুমিও জানো না, আমরাও না। না কি সবুজ অক্ষর-কচুপাতার জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে আছে কয়েকটা বাঘ-বাঘিনী; গায়ের ওপর তোমার চোখের মাউস ক্লিক করতেই তারা নড়ে উঠবে, নিখুঁত রাগে গাইতে শুরু করবে আহার-সংগীত!…
তখনও জানি না অজান্তে এক সত্যভাষণ করে বসে আছি! পাঠক আসলে আমি নিজেই, আর অনেক বাঘ-বাঘিনীর ঘেরাটোপ চারদিক থেকে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে।

তৃতীয় এপিসোড

প্রথম গ্রন্থি বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে একটি বেনামি চিঠি, ডাকযোগে। বাংলা ওয়ার্ডে কম্পোজ করা, নিচে “আপনার শুভানুধ্যায়ী”। আমার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করা সেই পত্রাচারে আমার চরিত্রহনন করা হল ভালোরকম আর সেই সঙ্গে মিসেসকে গুটিকতক হোয়াট ইজ টু বি ডান, উনি শুভানুধ্যায়ী যেহেতু। বাড়ির পরিবেশ তখন “অগ্নিগর্ভ লেনা” — ছোটবেলায় যে বইটার নাম খুব শুনতাম, কিন্তু পড়া হয়ে ওঠেনি!

একটু খোঁজ নিতে জানা গেল, লেটার রাইটিংয়ের কৃতিত্ব কোনও কবির। জানি না, তিনি এই গরীবকে মেরে অন্য কাউকে শিক্ষা দিতে চাইছিলেন কিনা! কেনই বা তার উদ্দেশ্য ছিল যে কোনও উপায়ে গ্রন্থি বন্ধ করে দেওয়া?

প্রশ্ন অর্ধনমিত রেখে দ্বিতীয় সংখ্যার সূচীতে চোখ বোলানো যেতে পারে। সব নাম শক্তিমান, প্রায় সব নাম জনপ্রিয়।

 

গ্রন্থিশারদ সংখ্যাঃ সেপ্টেম্বর ২০০৪

কবিতাঃ মণীন্দ্র গুপ্ত, স্বদেশ সেন, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, আলোক সরকার, মলয় রায়চৌধুরী, সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুতপা সেনগুপ্ত, মন্দাক্রান্তা সেন, পবিত্র মুখোপাধ্যায়, প্রভাত চৌধুরী, সুজিত সরকার, জহর সেন মজুমদার, যশোধারা রায়চৌধুরী, শ্রীজাত, বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, মিতুল দত্ত, সুবীর মণ্ডল ও অন্যান্য তরুণ কবিরাও। নাগা কবি তেমসুলা আও-এর কবিতা অনুবাদ করলেন নবনীতা দেবসেন।

কবিতা নিয়ে গদ্য লিখলেন বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়, নির্মল হালদার, চৈতালী চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদিরা।

তবে এই সংখ্যার উচ্চতম ন্যায়াধীশ বিনয় মজুমদার ও তার এক ফর্মার নতুন কাব্যগ্রন্থ “সমান সমগ্র সীমাহীন”।

11139530_1640400706183335_528658687_n
১৯৯৪ সালে উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরের বাসিন্দা বিনয় অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা কয়েক বন্ধু নিয়ে গিয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে দিই। সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রধান ডঃ ঝর্ণা হাজরার চিকিৎসা আর কার্ডিও-থোরাসিক ইউনিটের ইন-চার্জ ডঃ ভূমেন্দ্র গুহের নজরদারিতে সেরে উঠতে থাকলেন কবি। সে বছর সরস্বতী পুজোর সকালে হাসপাতালের বেডে বসে দুঘন্টায়আমাদের লিখে দিলেন টানা চোদ্দটা কবিতা, বললেন এক ফর্মার বই বানিয়ে ফেলো। সেই ঘটনার দশ বছর পরে এই প্রথম প্রকাশিত হলে কবিতাগুলো। বাড়ি গিয়ে কয়েকটা কপি দিয়ে এলাম বিনয় মজুমদারকে।

মহা খুশি!

 

চতুর্থ এপিসোড

স্বদেশ সেন ক্রোড়পত্রে ঢেউ উঠেছিল পাঠকদরিয়ায়। দ্বিতীয় সংখ্যায় বিনয় মজুমদারের কাব্যগ্রন্থ, আরও কিছু ভালো লেখা পাওয়ায় গ্রন্থি-র নাম চেনাজানার মধ্যে এল। সুতরাং অবিলম্বে হাতেও এসে পড়ল দ্বিতীয় পত্রবোমা। তার ভাষা কম সাংকেতিক, বেশি সাংঘাতিক। কথা অনুযায়ী কাজ করেনি বলে আমার স্ত্রীকেও খুব শাসিয়ে দেওয়া হল। এবার বাড়ির অবস্থাটা “দুনিয়া কাঁপানো দশদিন” (পড়েছি)!

 

গ্রন্থিশিল্প-আলোচনা সংখ্যাঃ মে, ২০০

তৃতীয় সংখ্যায় নানা শিল্প-মাধ্যমের ওপর প্রবন্ধ লেখানো হয়েছে সেই সেই দিকের দিকপাল শিল্পীদের দিয়ে। লিখলেন সাহিত্য বিষয়ে সুজিত সরকার, সংযম পাল, তসলিমা নাসরিন, তরুণ মুখোপাধ্যায়, তপোমন ঘোষ। ছবির ওপর লেখা দিলেন শুভাপ্রসন্ন ও রবীন মণ্ডল, গান নিয়ে পণ্ডিত দীননাথ মিশ্র ও স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত; নাটক-সংক্রান্ত গদ্যে শাঁওলি মিত্র, হরিমাধব মুখোপাধ্যায় ও বিজয়লক্ষ্মী বর্মন; আবৃতি-শিল্পের আলোচনা করলেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও উৎপল কুণ্ডু; চলচ্চিত্রের কথা বললেন লীনা চাকী ও সৌমিত্র দস্তিদার; লোক-সংস্কৃতি প্রসঙ্গে প্রণব চৌধুরী, ইন্দ্রানী ঘোষাল আর লিপি চক্রবর্তী। এদের মধ্যে পণ্ডিত দীননাথ মিশ্র, স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত ও দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা তিনটে তাদের সাক্ষাৎকার থেকে তৈরি করা।

গ্রন্থির দ্বিতীয় সংখ্যা থেকেই লেখকদের সামান্য সম্মান-দক্ষিণা দেওয়া শুরু হয়েছিল। টাকাটা হাতে পেয়ে কেউ আনন্দ পেতেন, আবেগে আর্দ্র হতেন কেউ, কেউ ভাবতেন এ বাহুল্য, কিন্তু হতবাক সব্বাই! কমার্শিয়াল পত্র-পত্রিকা ছাড়া লেখকদের বিনি পয়সায় খাটিয়ে নেওয়ার এই রেওয়াজ একেবারে হিন্দুস্তানিক্ল্যাসিক্যাল ঘরানার। মানে, আমি সম্পাদক লেখা ছাপিয়ে তোমাকে ধন্য করে দিয়েছি, বিনিময়ে আর কী চাও, বালক?

কিন্তু কোন পত্রিকা বাণিজ্যিক আর কোনটা নয়, এই হিসেবও আপনাকে হাঁ-করিয়ে দেবে। পশ্চিমবঙ্গে খচাখচ বিজ্ঞাপনে ভরা সকল দেশের সেরা বেশ কয়েকখানা নধরকান্তি “খুদে পত্রিকা” আছে যারা উপরি উক্ত কারণে প্রকাশ মাত্রেই লাভজনক। বিক্রি হল কি হল না, বয়ে গেছে! এমনকি লেখক-কপি পাঠানোর পরিকল্পনায় পর্যন্ত ইতি ঘটিয়ে দিয়েছে অনেক পত্রিকা-গোষ্ঠী।

11160244_1640401706183235_1436622037_n
গ্রন্থিকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্যে সামান্য কিছু দক্ষিণা পৌঁছোল স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্তেরও ঠিকানায়, আর তারপর আমরা পেলাম ফোন। গলাটা এখনও কানে লেগে আছে: জানেন, অনেক অনুষ্ঠান করে থাকি, অনেক চেকও জমা পড়ে আমার অ্যাকাউন্টে। কিন্তু এইরকম ভালোলাগা মন ভরিয়ে দেয়নি কখনও। এই চেকটা কখনও ভাঙানো সম্ভব হবে না আমার পক্ষে, যত্ন করে তুলে রেখে দেব। পকেটের পয়সা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে পত্রিকা করেন, কিন্তু একজন শিল্পীর পরিশ্রমের দাম যে আছে, তার সময়ের মূল্য থাকে কিছুটা, শত অসুবিধের মধ্যেও ভোলেননি বলে ধন্যবাদ আপনাদের।

তিন নম্বর গ্রন্থির আর একটা দেওয়ার দিক ছিল বিনয় মজুমদারের দীর্ঘ এগারো পাতার ইন্টারভিউ যা কবির শিমূলপুর গ্রামের বাড়ি গিয়ে নিয়ে আসি ১৪১৩ বঙ্গাব্দের এক বসন্তবিকেলে। সেখানে বিনয় ধরে ধরে বিশ্লেষণ করেছেন নিজের কবিতা, মত দিয়েছেন অন্য কবিদের সম্পর্কে, স্মৃতিচারণ করেছেন, বাদ যায়নি গায়ত্রী চক্রবর্তী প্রসঙ্গও! সাক্ষাৎকারটা বেরনোর পরে অনেকে জেনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন যে এটা একেবারে সাম্প্রতিক! সে কি, বিনয় এই অসুস্থ বয়েসেও সব অতীত মনে রেখেছেন, নিখুঁত যুক্তি সাজিয়ে কথা বলেন, কবিতাবুদ্ধি তেমনি থেকে গেছে ক্ষুরধার…?!

 

পঞ্চম এপিসোড

আমার জীবনের ঋতুচক্র চিরকালই উলটো ঘুরে বসন্তের পরে শীত ডেকে আনে। গ্রন্থির থার্ড ইস্যু বেরোতে তখনও অনেক দেরি, একদিন অফিসে যেতেই বস ডেকে পাঠালেনঃ

— আপনার অনেক শত্রু-টত্রু আছে বোধহয়।

— না তো স্যার!

তাহলে আপনিই নিশ্চয় কারও সঙ্গে শত্রুতা করেছেন।

 

মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল না তিনি ঠাট্টার মুডে। হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, একেবারে দিল্লি অফিসে আপনার বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করা হয়েছে, দূর্নীতিগ্রস্ত ও বে-আইনি সাহিত্যপত্রিকা চালানোর অভিযোগ। দুতিন দিনের মধ্যেই উত্তর লিখে জমা দেবেন।

 

দুতিন দিন এই চিঠি বুকের ওপর নিয়ে বাঁচবো, অত কলজের জোর কোথায় আমার! বাড়ির অশান্তি তবু ধুঁইয়ে ধুঁইয়ে মিলিয়ে যায় একসময়, সবাই যে একই নৌকোর অসহায় যাত্রীকুল, কিন্তু চাকরি গেলে মরে তো যাবোই, দুবেলা দুমুঠো ভাত জোটাও মুশকিল! (এখন খুব ইয়ারকি চলছে, কিন্তু তখন হার্টবিট ৫০-এর নিচে)। এক ঘন্টার মধ্যে রিপ্লাই সাবমিট করে দিলাম। ভিজিল্যান্স ফাইল খুলে গেল আমার নামে।

 

কিন্তু মানসিক চাপ আর নেওয়া যাচ্ছিল না। পাঁচ বছর আগে দুহাজার সালে হঠাৎ মাথায় এক বিদঘুটে যন্ত্রনা হতে থাকলে এম আর আই-তে ধরা পড়ে, আমার মস্তিষ্কের ভেতরে বাঁ দিকে এক দীর্ঘদেহী অ্যারাকনয়েড সিস্ট বসে আছে। চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হসপিটালের ডঃ সিদ্ধার্থ ঘোষকে ধন্যবাদ, কলকাতার ডাক্তারদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে ও. টি.-র টেবিলে উঠতে দেননি আমাকে; নয়তো ফেরার রাস্তা ছিল না। সেই থেকে জানি, এই আছি এই নেই-এর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক চার্মড লাইফ আমার। আর টেনশান বয়ে বেড়াচ্ছি; মাথায় একটু যন্ত্রণা হলেই মন বলে — শেষের শুরুয়াত!

অ্যাংজাইটি নিউরোসিস ছিল, ডিপ্রেশানের খপ্পরে পড়ে গেলাম। অথচ কেমন এক তাড়নায় বেরিয়ে চলল পত্রিকাও।

 

গ্রন্থিচর্যাগান থেকে বিনয়-সন্ধান, এপ্রিল, ২০০৬

কবিতা লিখলেন আগের সংখ্যার প্রায় সব কবিরা। নতুন যোগ দিয়েছেন বিজয়া মুখোপাধ্যয়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, কবিরুল ইসলাম, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, পিনাকী ঠাকুর, পৌলোমী সেনগুপ্ত, সংযম পাল, মল্লিকা সেনগুপ্ত, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত, শ্বেতা চক্রবর্তী ইত্যাদিরা।

অনুবাদ কবিতা লিখলেন তপোমন ঘোষ আর ভাস্কর দাশগুপ্ত।

কিন্তু এই সংখ্যায় সবচেয়ে ভাল কাজ হল একটা ক্রোড়পত্র, যেখানে এক ডজন প্রবন্ধে চর্যাপদ থেকে পঞ্চাশের কবি বিনয় মজুমদার পর্যন্ত বাছাই কয়েকটা কাব্য বা কবির বইয়ের আলোচনা করবেন ক্রিটিকরা, যাদের বেশির ভাগই খ্যাতনামা।

11158059_1640401176183288_1536858177_n 11156852_1640400702850002_440785551_n

 

   বিষয়                                     লেখক

 

১ চর্যাগানঃ ভিন্ন চোখে                      নির্মল দাশ

২ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন                               রত্না মিত্র

৩ মঙ্গলকাব্যের ভাষা পরিক্রমা           স্মৃতিকণা চক্রবর্তী

৪ পদাবলীকার গোবিন্দদাস               সত্যবতী গিরি

৫ নামপ্রসাদকথা                              বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়

৬ অন্নদামঙ্গলের কাব্যভাষা               সনৎকুমার নস্কর

৭ কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত                        রবিন পাল

৮ লালন ফকিরের পদ                     অঞ্জন সেন

৯ সনেটের মধুসূদন                         গোপা দত্তভৌমিক

১০ রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি                 অমিতাভ চক্রবর্তী

১১ “সবচেয়ে বেশি রূপ, সবচেয়ে

গাঢ় বিষণ্ণতা”                             চন্দন ভট্টাচার্য

১২ ফিরে এসো চাকা                      কৌশিক ঘোষ

 

ক্রোড়পত্র এত প্রশংসা পেল যে উৎসাহিত হলাম একে আলাদা করে একটা বই হিসেবেও প্রকাশ করতে। সেটা বেরলো মে, ২০০৭-এ। সেখানে গীতাঞ্জলি নিয়ে প্রবন্ধের লেখক পালটাল শুধু, এলেন তপোব্রত ভাদুড়ি। আর কৃতজ্ঞ থাকব প্রিয় কবি মণীন্দ্র গুপ্তের কাছে, মূল্যবান ভূমিকা লিখে দিলেন “হাজার বছরের বাংলা কবিতা” সংকলনের সম্পাদক।

 

ষষ্ঠ এপিসোড

এবার ভাঁটির টান লাগার পালা। পরের সংখ্যা প্রকাশিত হতে গড়িয়ে গেল পাক্কা তিনটে বছর!

 

গ্রন্থিকবিতা সংখ্যাঃ মে, ২০০

বিশেষ পরিকল্পনা ছাড়াই বের হল গ্রন্থি। কবিতায় প্রায় সব তরুণ কবিমুখ।আখেরুল হক, উত্তম চৌধুরী, ঝিলম ত্রিবেদী, রাজর্ষি দাসভৌমিক, শ্রীজিৎ, সুমন ঘোষ, অনুপম মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণা মালিক, দীপাঞ্জনা শর্মা, মহম্মদ সামিম, সুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেলিম মল্লিক, স্বাগতা দাশগুপ্ত, মুজিবর আনসারী, অনির্বান দাস, রাহুল বিদ। থাকছেন মণীন্দ্র গুপ্ত, স্বদেশ সেন, দেবদাস আচার্য, গৌতম বসু, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুব্রত সরকার, অনির্বান মুখোপাধ্যায়ের মতো অসাধারণ কয়েকজন। তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও বদল আসবে। দীর্ঘদিনের পুরনো শাসক দলের ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে সবদিকে আর দুই রাজনৈতিক দলের সমর্থকে ভাগ হয়ে যেতে বসেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় গোটা বুদ্ধিজীবীদল। একটা দীর্ঘ কবিতা তো লিখছিলামই এই সংখ্যায়, তার সঙ্গে জুড়ে দিলাম আরেক গদ্য, ওই বুদ্ধিজীবী-বিচ্ছেদের দিকে তাকিয়ে।

11103969_1640400212850051_487315800_n

কিন্তু নিজের পত্রিকা ব’লে যত খুশি লিখবে? তারপর দেখুন, একফোঁটাও ছবিজ্ঞান নেই, অথচ বিদঘুটে প্রচ্ছদ এঁকে বসে আছে। এ-কি নির্লজ্জতা! এক সাময়িক পত্রিকায় ঠাটানো সমালোচনা লেখা হল আমার।

প্রচ্ছদ নিয়ে ভুল কিছু বলেননি তিনি। কিন্তু অর্থসাহায্য করার তো কেউ ছিল না। গ্রন্থি-র গায়ে “বিনামূল্যে বিতরিত” — এই অদৃশ্য ট্যাগটা একটু চক্ষুষ্মান লোকমাত্রেই দেখতে পাবেন, দাম লেখা থাকে আসলে বুকস্টলের সুবিধের জন্যে। কভার আঁকাতে গেলে টাকা গুনে দিতে হয়। অফসেট নয়,সিল্ক স্ক্রিনে ছাপা শুনে প্রথম সংখ্যা থেকেই ভালো কোনও প্রচ্ছদশিল্পী এগোতে চাননি। উপায় কী, বলুন মহাশয়?


সপ্তম এপিসোড

কবি মণীন্দ্র গুপ্ত নাথধর্ম ও সাহিত্য নিয়ে মনে উৎসাহ বুনেছিলেন চার বছর আগে, ন্যাশানাল লাইব্রেরি গিয়ে এই গৌণধর্ম নিয়ে পড়াশোনা জুগিয়ে দিল পত্রিকার পরের সংখ্যার বিষয়। সহযোগীরা ইস্যুটা পছন্দ করলেন না, কিন্তু আমি এগিয়ে গেছি। এই হয়তো আমার চিরকালের অন্যায়।

 

গ্রন্থিনাথধর্ম ও নাথসাহিত্য সংখ্যাঃ নভেম্বর, ২০১১

বুদ্ধিজীবী বিভাজন দেখে খারাপ লেগেছিল, অথচ গ্রন্থি-ফাটল ঠেকাতে পারিনি। রিফু করার শেষ চেষ্টায় দু’বছর পরে প্রকাশ পেল যে সংখ্যা সেখানে কবিতা লিখলেন আগের পরিচিত তরুণ কবিরাই। তবে এই প্রথম বিস্তারিতভাবে রাখা হয়েছে কাব্যগ্রন্থ-আলোচনা। শ্রী অনির্বান ধরিত্রীপুত্রের “সনেট পঞ্চাশৎ”, জহর সেনমজুমদারের “মহাজগৎকথা” আর “বৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম”, মল্লিকা সেনগুপ্তের “আমাকে সারিয়ে দাও, ভালোবাসা”, অনির্বান মুখোপাধ্যায়ের “বাচস্পতিপাড়া রোড”, শ্রীজাত-র “কম্বিনেশিয়া” — পাঁচ কবির বইয়ের ভরপেট্টা বিশ্লেষণ করলেন সন্দীপ মুখোপাধ্যায়, সংযম পাল, হিন্দোল ভট্টাচার্য, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌরভ মুখোপাধ্যায়।

রবীন্দ্রনাথের বড় বোন স্বর্ণকুমারী দেবীর নাতনি কল্যাণী মল্লিক ছিলেন নাথধর্মের ওপর প্রথম পি এইচ ডি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তন্ত্র, কৌলমার্গ, রহস্যবাদী বৌদ্ধ, শৈব-সম্প্রদায় — নানা ধারা থেকে পুষ্টি পেয়েছে এই ধর্মমত। দুই প্রধান নাথগুরুর নাম মৎস্যেন্দ্রনাথ আর গোরক্ষনাথ। বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্য চর্যাপদে নাথপন্থীদের রচনাই সবচেয়ে বেশি।

শ্রীমতি মল্লিকের বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ থেকে কিছু অংশ ক্রোড়পত্রে রেখেছি। বিখ্যাত হিন্দি ঔপন্যাসিক হজারি প্রসাদ দ্বিবেদী-র গ্রন্থ “নাথ সম্প্রদায়” বই থেকেও অনুবাদ করলাম অনেকখানি।

11148927_1640401166183289_2070332071_n

ডঃ ভি জি রেলে তার Kundalini — the Serpent Power -এ যোগক্রিয়াকে পাশ্চাত্যের শারীরবিজ্ঞান অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। নির্দিষ্ট অংশের অনুবাদ রেখেছি এই বই থেকেও।

এছাড়া নতুন প্রবন্ধ দিয়েছেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক লোকনাথ চক্রবর্তী। দীর্ঘ লেখায় তিনি নাদতত্ত্বের গভীরতম ব্যাখ্যা উন্মোচন করলেন। দর্শন শাস্ত্রের প্রাক্তন অধ্যাপক বলরাম চক্রবর্তী লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের বাইরে ছড়িয়ে পড়া নাথধর্ম নিয়ে এক ভ্রামকের ডায়েরি। আর গোরক্ষবিজয় কাব্য এবং ময়নামতী ও গোপীচন্দ্রের গানের সাহিত্য ও সামাজিক মূল্য বিচার করেছেন সুজনসারথি কর। এছাড়া নাথ-গোষ্ঠীর পত্রিকা শৈবভারতী-র সম্পাদক উপেন্দ্র কুমার দেবনাথ লিখেছেন আত্ম-পরিচয়ের গবেষণালিপি।

তবু গ্রন্থির মুখ থুবড়ে পড়ার পূর্ব-নির্ধারিত সত্যকে পাশ কাটানো গেল না। যে বন্ধুর বাড়ি সদ্য প্রকাশিত সংখ্যাটারেখে এসেছিলাম বিতরণের সুবিধের জন্যে, কিছু কপি নিয়ে আসার পরে বাকিটা পাওয়ার বাধা হয়ে দাঁড়াল তার নিরাকার নির্ভেজাল নিরাসক্তি। পত্রিকার ১২০ পাতার ‘নাথধর্ম ও নাথসাহিত্য’নামের কোলপাতা আর ৮০পাতার কবিতা ও কবিতা-আলোচনা সমেত থেকে গেল বহু পাঠকের অভিজ্ঞতার বাইরে।ছ’নম্বর গ্রন্থিরলেখকদের জন্যে আমার অপরাধ-বোধেরও আর কখনও স্খালন হবে না।

এরপর অন্ধকার যুগের টানা গল্প, যখন আমি সজ্ঞানে শরীর পেতে নিচ্ছি ডাক্তারের ছেনি-বাটালি (ব্রেনের ভেতর সিস্টের বসত-হেতু জেনারাল অ্যানাসথেসিয়া করা মুশকিল), মানসিক রোগের হাসপাতালে ছুটছি ডিপ্রেসিভ সাইকোসিসের খোঁচা খেয়ে, সন্তানের অসুস্থতা ভয়ে বোবা করে দিচ্ছে আমাকে আর ঠিক তার পিঠোপিঠি চোখের সামনে মৃত্যুজগতের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-সহোদর।

কিন্তু কাকে আত্মীয় বলবে না তুমি? যে মৃত ভাইয়ের পারলৌকিক কাজে ছুটে গেলাম এই সেদিন, তাকে এক যুগের বেশি অতীতে মরণাপন্ন দেখে ক’ভাই সঙ্গে নিয়ে উড়ে গিয়েছিলাম ব্যাঙ্গালোর, ডঃ দেবী শেঠির কাছে। রোগি-পরীক্ষা শেষ হলে আমাদের ডাকলেন তিনিঃ এক্ষুনি বাইপাস করা ছাড়া পেশেন্টকে বাঁচানোর উপায় নেই, আবার এই অবস্থায় সার্জারিতে জীবনের ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে অন্তত পঁচিশ শতাংশ। কাজেই, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে পরামর্শ করে কাল সকালের মধ্যে আপনাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন আমাকে।জবাব দিয়েছিলামঃ আমাদের আত্মীয়, বন্ধু, সখা, সহোদর…সব আপনি। আজ আপনার চেয়ে কাছের মানুষ আর কে হতে পারে!

 

অষ্টম এপিসোড

প্রায় চার দশক আমার আত্মার পাশে তাঁবু খাটিয়ে বসে থাকা একান্ত নিজের কবিটিও চলে গেলেন। স্বদেশ সেন। তার সঙ্গে আমারও বিনাশ হল, না জন্মান্তর, কিচ্ছু জানি না। এইটুকু মনে পড়ছে যে টেলিফোনে মাঝেসাঝে বলতাম, আপনার কবিতার ওপরে একটা গদ্য লিখে পড়ানোর খুব ইচ্ছে, দেখতে চাই আমার বিশ্লেষণ স্বদেশ সেনের কবিতা-ভাবনার শরীর ছুঁতে পারে কিনা। তিনি হালকা হাসিশব্দ শুনিয়ে বলতেন, ঠিক আছে, লিখে নিয়ে বাড়িতে চলে এসো।আধ-খাওয়া আপেলের মতো এই যে জীবন, আমার প্রবন্ধও তেমনি অর্ধভুক্ত হয়ে পড়ে ছিল। আবার তাকে নিয়ে বসলাম চরম মনখারাপ সাক্ষী ক’রে।

 

গ্রন্থিস্বদেশল্যান্ডঃ মার্চ, ২০১৫

অনেক সময় মনে হয়, যে সমস্ত লেখকের লেখা আশা করেছিলাম, স্বদেশল্যান্ডে তারা লিখতেন যদি, কেমন হতে পারতো সংখ্যাটা! এভাবে, বাস্তবে যে রস সৃষ্টিহয়নি, মনে মনে তার উপভোক্তা হয়ে ওঠার স্বভাব হয়তো প্রত্যেকেরই!ফোনে কতো-কতোজনকে রাজি করিয়ে কলেজ স্ট্রিটের ‘ধ্যানবিন্দু’ থেকে “স্বদেশ সেনের স্বদেশ” কিনে পাঠিয়ে দিয়েছি ক্যুরিয়ারে, অনেকের বেলায় প্রাপ্তিস্বীকার-টুকুরও অভাব ছিল। ম্যাগাজিন করতে গেলে এ আপনাকে মেনে নিতে হবে।ছোটবেলার জিত্তাল গুলিখেলায় কল্পনা আর বাস্তবের তফাত সব সময় এক বিঘত-এর চেয়ে বেশি!

 

গ্রন্থি আর পারবো, এমন আশা ছিল না। এ-বঙ্গের তরুণরা লেখা দিতে রাজি, সময় দিতে নয়। তবু কপালজোরে কিছু মাননীয় বন্ধু জুটে গেছে আমার। প্রথমনাজনীন খলিল। তিনি সিলেটের বাসিন্দা, এবং বাংলাদেশের একজন মান্য সিনিয়ার কবি। নাজনীনের কাছে তো যে সাহায্য পেয়েছি; আইরিন সুলতানা, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, বা ত্রিপুরার দীপঙ্কর সেনগুপ্তকে তিনিই তো জড়ো করলেন গ্রন্থি ঘিরে। পরে পরে উৎসাহ দেখিয়েছেন বাড়ির কাছে আরশিনগরের শংকর চৌধুরী আর কলকাতার দীপান্বিতা চ্যাটার্জী মণ্ডল।

11139764_1640401169516622_1308938489_n

প্রথমে প্রবন্ধগুচ্ছের মানচিত্রেই বসাতে চেয়েছিলাম স্বদেশল্যান্ড। তারপর বড় হতে লাগল ঢেউ-সীমানা, কবির রঙিন ফোটোগ্রাফ, জীবনী, নিজের হাতে লেখা কবিতার পাণ্ডুলিপি, চিঠি, ৩১টা নির্বাচিত কবিতা ছাড়াও ৯টা অপ্রকাশিত কবিতায় ভরে উঠল জমি-জায়দাদ। আরও থাকছেস্বদেশের একটা পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার ওঅন্য চারটে থেকে নির্বাচিত স্তবকেরা। সবার উপরে, দুই পর্বে ৯-৯ আঠারোটা উত্তম প্রবন্ধ। বা, গদ্য অনবদ্য!

 

লেখক-লিস্টি নামিয়ে দিলামঃ

আলোক সরকার, বারীন ঘোষাল, কাজল সেন, সুতপা সেনগুপ্ত, স্বপন রায়, আর্যনীল মুখোপাধ্যায়, নীতা বিশ্বাস, নাজনীন খলিল, কৃষ্ণা মালিক, অনিমিখ পাত্র, অনুপম মুখোপাধ্যায়, রমিত দে, রত্নদীপা দে ঘোষ, অরূপরতন ঘোষ, দীপান্বিতা চ্যাটার্জী মণ্ডল, কৌশিক মুখোপাধ্যায়, নিসর্গ ভট্টাচার্য, চন্দন ভট্টাচার্য।

প্রেসে কাজ চলার সময়,কোন সুগভীর পরামর্শে জানি না, প্রুফে সংশোধন করে দেওয়া ভুল মূল কপিতে লাফিয়ে ফিরেআসতো। অথবা সে আমারই চোখের দোষ। কিন্তু বই হাতে পাওয়ার পরে এক্কেবারে নক আউট!শেষ পর্যন্তএকটা পাতা পত্রিকা থেকে ফেলে সেখানে নতুন পেজ আলাদাভাবে ছাপিয়ে এনে জুড়তে হয়েছে। কিন্তু বস, কাহিনিতে টুইস্ট আছে এর পরেও। যে-বন্ধুর বাড়িতে রেখেছিলাম গ্রন্থির স্বদেশল্যান্ড, সেখানে হঠাৎ জলে ভিজে নষ্ট হয়ে গেল সত্তর কপি পত্রিকা!

 

টু বি অর নট টু বি কন্টিনিউড…

এই কাগজ কেড়ে নিয়েছে আমার অনেক জীবন।

সম্পাদক হতে তো চাইনি কোনওদিন। আর পত্রিকা, যাকে ইংরেজিতে পিরিওডিক্যাল বলে, নয় গ্রন্থি। ‘আমরা সত্তরের যীশু’ আবার মনে পড়ে যাবে — নির্মলদারা ম্যাগাজিনের প্রথম পাতায় লিখে দিতেন “যখন তখন আবির্ভাব”, নিজের চরিত্রের এমন সপ্রতিভ হাজিরা আমি আর দেখিনি!

এই কাগজ ছিনিয়ে নিয়েছে আমারনিজের লেখার সময়, মানসিক সুস্থতা।

হারাতে হারাতে এতদূর!

এবার হাসতে হাসতে লেখাটার এন্তেকাল হোক।

এক সাহিত্যিকের মধ্য কলকাতার বাসায় গেছি লেখা আনতে। ২০০৪-এর কথা। প্রথম দিন বললেন, আরেকদিন আসুন। দ্বিতীয় দিন যেতে সামনে বসিয়ে ল্যাপটপে লিখে প্রিন্ট দিয়ে দিলেন। তারপর গ্রন্থি বেরোতে ফোন করে কপি হস্তান্তর করতে গেছি। লেখকের পোষা বেড়াল ছিল এক, সুন্দরবনের বোনপো-বোনঝিরা যার কাছে নরখাদক হওয়ার ট্রেনিং নিতে পারে। বসার ঘরে সে আমাকে স্বাগত জানিয়ে ডানপায়ের গোড়ালির ওপরে রগের দুপাশ কামড়ে ধরল আর মোজার আস্তর ভেদ করে দাঁত বসে গেল তৎক্ষনাত। পা সরাতে গেলে কামড় দ্বিগুন তীক্ষ্ণ! অসহায়ভাবে লেখকের দিকে ইশারা করলাম, তিনি মিষ্টি আদুরে ডাক দিলেন। বেড়ালের তাতে কলা-য় শোনে! সে ডান ছেড়ে আমার বাঁ পা ধরেছে। একটু জোরালো নির্দেশ দিয়ে পোষ্যটিকে সরিয়ে আনলেন তিনি। চায়ে আপ্যায়িত হওয়ার জন্য এর পর মিনিট কুড়ি থাকতে হয়েছিল, তার মধ্যে আমার গোড়ালি নিয়ে বেড়ালের ছিরকুটি চলল আরওবার তিনেক। ঘর থেকে বেরিয়ে মোজা খুলে দেখিরক্তারক্তি কাণ্ড, পাদুটো সে (গব্বরের ভাষায়) খুরজ খুরজ করে দিয়েছে।

বাড়ি ফিরে ফোন করলাম সাহিত্যিককে। না না, কোনও অভিযোগ জানানোর প্রশ্নই নেই! অত বড় সেলিব্রিটি লিখিয়েকে সেটা করা যায় নাকি? শুধু জানতে চেয়েছি, আপনার আদরের জীবটি সর্বাঙ্গীন কুশলে আছে তো (তার স্বাস্থ্যের ওপরেই যেহেতু এখন আমার বাঁচা-মরা)! লেখক হাসতে লাগলেন, উফ, আপনিও না! আরে বাবা, ভয় পাওয়ার কিচ্ছু হয়নি। কিন্তু জন্ম-আতঙ্কিত আমি দুতিনদিন পরে আবার ডায়াল করেছি। এবার বললেন, বেশ, একদিন চলে আসুন আমার বাড়ি, ওকে নিজেই দেখে যান।

সেই আমন্ত্রণের অর্থ আমি আজও বুঝতে পারি না…!

গ্রন্থি ধারাবাহিকের শেষ এপিসোড কোনটা? এই প্রাণযেদিন বেমিশাল বেরিয়ে যাবে; হয় সিস্টের, নয় খ্রিস্টের আক্রমণে।অথবা চলে যে যায়নি, তাই বাজোর দিয়ে বলতে পারে কে!