ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

দোসরা অক্টোবর, ২০১৭। আজ সকাল ৯টার দিকে আমার দিনের দ্বিতীয় দফা ঘুম ভাঙ্গিয়ে একটা ফোনকল আসে +৮৮০১৯৯৯***৩৮৩ নাম্বার থেকে। ঘুম ভাঙাতে এমনিতেই কিছুটা রাগ ছিলো, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আননোন নাম্বার দেখেই রাগটা আরও বেড়ে যায়। কে রে হতভাগা তুই….?

কয়েক টন বিরক্তি মাথায় নিয়ে কলটা রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে একটা খিটখিটে বিদখুটে মেয়েলী কন্ঠস্বর উৎকট শুদ্ধ ভাষায় এক বিকট সুসংবাদ দেয়। অনেকক্ষণ ধরে অনেক ভূমিকা করে উনি যা বলেন সংক্ষেপে এই, “আমার বাংলালিংক নাম্বারের শেষ ৩ ডিজিট ১৯০ হওয়ার কারণে আজ আমার ভাগ্য খুলে গেছে। বাংলালিংকের যেসকল সেলনাম্বারের শেষ ৩ ডিজিট ১৯০ তাদের একটি রূদ্ধদার লটারী প্রতিযোগিতায় আমার লাকি নাম্বারটি রানারআপ (জীবনেও ফার্স্টবয় হতে পারলাম না) হয়েছে এবং তাই আমি পুরষ্কার সরূপ ২৪,১৪,৭২৫ টাকা পাবো।”

সিরিয়াসলি!! এটা কি ২০১৭, নাকি ঘুমের মধ্যেই আমি কোন টাইম মেশিনে ২০০৭ এ চলে আসছি। ২০১৭ তো বায়োমেট্রিক সিমকার্ডের যুগ। যাহোক, টাকার অঙ্কটা শুনেই আমার মুখ দিয়ে আপনা আপনি চলে আসলো, ‘f*****g genius’. কিন্তু বড্ড ভুল হয়ে গেলো। আমার মুখে এফ ওয়ার্ড (F word) শুনে ফোনের ঐপাশে বাংলালিংকের সিইও এর গোপন শাশুড়ি খুব রাগ কর ফোন কেটে দিলেন। আমি সাথে সাথেই কল ব্যাক করলাম। ভাবলাম কাস্টমার কেয়ারের মেবি ব্যালেন্স শেষ! 😀 কিন্তু হায়! আমি ভুল ছিলাম। উনি আমাকে ব্ল্যাকলিস্টে ফেলে দিছেন। পোড়া কপাল, পেয়ে ধন হারালাম।

এ তো গেলো গল্পের প্রথম কিস্তি। উপরের বিষম খাওয়ানো ঘটনাটুকুর পরে আমি কিছুক্ষণ থ মেরে বসে থাকলাম। কি হলো এটা। যাইহোক, এটা ২০১৭ সাল এবং আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশে অবস্থান করছি। ঐ খিটখিটে বিদখুটে মেয়েলী কন্ঠের মালকিনের জানা দরকার, মার্কিন মুলুকের ৯১১ এর মতো এখন আমাদেরও ইমারজেন্সি নাম্বার ৯৯৯ রয়েছে। দিলাম কল।

সেখানে আরেক রেকর্ডেড মেয়লী কন্ঠের প্যারা। উনি বিনীতভাবে জানালেন সার্ভিসটি কেবল সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চালু থাকে। যদিও তখন সাড়ে নয়টা বাজে। সেই রেকর্ডেড কন্ঠস্বর আমাকে ডিএমপি এর হটলাইন ১০০ ধরায়ে দিয়ে কল কেটে দিলো। কি আর করা! দিলাম ১০০- এ কল। দুই-তিন বার চেষ্টায় একজন অপারেটর ফোন ধরলো। আমি উনাকে সব কিছু বলে প্রতারক চক্রের ঐ নাম্বারটা দিতে চাইলাম। কিন্তু উনি নিতেই চাইলেন না। বরং আমাকে কিছু পাল্টা উপদেশ দিয়ে নিয়মের মারপ্যাচ বুঝিয়ে বললেন, এই ব্যাপারে উনি কোন অ্যাকশন নিতে পারবেন না। এভাবে কোন ফোনকল থেকে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কাউকে ধরতে পারে না। আমাকে স্থানীয় থানায় গিয়ে জিডি করতে হবে।

এই তো দিলো ভয় ঢুকায়ে। আমি সবে ইন্টার পাশ করা এক পিচ্চি পোলা। এই থানা-মামলার মারপ্যাচে কেন যাবো? উনি অভয় দিয়ে বললেন, আমাকে জিডি করার পর কেবল আর একবার থানায় যেতে হবে। সেটাও অপরাধীকে ধরার পর অপরাধ যখন অস্বীকার করবে তখন, গিয়ে কেবল আমার ফোন থেকে কল পাওয়ার প্রমাণ দেখাতে হবে। তখন পুলিশই কল রেকর্ড বের করে আনবে আর বাকী কাজ করবে। এই ‌বলে উনি কল রেখে দিলেন।

আমি ভাবলাম, ও! এই ব্যাপার। যদিও‌ মনের ভেতর কিছুটা ভয় পাচ্ছিলাম তবুও খুব করে চাচ্ছিলাম চক্রটা যেন ধরা পরে। হয়তো আরও কতজন কে এভাবে কল ‌দিয়েছে। সহজ সরল কেউ টাকা দিয়ে ঠকতেও পারে। আর, থানাও তো ঘরের কাছে, হেঁটে গেলে ২ মিনিট লাগে না। জনগণের টাকায় সরকার ভর্তুকি দিয়ে দিয়ে ১২ বছর ধরে পড়াচ্ছে, সুযোগ পেয়েও কিছুটা প্রতিদান না দিলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাবো। রওনা দিলাম তেজগাওঁ থানায়।

“ফিরিয়ে দাও, আমার হারানো সময়, ফিরিয়ে দাওওওও…..।”

থানা থেকে বেড়িয়ে আসার সময় মাইলসের ফিরিয়ে দাও গানর কথাগুলো এভাবে পাল্টে চিৎকার করতে ইচ্ছে করছিলো। পুলিশ হটলাইন থেকে আমাকে থানায় পাঠালো। আর থানায় যাওয়ার পর ওরা বলে, “আপনি যদি ওদের কথামতো কিছু টাকা পাঠাতেন তবে আমরা জিডি নিতে পারতাম। কিন্তু যেহেতু আপনি কোন টাকা পাঠাননি, তাই আমরা জিডি নিতে পারছি না!”

-“কিন্তু স্যার, আমি না হয় টাকা দেইনি, কিন্তু চক্রটা তো অন্য কারও কাছ থেকে টাকা আনতেও পারে “
-“দেখুন, এভাবে জিডি নেওয়া যায় না, আপনি বরং বাংলালিংক অফিসে এই নাম্বারটা দিয়ে ওদের প্রতারণার কথা জানান। তাহলে অফিস থেকে এই নাম্বারটা বন্ধ করে দিবে।”

-“কিন্তু তাহলে তো পেছনের মানুষগুলো ধরা পরলো না। ওরা আবার নতুন নাম্বার খুলে ক্রাইম করবে। এখন সব সিম বায়োমেট্রিক করা। আপনারা খুব সহজেই ট্র্যাক করে এর পেছনের মানুষগুলোকে ধরতে পারেন।”
-“পেছনের মানুষগুলো ধরা পরে না বাবা, যারা লোভ করে টাকা দেয় ওরাই ধরা পরে।”

এই ছিলো পুরো ব্যাপারটা। আজ বুঝলাম, ‘টিনের চালে কাক, শালা আমি তো অবাক’- ছন্দটা বাংলা ভাষায় এতো বিখ্যাত কেন। বাঙালিরা হর হামেশাই অবাক হয়।

উপসংহারে এসে আমার রাগ হচ্ছে তাদের উপর, যারা বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্যে মারামারির পরে পুলিশ পৌঁছানো নিয়ে ট্রল করে। সিনেমার কি দোষ ভাই, বাংলাদেশের পুলিশের নিয়মই তো ঘটনা ঘটার পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো। কেউই ঝামেলার ভাগ নিতে চায় না।

‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,
হায়, বৃথা দিলাম বৃথা যায়, বৃথা যায়।’