ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাংলার জনগণের রক্তাক্ত ইতিহাস । ১৪ই ডিসেম্বর আমাদের বধ্যভূমির ইতিহাস । আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো দিন । বুদ্ধিজীবী নিধনের দায়িত্ব পালন করেছে আলবদর আলশামস ও রাজাকার বাহিনী । মুক্তিযুদ্ধের বিজয় যখন অনিবার্য হয়ে ওঠে তখন পাকিস্তানি যুদ্ধবাজ রাও ফরমান আলীর নির্দেশনায় গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ঘাতক দল বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে ।

ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা ধারণ করেও এদেশের মানুষ আলাদাভাবে ১৪ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করে । বাংলাদেশ নামের নবজাতক শিশু যেন বিকলাঙ্গ মেধা নিয়ে জন্মলাভ করে সে জন্য যে জিঘাংসা মেধাশ্রেণীর প্রতি ওরা একাত্তরে দেখালো সেটাকে বাংলাদেশের জনগণ তাদের অন্তর্গত তাগিদ থেকে দিবসটি পালন করতে শুরু করল ।

একটি যুদ্ধে চিকিৎসকদেরকে হত্যা না করার বিধিনিষেধ রয়েছে । ওরা জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করে চিকিৎসকদেরকেও হত্যা করল । জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধকালীন উভয়পক্ষের কাছে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্হ্যকর্মী নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং আক্রমণের শিকার হবেন না । তারা এক্ষেত্রেও অপরাধ করল ।

১২ নভেম্বর ১৯৭১ ‘দৈনিক সংগ্রাম‘ প্রকাশ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরামর্শ দেয় । এদিন তারা বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তর থেকে যারা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করছে তাদের দ্রুত খুঁজে বের করে উৎখাত করতে হবে । ১৬ নভেম্বর ১৯৭১ আলবদর বাহিনী প্রধান মতিউর রহমান নিজামী এক নিবন্ধে বলেন, পাকিস্তান হচ্ছে আল্লাহর ঘর । ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ দৈনিক সংগ্রাম ‘শেখ সাহেবের খাদ্য তালিকা‘ শীর্ষক এক নিবন্ধে বলে, রাষ্ট্রদ্রোহী শেখ মুজিব জেলের ভেতরে ভাল খাওয়া-দাওয়া করছেন এটা দুঃখজনক । ( তথ্যসূত্র: গোলাম আযম তার অপরাধ এবং বিচারের যৌক্তিকতা, পৃষ্ঠা-১৮-১৯, প্রকাশক- মুক্তিযুদ্ধ তথ্য ব্যাংক )

রাও ফরমান আলীর ডায়েরীতে লিখিত বুদ্ধিজীবী নিধন তালিকা

অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ মিলেছে বাংলাদেশের মানুষের । প্রত্যাশিত যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে । আগে পাকিস্তানিদের বিচারের কথাও বলছেন কেউ কেউ । আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে পাকিস্তানিদের বিচারের কথাও বলা হয়েছে ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টে । ৩ নং ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে ট্রাইব্যুনাল গঠনের আগে কিংবা পরে বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে কোনো ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধ করলে ট্রাইব্যুনাল তাকে শাস্তি দিতে পারবে । আগে পরে কথা নয় । যাকে আগে পাওয়া যাবে, যার সাক্ষ্য-প্রমাণ আগে হবে তার বিচারই আগে হবে ।

আইনের ৬(৫) ধারায় উল্লেখ রয়েছে – ” If, in the course of a trial, any one of the members of a Tribunal is, for any reason, unable to attend any sitting thereof, the trial may continue before the other members.” অর্থাৎ কোন সদস্যের অনুপস্হিতিতে অপর সদস্য যারা থাকবেন তারাই বিচার কার্যকে অব্যাহত রাখতে পারবেন ।

আইনের ৬(৬) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে – ” A Tribunal shall not, merely by reason of any change in its membership or the absence of any member thereof from any sitting, be bound to recall and re-hear any witness who has already given any evidence and may act on the evidence already given or produced before it .” অর্থাৎ যে সকল সাক্ষীর সাক্ষ্য ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে সে সকল সাক্ষী রিকল করতে বা পুনঃশুনানি করতে ট্রাইব্যুনাল বাধ্য না ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট অনুযায়ী নতুন করে মামলা শুরু করার প্রয়োজন নেই । নতুন সদস্য যোগদান করলে যেখান থেকে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই শুরু করা যাবে । ট্রাইব্যুনালের ৬(৪) ধারা লক্ষ্য করুন- দেখা যাচ্ছে ট্রাইব্যুনালের কোন সদস্য মৃত্যুজনিত, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণ, হোক বদলি পদত্যাগের কারণ তবুও মামলা চলমান থাকবে ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট অনুযায়ী এই মামলার যাবতীয় কার্যক্রম তামাদি হবে না । মামলা অব্যাহত থাকলে বেআইনি ও অসাংবিধানিক হবে না ।

দেশের জন্য আত্মত্যাগ করা সকল বুদ্ধিজীবীদের উৎকৃষ্ট প্রতিদান দিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কাজ সমাধা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব ।