ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন । ব্যয়বহুল ও বিশ্বজুড়ে তোলপাড় করা নির্বাচন । নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পর প্রথম মঙ্গলবার এই প্রতীক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে । এই নির্বাচনের কি এমন বৈশিষ্ট্য যে সারা দুনিয়া হা করে চেয়ে থাকে । সারাবিশ্ব যেখানে উন্মুখ সেখানে খোদ মার্কিনীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় বা কতটুকু ।
পৃথিবীর পরাশক্তির সাথে অন্যান্য বিশ্বের কি সম্পর্ক হবে এটাই কী নির্ভর করছে নির্বাচনটির ওপর ?

এই নির্বাচনে ব্যয়ের মাত্রা ক্রমান্বয়ে সীমা ছাড়িয়েছে । এতে প্রার্থী বা দলের আর্থিক সঙ্গতি কতটুকু । সঙ্গতি ছাড়িয়ে লাগামহীন খরচ বাড়তে থাকলে বিকল্প অর্থ সংস্হান অর্থাৎ শিল্পপতি ও ধনীদের থেকে চাঁদা আদায় শুরু করে দিলেন তাঁরা । বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় সুবিধা, চাকরির ব্যবস্হা ইত্যাদি করে দেয়া । এর শুরু সম্ভবত ১৮২৮ সালে `Spoils System` এর মাধ্যমে । চাঁদা দেয়ার বদৌলতে শিল্পপতিরা যাতে আবার সীমাহীন রাজনৈতিক প্রভাব না খাটাতে পারে সেজন্য নিয়ন্ত্রণমূলক আইনও পাস করা হলো । তেমন আইন হচ্ছে ‘ফেডারেল ক্যামপেইন ফান্ড ডিসব্লোসার ল‘ (১৯১০), ‘ফেডারেল ক্যামপেইন ফাইন্যান্স লেজিসলেশন (১৯২৫), ‘ফেডারেল ইলেকশান ক্যামপেইন এ্যাক্ট‘ (১৯৭১) । পরবর্তীতে এ সকল এ্যাক্টের সংশোধনীও হয়েছে ।

এই নির্বাচনে মার্কিন জনগণ কতখানি উৎসাহী হয়, তাঁদের মাথা ঘামানোর পরিমাণ কতদূর পর্যন্ত গড়ায় এসব নিয়ে বিতর্ক আছে । এই মুহূর্তে আমরা যারা দেশে বসে রাজা-উজির মেরে চলেছি তার চেয়ে হয়ত ঢের ভাল ব্যাখ্যা দিতে পারবেন যারা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই অবস্হান করছেন । একবার ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার জরিপে মার্কিন জনগণের রাজনীতি সচেতনতার চিত্র বেরিয়ে এসেছিল । দেখা গেছে প্রাপ্ত বয়স্কদের শতকরা ৪০ ভাগ ভাইস প্রেসিডেন্ট এর নাম বলতে পারে না । শতকরা ৫০ ভাগ স্পিকারের পরিচয় জানে না । এর নাকি উপযুক্ত ব্যাখ্যাও আছে । রাষ্ট্র যখন জনগণকে উপেক্ষা করে অধিকার বঞ্চিত করে তখনই নাগরিকরা রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠে । তাহলে বোঝা গেল মার্কিন জনগণের বঞ্চনা নেই অথবা কম । সত্যাসত্য মার্কিন জনগণ বিচার করবে ।

মার্কিন নারীদের পুরুষের চেয়ে ভোট দানের সংখ্যা বেশি হয় । অথচ উচ্চশিক্ষিত নারীরাও নাকি রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন আবার কারো মতে নারীরা নিস্পৃহ । বারাক ওবামা এবং মিট রমনির ক্ষেত্রে নারী- পুরুষের ঝোঁক কোনদিকে গড়ায় সময় বলে দেবে । এমন কথা চাউর ছিল বিল ক্লিনটনের চেহারা আর ক্যারিশমা তাঁকে সফলতা এনে দিয়েছে । তেমনি ওবামার তারুণ্য আর ক্যারিশম্যাটিক চাল চলন তাঁকে আবার মার্কিন জনগণ হোয়াইট হাউজে রেখে দেবে নাকি মিট রমনিকে ঐ সাদা বাড়িতে প্রবেশের সুযোগ দেবে সেটা দেখার জন্য ৬শ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ের এই নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে ।

অন্তর্মুখী স্বভাবের মার্কিন জনগণ তাঁদের যথেষ্ট সম্পদ নিয়ে তৃপ্ত ছিল । কী এমন হলো যে কোনো এক মার্কিন সরকার থেকে শুরু হলো বাইরের বিশ্বের প্রতি শ্যেন দৃষ্টি দেবার । যত ভালবাসা বোধ হয় ঐ জ্বালানী পুঁজি নিয়ে । বিশ্ব পরিস্হিতি নিয়ে মার্কিন জনগণ কতটা উৎগ্রীব ? বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন তাদের নাকি মাথাব্যথা নেই এ ব্যাপারে । কিন্তু মার্কিন প্রশাসন সারা বিশ্বের অভিভাবকত্ব নিতে চায় । সেই জেঁকে বসা অভিভাবক কে হবেন সেটাই ভাবনা এখন ।

ইসরাইল কাকে চায় । বারাক ওবামা না মিট রমনিকে । ইসরায়েল এখনও ওবামাকে দিয়ে ইরান আক্রমণ করাতে পারেনি । এদিকে সিরিয়াকে সাহায্য যোগাচ্ছে ইরান । ইসরাইল এর প্রধানমন্ত্রি বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে ওবামার জোড়াতালির সম্পর্ক যদিও দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নিয়ে মতভেদ কম । এদিকে মিট রমনি যদি ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে ইসরাইল ইরানে হামলা চালালেও মিট রমনি চোখ কান বুঁজে থাকবেন । অধিকাংশ ইসরাইলি ইহুদিরাও রমনিকে আশা করে ।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় কে আসীন হলো তা জেনে ফিলিস্তিনি জনগণের লাভ-লোকসান কতটুকু ? ইসরাইল বছরের পর বছর ফিলিস্তিনের সাথে বৈঠকে বসার প্রয়োজনই বোধ করছে না । ফিলিস্তিনের বিভক্ততার সুযোগে আরও আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে আবাসন বাড়িয়ে চলেছে ইসরাইল । এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী ? এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরব বসন্তের নামে চলছে দুর্যোগ । সাম্রাজ্যবাদী দাপট । রমনি নির্বাচিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে কিনা সে আশা করা অবান্তর ।

মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো এক কাতারে আসেনি । যদিও সে আশা ক্ষীণ । মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে এন্তার প্রশ্ন রয়েছে । এসব দেশে কি স্বৈরাচারের পতন হয়েছে নাকি সাম্রাজ্যবাদের প্রলয় ঘটে গেছে । এ প্রশ্ন সকলের মনে ঘুরপাক খাবে নিরন্তর । বারাক ওবামা চারবছর আগের নির্বাচনী প্রচারণায় আফগানিস্তান সফর করেছিলেন । আফগান রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাইয়ের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সখ্যতা রয়েছে । আফগান জনগণ মোটামুটি ওবামাকে তাদের ভরসার জায়গা ভাবতে পারে । এদিকে মিট রমনি তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় আফগানিস্তানকে রাখেননি । এটা সংকুচিত নীতি কিনা গবেষক যারা তারা নির্ণয় করবেন ।

পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় শিশু থেকে শুরু করে নিরীহ মানুষ হতাহত হচ্ছে । এই প্রেক্ষাপটে তারা ওবামাকে সমর্থন জানাবেন কেন এমন অভিযোগ উত্থাপন সেই দেশের জনগণের কাছ থেকে এসেছে । অস্ত্র নিরস্ত্রিকরণ বিষয়ে দুই প্রার্থীর নীতিতে কোনো হেরফের আছে বলে মনে হয় না । তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় তারা কীভাবে মেটাবে সে হিসাব সম্ভবত উভয় পক্ষেরই এক ও অভিন্ন ।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির চেহারায় এমন কোনো পরিবর্তন আসেনি যাতে বৈদেশিক ইস্যুগুলো নিয়ে অন্যান্য দেশের জনগণ বা সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করতে পারে ।

এদিকে গত কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশের ওপর টিকফা চুক্তি নিয়ে চাপ আছে । আগে ছিল টিফা এখন পরিমার্জন হয়ে টিকফা । বাংলাদেশ সরকার সবগুলো বিষয়ের উপর ঐকমত্য পোষণ করেনি বলে তা ঝুলে আছে । মিট রমনিকে যদি মার্কিন জনগণ বেছে নেয় তবে সে উপাখ্যান কোন দিকে গড়াবে বলা যাচ্ছে না এখনই ।

মার্কিন অর্থনীতি নাকি সেদেশের ভোটারদের মগজে চরম প্রভাব ফেলে । মার্কিন জনগণ হয়ত তাকেই নির্বাচিত করবে যে আগে নিজের দেশের জন্য মঙ্গলজনক সমাধান দেবে অথবা বয়ে আনবে ।

ছবিসূত্র: ডয়চে ভেলে থেকে সংগৃহিত