ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

৯ ডিসেম্বর বিএনপি‘র ডাকা অবরোধ কর্মসূচির ব্যাপক সহিংসতায় বিশ্বজিৎ দাসকে হত্যা করা হলো ও অবরোধকারীদের ধাওয়া করা বাসের চাপায় মংলা প্রামাণিক খুন হলো । বিশ্বজিৎরা খুন হোক ক্ষতি নেই । ভবিষ্যতে কত নিরীহ বিশ্বজিৎ, মংলা জন্ম নেবে তার ইয়ত্তা নেই । বাংলাদেশের নারীদের জরায়ু নাকি খুব উর্বর । কিন্তু দুস্কৃতিকারীর সংখ্যা তো নগণ্য । বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে যে সচেতনতাবোধ দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে খুব কম মায়ের পেটেই দুস্কৃতিকারী জন্ম নেবে ( যদিও মায়ের পেট থেকে মন্দ চরিত্র নিয়ে কেউ জন্মলাভ করে না ) । তাই এখনকার টিকে থাকা কিছু সন্ত্রাসীদের বেঁচে থাকার দরকার আছে বৈকি ।

এই পাষণ্ডরা না থাকলে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যবসায় মন্দা দেখা দেবে ( সকল মিডিয়ার কথা বলছি না ) । টক শো‘র অনুষ্ঠানে ভাটা পড়বে । সন্মানিত ‘টকেটিভ‘ যারা আসেন তাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া স্যুভনির মগ এবং অন্যান্য তারা পাবেন না । মানবাধিকার (!) কর্মীদের মশা মাছি মেরে সময় কাটাতে হবে । তাতে কি জীবন চলে । এই সন্ত্রাসীরা না থাকলে ভূমি দস্যুদের ভূমি দখল করে দেবে কারা । ভূমি দস্যুতার মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা কামাই করা অর্থের বৈধতা দিতে যে পত্রিকার জন্ম দেয়া হলো, যে টিভি চ্যানেলের জন্ম হলো তার কি হবে । ব্যবসা যে লাটে উঠবে । মিডিয়া মালিকরা কেন মিডিয়া মোগল বনে যেতে চান । কিশোর বয়সে রুপার্ট মারডকের নাম মিডিয়া মোগল হিসেবে শুনতাম । বাংলাদেশের মিডিয়া মোগলের নাম মিডিয়ার কল্যাণেই জেনেছি । মোগল সম্রাটদের দেখিনি কিন্তু মিডিয়া মোগলদের দেখলাম ।

বিশ্বজিৎ, মংলা প্রামাণিক আপনারা শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসীদের হাতে জীবনটুকু সঁপে দিয়ে সার্থক হলেন । যত দায় চাপিয়ে দিয়ে গেলেন আমাদের মতো অকর্মাদের ঘাড়ে । আমি নিশ্চিত বিশ্বজিৎ, আপনি আমাদেরকে লক্ষ্য করে একরাশ ঘৃণা ছুঁড়ে দিয়ে গেছেন । মুজাহিদ তুমি তো শিবির কর্মী । তোমার সরলতা না নির্বুদ্ধিতা জানি না । তোমাকেও বলি, জিহাদের নামে সরল বিশ্বাসে যে পঙ্কিল জগতে তুমি নাম লিখিয়েছিলে তার খেসারত দিয়ে তোমাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো । পুলিশ ছুঁড়েছে নাকি টিয়ার গ্যাস কিন্তু তুমি নিহত হলে গুলিতে । তুমি শেষ পর্যন্ত তোমার দলের ‘শিকার‘ হলে কিনা জানিনা ।

এক সামরিক স্বৈরশাসকের কূট রাজনৈতিক খেলায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে যুদ্ধাপরাধের দল নিষিদ্ধ জামায়াতকে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয় । যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনেন তিনি । গোলাম হয়ে যান আযম । শাহ আজিজ হন প্রধানমন্ত্রি । খান এ সবুরের মরদেহ স্হান পায় সংসদ ভবন চত্বরে ।

১. ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ দালাল আইন জারি করা হয় যার P.O.No. Vlll of 1972.
২. ১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন জারি করা হয় যার P.O.No. 149 of 1972.
৩. ১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গোলাম আযমদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয় ।

এরপর ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর Second Proclamation Order No. 3 of 1975 এর প্রথম তফসিল থেকে বাংলাদেশ দালাল আইনের যে সেফগার্ড ছিল তা তুলে দেয়া হয় ।

১৯৭৬ সালে Second Proclamation Order No.3 of 1976 জারি করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাবলী তুলে দিলেন তিনি ।

উল্লেখ্য সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদটি ছিল-
“জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে; তবে শর্ত থাকে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোন সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোন প্রকারে তাহার তৎপরতায় অংশ গ্রহন করিবার অধিকার কোন ব্যক্তির থাকিবে না ।“

Proclamation Order No. 1 of 1977 জারি করে সংসদে নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ এর কিছু অংশ তুলে দেয়া হয়। সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ তুলে দিয়ে দালালদের ভোটার হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হলো ।

আজ বহু চরাই উৎরাই এর পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে । জামাত-শিবির এবং বেগম খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের মুক্তি দাবী করেছেন । টিভি চ্যানেলের খবরে তা দেখা গেছে । জামাত-শিবির এই ট্রাইব্যুনালকে অবৈধ দাবী করেছে । বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব জামায়াত নেতা ডা.তাহেরকে পাশে নিয়ে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ বিচার বাতিল দাবী নিয়ে ডাকা হরতালে নীতিগত সমর্থন দিয়ে যুদ্ধাপরাধের পক্ষ নিয়েও দিব্যি অস্বীকার করছেন যে তারা নাকি যুদ্ধাপরাধ বিচারের বিপক্ষে না ।

আজ এই মুহূর্তে দেশে কেন এত নৈরাজ্য । ৭৫ পরবর্তী সামরিক স্বৈরশাসক যদি যুদ্ধাপরাধের দল জামায়াতকে পুনর্বাসন না করতেন, আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিতেন, নিজে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল না করতেন তাহলে আজ জামাত-বিএনপির এই অনায্য অন্যায় আবদারের মুখোমুখি জাতিকে হতে হতো না । আন্দোলন হোক ক্ষতি নেই । বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী নিয়ে আন্দোলন করবে ঠিক আছে ।

বিজয়ের মাসে আন্দোলন করা অপরাধ না । যে বিজয়ের মাসে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছিল সেই বিজয়ের মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলনের অজুহাতে জামাতের সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার ষড়যন্ত্রমূলক নাশকতার আন্দোলন করছে বিএনপি সেই আন্দোলন কি গণতান্ত্রিক অধিকার ।

জামায়াতের তান্ডবকে আরো উস্কে দেয়ার জন্য কি তারা এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক আন্দোলনের নামে হঠাৎ রাজপথের হানাহানিকে বেছে নিয়েছেন, জানিনা । *বেগম জিয়ার ভারত ও চীন সফরের আগে বিএনপির কৌশল ছিল জনসম্পৃক্তি বাড়াতে স্হানীয়ভাবে জনমত গঠনে তিনি জেলা সফর শুরু করবেন, বহির্বিশ্বের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ রক্ষা করবেন । বেগম জিয়া চীন ও ভারত সফর করেছেন । কিন্তু জনমত গঠনে তিনি এখনও জেলাগুলো সফর করেননি । জনমত গঠন না করে অবরোধ হরতালের মতো চরমপন্হার আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল না তাদের । আবার বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অনেকে মনে করতেন বেগম জিয়ার ভারত সফরের পর আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে । বিএনপির ভাবনা আসলে কি ।

বিশ্বজিৎ ও মংলাকে আমরা হারালাম অন্যায় জনবিচ্ছিন্ন দাবির প্রেক্ষিতে যে আন্দোলন, তার তান্ডবে । যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করতে না পারা রাষ্ট্রের দায় । রাষ্ট্র যখন সে পবিত্র কাজ সমাধানে উদ্যোগী তখন জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি এবং তার উদ্যোগে সৃষ্ট দল জামায়াত এর বর্তমান কর্মসূচি কি তাদের অধিকার বিনষ্ট করে না যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত, সহায় সম্বলহীন হয়েছে ? জনাব জিয়াউর রহমান আপনি দেশের এতবড় ক্ষতি করতে পারলেন ? দেশের মানুষের সাথে শত্রুতা কেমন করে করলেন ?

দেশ সেবার ইচ্ছা আপনার থাকতেই পারে। আপনি ঊর্দি ছেড়ে ভারী সামরিক বুট খুলে জনগণকে আপনার রাজনীতির ইশতেহার জানাতেন । উদাত্ত আহ্বান জানাতেন আপনার রাজনীতির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে । সে পথে না গিয়ে কেন জনগণের অর্থ তসরুপ করে আপনি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও একই সাথে রাষ্ট্রপতি সেজে বসলেন । রাষ্ট্রের এ দুরপনেয় কলঙ্ক ঘুচবে কোনদিন ? এ যে সংবিধানের চরমতম লঙ্ঘন ।

মাঠে-ঘাটে রাজনীতি করে যদি রাষ্ট্রপরিচালনায় আসতেন তবে তো আজ জামায়াতের এই হুঙ্কার দেখতে হতো না জাতিকে। বিএনপির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও এমন হতো না । এরশাদের মতো রাজনৈতিক স্বৈরাচারের জন্ম হতো না । ‘জামাতি সঙ্গ‘ আর ‘স্বৈরাচারের সাথে মিত্র‘ এমন বিতর্ক থাকতো না । বাংলাদেশের সংবিধান আজ এলোমেলো গোঁজামিল পরিস্হিতিতে থাকতো না । বাহাত্তরের সংবিধানে যতটুকু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল তা চল্লিশটা বছর ধরে পরিচর্যা করতে করতে আজ নিশ্চয় মোটামুটি কাঙ্খিত গর্বের সংবিধান থাকতো আমাদের । মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার পণ্ড করার আন্দোলনে বিশ্বজিৎ দাস ও মংলা প্রামাণিককেও জীবন দিতে হতো না।

বিশ্বজিৎকে যে দলের সন্ত্রাসীরাই হত্যা করুক না কেন তাদেরকে ছাড় দিলে রাজনীতির গ্যাংগ্রিন ঠেকানো যাবে না । ওরা ছাত্রলীগের কর্মীও যদি হয়ে থাকে তাতে কি । যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাঠে সরব উপস্হিতি থাকবে সত্য । তার মানে এই না কুপিয়ে মানুষ হত্যা করা যাবে । যে দলই রাষ্ট্রপরিচালনায় থাকুক তাদের অপরাধী কর্মীদেরকে কঠিন শাস্তি দিয়ে এবং অপরাধপ্রবণ মানসিকতার কর্মীদের প্রশ্রয় না দিয়ে তাদেরকে এই বার্তা দেয়া হোক রাষ্ট্রপরিচালনা শুধুই দায়িত্ব এবং কর্তব্য, ক্ষমতার একচেটিয়া জমিদারি না ।

বিশ্বজিৎ দাস, মংলা প্রামাণিক তোমরা আমাদের ক্ষমা করো । শুধু ঐ কয়েক সন্ত্রাসীই না আমরা সকলে চরমভাবে দায়ী তোমাদের এ মৃত্যুতে । আমরা ওদেরকে মানুষ হতে শেখায়নি ।

* দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ আগস্ট রবিবার, ২০১২ ( আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে খালেদা জিয়ার উদ্যোগ, ফারাজী আজমল হোসেন ও শামছুদ্দীন আহমেদ )