ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ধর্ষণ শব্দটির সাথে আমরা সবাই  পরিচিত। বাংলাদেশে ইদানিং অনেক ধর্ষণের ঘটনা উঠে আসছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো বাংলাদেশেও দিন দিন ধর্ষণের হার বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের বিভিন্ন জরিপ নিম্নে দেয়া হলো ।

  • # ২০১০ সাল-৪১১ জন
  • # ২০১১ সাল-৬০৩ জন
  • # ২০১২ সাল-৮৩৬ জন
  • # ২০১৩ সাল-৭১৯ জন
  • # ২০১৪ সাল-৭৭৯ জন
  • # ২০১৫ সাল-১০৬৯ জন
  • ২০১৬ সাল-৮৬৭ জন (অক্টোবর মাস পর্যন্ত)

(তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির দেয়া ধর্ষণের পরিসংখ্যান )

 

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১২ সালে ৮৬ জন, ২০১৩ সালে ১৭৯ জন, ২০১৪ সালে ১৯৯ জন, ২০১৫ সালে ৫২১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ চিত্র থেকেই স্পষ্ট- প্রতিবছরই শিশু ধর্ষণের ঘটনাও বেড়েই চলেছে। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ৬৮৬টি শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ইভটিজিং, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে সারা দেশে ৭২৭টি শিশু যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। তবে তাদের জরিপ অনুসারে ২০১৫ সাল থেকেই শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪তে সর্বমোট ২২৪টি শিশু যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিল ।

২০১০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত যে ধর্ষণের সংখ্যা জানলাম, তা শুধুমাত্র পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা এবং প্রকাশ পাওয়া ধর্ষণের খবর। আমি মনে করি বাস্তবে এর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ অনেক অল্প সংখ্যক ভুক্তভোগী ধর্ষণের কথা প্রকাশ করে। বেশিরভাগ মানুষই মান-সম্মানের কথা ভেবে ধর্ষণের খবর প্রকাশ করতে চায় না। এছাড়া দাম্পত্য ধর্ষণের খবর তো বাংলাদেশে কখনই উঠে আসে না। যদি এসব প্রকাশ করা হতো তাহলে হয়তো দেখা যেতো মুহূর্তেই পরিসংখ্যানের হিসাব কয়েকগুণ বেড়ে গেছে ।

যা হোক ধর্ষণের কারণ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই দায়ি করে নারীর পোশাককে। অবশ্য ধর্মান্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে এর থেকে বেশি কী বা আশা করা যায়। বাংলাদেশে ধর্মান্ধতা এতটাই প্রকট যে ধর্ষণ আসলে কী সেটা না জেনেই মানুষ শুধুমাত্র ইসলাম কর্তৃক দেয়া পর্দার নির্দেশ অমান্য করার দায়ে ধর্ষণের দোষ চাপায় সেই ধর্ষিতা অসহায় নারীর উপরই। কিন্তু আমার জ্ঞান ও বিবেক বরাবরই বলে ধর্ষণের জন্য মানসিকতা দায়ি , পোশাক নয়।  ধর্ষণ কী এবং এর জন্য আসলে দায়ি কী এ ব্যাপারে কিছু আলোচনা করা যাক।

প্রথমত আমাদের যেটা জানতে হবে তা হলো ধর্ষণ কী বা কাকে বলে । বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূত্রানুসারে ধর্ষণের সংজ্ঞা-

“ধর্ষণ একপ্রকার যৌন অত্যাচার। সঙ্গী বা সঙ্গিনীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা অনুমতি ব্যতিরেকে যৌনাঙ্গের মিলন ঘটিয়ে বা না ঘটিয়ে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়াকে ধর্ষণ বলা হয়।”

এই সংজ্ঞা থেকে দুটি বিষয় লক্ষ্য করুন।

*ধর্ষণের সংজ্ঞায় উল্লেখ করা হয়েছে ’সঙ্গী বা সঙ্গিনী’ অর্থাৎ শুধুমাত্র নারী নয় বরং নারী কর্তৃক পুরুষ এমনকি সমলিঙ্গের মানুষের মাঝেও ধর্ষণ হয়। বহির্বিশ্বে নারী কর্তৃক পুরুষ ধর্ষণের ঘটনা অহরহই ঘটে। শুধু বহির্বিশ্বে নয় , ইদানিং বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও নারী কর্তৃক পুরুষ ধর্ষণের খবর উঠে আসে। এখন কথা হচ্ছে নারী কর্তৃক পুরুষ যখন ধর্ষণ হয়, তখন ধর্মান্ধগণ কাকে দোষ দেবেন? পুরুষের পোশাককে নাকি ঐ নারীর মানসিকতাকে? নাকি এখন বলবেন ঐ পুরুষ নিশ্চই মিনি স্কার্ট পড়ে ঘুরে বেড়াতো তাই ধর্ষণ হয়েছে । যদি পোষাকই ধর্ষণের জন্য দায়ী হয়ে থাকে , তবে নিশ্চই ধর্ষণ এড়াতে পুরুষকেও বোরখা পড়ে বাইরে বের হতে হবে!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯% ধর্ষণের ঘটনা ঘটে পুরুষ কর্তৃক পুরুষ ধর্ষণের। একজন পুরুষ আর একজন পুরুষকে ধর্ষণ করে কী কারণে? পোশাকের শালীনতার অভাবে নাকি নোংরা মানসিকতার বদৌলতে! নিঃসন্দেহে নোংরা মানসিকতার জন্যই ।

সংজ্ঞায় উল্লেখ করা হয়েছে ’ইচ্ছার বিরুদ্ধে, অনুমতি ব্যতিরকে’ যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার কথা । এখন একটু গভীরে ভাবুন, অনুমতি বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনতা কি শুধু রাস্তাঘাটে বখাটের দ্বারাই ঘটে নাকি ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনতা আপনার-আমার ঘরেও ঘটে? আর একটু ডিটেলসে বলি। বাংলাদেশে এ্যারেন্জ ম্যারেজের ব্যবস্থাটা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এটি এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে বাবা-মায়ের চাপে পড়ে বহু নারী নিজের প্রেমিককে নিয়ে দেখা স্বপ্নগুলি মাটি করে দিয়ে আরেকজনের সাথে সংসার পাততে বাধ্য হয়। কিংবা অনেক সময় যথেষ্ট সুযোগের অভাবে বিয়ের আগে হবু স্বামীর সাথে তেমন একটা ভালবাসাপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে ওঠে না । তো স্বভাবতই সেই নারী নতুন একজনের সাথে সম্পর্কের শুরুতেই যৌনকর্মে লিপ্ত হতে চায় না । কিন্তু বিয়ের মাধ্যমে নারীকে নিজ ইচ্ছেমতো ভোগ করার লাইসেন্সের সুবাদে একদল ভোগী পুরুষ প্রথম রাতেই নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সাথে একরকম জোর করেই যৌনকর্মে লিপ্ত হয়। আর ভোগী লাইসেন্সের কারণে নারী এর প্রতিবাদও করতে পারে না ।

এবার শুনুন , আপনি কী জানেন এটাও এক প্রকার ধর্ষণ যার নাম ’দাম্পত্য ধর্ষণ’! এর জন্যও কী পোশাক দায়ি? বাসর রাতে কী স্ত্রী মিনি স্কার্ট পড়ে বসেছিলো বলে ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে নাকী স্বামীর ভোগী মানসিকতার কারণে? তবে কী ধর্ষণ এড়াতে বাসর রাতে নারীর বোরখা পড়ে থাকা উচিত ছিলো?

এছাড়া সময়ে অসময়ে বহু নারী নিজ আবাসেই এভাবে ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিজের স্বামী কর্তৃক ধর্ষিত হয় , যার খবর আমাদের পর্যন্ত কখনই পৌঁছায় না। লেখাটি লিখতে লিখতে মনে পড়লো একজন মহিলার ঘটনা যা না বললেই নয়। তার সাথে আমার যখন পরিচয় হয়, তখনো আমার দাম্পত্য ধর্ষণের অস্তিত্ব নিয়ে কোন জ্ঞান ছিল না। কিন্তু সে বেচারি দাম্পত্য ধর্ষণের বাস্তব শিকার ছিলেন। তার কাছ থেকে জানতে পারি এ্যারেন্জ ম্যারেজের বদৌলতে কলেজ জীবনে তার বিয়ে হয়ে যায় তার থেকে বয়সে বেশ বড় একজন পুরুষের সাথে। বিয়ের আগে কাছে থেকে সেই পুরুষকে জানার সুযোগ না হওয়া সত্বেও বিয়ের প্রথম রাত থেকেই সে বর্বরতার স্বীকার হতে থাকে। আরও জানতে পারি তার স্বামীর জন্য সে অনেকটাই যৌনকর্মীর মতো। এবং সব থেকে অবাক করা বিষয় ইতিমধ্যে তিন সন্তানের জননী হওয়া সত্বেও সময়ে অসময়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার সাথে এমন বর্বরতা এখনো চলে। এখনো কী বলবেন ধর্ষণের জন্য মানসিকতা নয়, দায়ী নারীর পোশাক?

পোশাক নাকি মানসিকতা দায়ী, তার বিচার করতে হলে আরেকটি বিষয় না বললেই নয়। আচ্ছা, বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা অনেক সময়ই উঠে আসে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, আরও বহু দেশে শিশু ধর্ষণ নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু শিশু ধর্ষণ হয় কেন? শিশুরা মিনি স্কার্ট পড়ে থাকে বলে ? শিশু বাচ্চাদের দেখেও কী মনের মধ্যে কামনার সৃষ্টি হয়? তাহলে কী জন্মের পর থেকেই শিশু বাচ্চাদের পা পর্যন্ত আলখেল্লা পড়িয়ে রাখতে হবে? নাকি নিজের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে?

৭১ এর যুদ্ধে পাকিস্তানিরা এবং জামায়েত ইসলামী রাজাকাররা যে হাজারো মা-বোনকে ধর্ষণ করেছে , এ সব কী পোশাকের কারণে? ৭১ এ কী তারা মিনি স্কার্ট পরে ঘুরে বেড়াতো ? নাকি নিজেদের ভোগী মানসিকতার খোরাক মিটাতে জানোয়ারগুলো ধর্ষণ করতো?

পোশাকই যদি ধর্ষণের মূল কারণ হবে, তাহলে আরব দেশগুলোতে কেন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে যেখানে সবাই বোরখা পড়া? খারাপ মানসিকতা সৃষ্টির জন্য আপনি নারীর অর্ধনগ্ন পোশাককে দায়ী করছেন? তাহলে ইন্টারনেটে রেকর্ডতুল্য পর্ন সিনেমা কেন আরব দেশগুলো থেকে আসে? যেখানে আশেপাশে সবাই বোরখা পড়ে চলে, সেখানে কামনা কী করে সৃষ্টি হয় যে পর্নসাইটে আরব দেশগুলোর রেকর্ডতুল্য ক্লিক পড়ে!

তনুকে যখন ধর্ষণ করে হত্যা করা হলো , তখনো বাংলাদেশের ধর্মান্ধ জামাতীরা অপপ্রচার চালিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলো যে তনুর ধর্ষণের জন্য তনুর পোশাকই দায়ী। কিন্তু তনুর ছবিগুলো তখন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে সে  বোরখা পরিহিতা ছিল। কতটা নির্লজ্জ মানসিকতা হলে একটি মৃত মেয়ের উপর মিথ্যে দোষ চাপানো যায় ভাবতে পারেন? কিংবা কিছু দিন আগে যে শিশুটি মসজিদের ভিতর ঈমাম দ্বারা ধর্ষিত হল তার কথাই বা কী বলবেন? এটাও কি পোশাকের দোষ? এমন নিচ মানসিকতার বলেই তো ধর্ষণ সম্ভব, পোশাকের কী দোষ!

শুনুন, ধর্মান্ধ হয়ে আপনি যতই বলুন পোশাক দায়ী ধর্ষণের জন্য, কিন্তু বাস্তব হলো মানসিকতা। বোরকা হলো নিজের অসঙ্গতিকে বস্তাবন্দি করার পোশাক । বাংলাদেশে পতিতারাও বোরকা পড়ে। তারা নিশ্চই ধর্ষণ এড়াতে নয়, বরং বোরকার আড়ালে  সুবিধার জন্য। এ পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের অধিকার আছে তার নিজের ইচ্ছেমত নিজেকে সাজানোর। আপনি নিশ্চয়ই আপনার নোংরা মানসিকতাকে বদ্ধ রাখতে আরেক জনের অধিকার কেড়ে নিতে পারেন না। মনে রাখবেন, আপনি আপনার নোংরা মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটাতে পারলে সমগ্র নারী জাতিকে বস্তাবন্দি করলেও ধর্ষণ বন্ধ হবে না …।