ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

১.
রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। কত প্রাণ যাবে? যাক না! যতই যাবে তা হবে নিপাতনে সিদ্ধ। গাজায় নিরীহ নাগরিকদের ওপর ইসরাইলের বর্বর হামলায় মৃত্যুর মিছিলে অনবরত যোগ হচ্ছে নারী আর শিশু।অসুবিধে কোথায়! সুযোগ মতো বিবৃতি দিলেই হবে। সংগঠনের বা সংস্হার প্যাডে বিবৃতির ফরম্যাট বিশ/পঞ্চাশ বছর আগেই তৈরি আছে শুধু তারিখটা হালনাগাদ করে নেয়া হবে। নারীবাদী, শিশুবান্ধব হতে কতক্ষণ! মুখপাত্র যারা আছে তারা চাকরিতে যোগদানের সাথে সাথে বক্তব্যগুলো কয়েক প্রকার ফরম্যাটে প্রিন্টআউট নিয়ে ঝেড়ে মুখস্হ করে নেয়, কোনো সমস্যা হয় না, শুধু মুখস্হ বুলি আওড়ানো। যত বড় আন্তর্জাতিক সংস্হাতেই থাকা হোক না কেন একটুও সমস্যা হয় না।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের বক্তব্য দেখে নিই-
কমিশন বলেছে, গাজায় ইসরাইলি হামলায় যেভাবে বেসামরিক লোকজন মারা যাচ্ছে,তাতে সেখানে ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলছে কিনা তা নিয়ে গুরুতর সংশয় দেখা দিয়েছে। (দৈনিক ইত্তেফাক,শনিবার,১২/০৭/২০১৪)

কমিশনের প্রধান নাভি পিল্লাই বলেছেন, ইসরাইলকে যে কোন অবস্হাতেই বেসামরিক মানুষজনকে টার্গেট করে হামলা বন্ধ করতে হবে। ( দৈনিক ইত্তেফাক,১২/০৭/১৪)

নাভি পিল্লাই আরো বলেছেন, বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার ওপর যে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা ইসরাইল সামরিক অভিযানের সময় মেনে চলছে কিনা সে ব্যাপারে খুবই সন্দেহ রয়েছে। (দৈনিক ইত্তেফাক,রবিবার,১৩/০৭/২০১৪)
এধরনের উঁচু মার্গের গৎ বাঁধা বক্তব্য আমরা সবসময়ই শুনি। তারিখের এবং কিছু শব্দের হেরফের হয় মাত্র। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এর বক্তব্য যদি লক্ষ্য করি-

তিনি বলেছেন, গাজা এখন ছুরির ডগায়। পরিস্হিতির যেভাবে অবনতি ঘটছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। (দৈনিক ইত্তেফাক,শুক্রবার,১১/০৭/১৪)

 

২.
সিয়াম সাধনার মাস। অন্যের নিন্দা করতে নেই। তার চেয়ে ভাই নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থে নিজেরা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করব,যার যার দেশের রাজদরবারে-পার্লামেন্টে একে অপরের জামা ধরে টানাটানি করব ক্ষতি নেই। দু চারটে গালিও দেব সামনা-সামনি কারণ উচিৎ কথা বলা মানুষ সবাই। সবচেয়ে নিরাপদ সুশীল হয়ে থাকা। এলিট দখলদাররা কিছু ছন্নছাড়া নিরীহ প্রাণকে নির্বিচারে বোমা হামলায় হত্যা করছে, হাজার হাজার বাড়িঘরকে ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে ছাড়ছে তাতে কী এমন আসে যায়। রাজত্ব টিকে থাকলেই হলো।
৩.
ফিলিস্তিন আর ইসরাইলের কয়েক তরুণকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে কে কারা। ইতোমধ্যে সে অমানবিক ঘটনা জেনে গেছে সারাবিশ্ব। এই নিষ্ঠুর ঘটনায় উভয়পক্ষ চরম ক্ষতিগ্রস্ত। আর এই অপরাধগুলো কাদের মস্তিষ্কপ্রসূত বোঝা যাচ্ছে না। বলা হচ্ছে ঘটনার সূত্র এখানেই। পুলিশ নাকি বোঝার চেষ্টা করছে এটি কোনো সাধারণ অপরাধের ফল,অথবা এর পেছনে কোনো জাতীয়তাবাদী কারণ রয়েছে কিনা। ইসরাইল আরো দাবি করেছে ১১ জুন থেকে হামাস দফায় দফায় রকেট নিক্ষেপ করে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করায় বিমান হামলার সূচনা করেছে তারা। সবসময়ই আমরা লক্ষ্য করি ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইল ছোট্ট অথচ নির্মম ঘটনাকে কেন্দ্র করে অথবা অজুহাত খাড়া করে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ শুরু করে। এবং ইসরাইলের টার্গেট হয় ফিলিস্তিনের নিরীহ জনগণ, এককথায় নারী ও শিশু।

পশ্চিম তীরের জনগণের ন্যায্য অধিকার মাড়িয়ে ইসরাইল সেখানে একের পর এক অবৈধ বসতি স্হাপন করে চলেছে। নিহত ইসরাইলি তিন কিশোর সেখানকার অবৈধ বসতি ছিল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর দাবি এ অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় ফিলিস্তিনের হামাস জড়িত। এদিকে অন্য প্রশ্নও সামনে চলে আসে অতীতে যখন হামাসের জন্মই হয়নি তখনও ইসরাইল ফিলিস্তিনিদেরকে সন্ত্রাসী বলত এবং সেই অজুহাতে ফিলিস্তিনে আক্রমণ চালাতো, কেন? আসলে ইসরাইলের এ আক্রমণ পরিকল্পিত। এই হামলা শুধুই উগ্রপন্হী হামাসের বিরুদ্ধে বা তাদের আত্মরক্ষার জন্য,সেরকম না। অন্যদিকে ইসরাইলের একজন মন্ত্রি হামাসের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছুঁড়েছেন, হামাস তাদের বেসামরিক লোকদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। অভিযোগটি হেলাফেলা করার মতো না। তবে প্রশ্ন থেকে যায় নির্বিচারে বিমান হামলার এই পরিস্হিতিতে মানবঢাল তৈরি কতটা যুক্তিযুক্ত।

 

গাজায় ইসরাইলের আক্রমণে অবাক হওয়ার কিছু নেই কিন্তু মেনে নেয়ারও জো নেই।নিরীহ নারী পুরুষ আর নিষ্পাপ শিশুদের রক্ত নিয়ে হোলি আর কত কাল? ফিলিস্তিনকে পশ্চিমা বিশ্ব আর মধ্যপ্রাচ্যের দাবার বড়ে হয়ে চলার দিন শেষ হতে আর কত প্রাণ সংহারের প্রয়োজন পড়বে! এদিকে অপ্রতিরোধ্য ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কোনো আন্তর্জাতিক চাপ অনুভব করছেন না। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে তিনি গাজায় হামলা বন্ধ করবেন না (দৈনিক ইত্তেফাক;শনিবার, ১২জুলাই,২০১৪)। বরং বাংলাদেশের কিছু টিভি চ্যানেলগুলোতে নিউজ স্ক্রল হতে দেখা গেছে যে এ বিষয়ে নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিহত করবেন। ইসরাইলকে রুখতে হবে, না সামলাতে হবে এবিষয়ে কি আসলেই কোনো উত্তর জানা নেই কারো! সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো কী সারাবিশ্বের ৭০০ কোটি শান্তিকামী নিরপেক্ষ মানুষের চেয়েও শক্তিশালী হতে পেরেছে? আরব বাদশাহরা কোথায়?

৪.
লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যখন সঙ্কটের মুখে পড়ে তখন গাজায় অভিযান চালিয়ে সেই সরকার তাদের শক্তির মহড়া দেখায় সেইসাথে নিজদেশে জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করে ফিলিস্তিনের নিরীহ নাগরিকদের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ চালিয়ে। মাস দুয়েক আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ফিলিস্তিন সম্পর্কিত মন্তব্যে ইসরাইল নাখোশ হয়। তাঁর মন্তব্যটি ছিল এমন – ফিলিস্তিনিদের সাথে মতৈক্য প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে ইসরাইল বর্ণবাদী (Apartheid) রাষ্ট্রে পরিণত হবে। জন কেরি এও বলে ইসরাইলকে সতর্ক করেন যে জাতিবিদ্বেষী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বনিন্দা ও ধিক্কারের সম্মুখীন হতে হবে তাদের। বক্তব্যটি থেকে ইসরাইলের রাজনীতিতে ঐ সময়ে প্রবল ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

মনে করা হচ্ছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্নায়ু চাপে রয়েছেন। বর্তমানে হামাস ও ফাতাহ গোষ্ঠীর মধ্যে মতৈক্যের কারণে ইসরাইল সরকার উৎকন্ঠিত| এই মতৈক্যের কারণে ফিলিস্তিনের শক্তি রাতারাতি শক্ত ভিত পাবে বলে মনে হয় না। তবে ইসরাইলের সন্দেহ, যে ঐক্যে তারা পৌঁছেছে তাতে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সায় রয়েছে এবং এতে ফিলিস্তিনের গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বজনমতের কাছে আরো বাড়বে কিনা। এদিকে উপদলীয় কোন্দলে জর্জর ফিলিস্তিন। ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব চরমে। যার ফলে ফিলিস্তিনের দুই অংশ পশ্চিম তীর এবং গাজা ২০০৭ সাল থেকে যথাক্রমে ফাতাহ ও চরমপন্হী হামাস দুটি দল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। চলতি বছরের এপ্রিলে দুই দলের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী নতুন নির্বাচনের পর এই বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় সরকার গঠনের কথা রয়েছে। কিন্তু ফাতাহ- হামাসের চুক্তিকে সহ্য করতে পারছে না ইসরাইল কারণ ফাতাহ-হামাসের ঐক্য ভবিষ্যতে ইসরাইলকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। ইসরাইলের বক্তব্য হলো, হামাস জঙ্গি সংগঠন তাই এ ঐক্য তারা মানবেন না। কথাটি মন্দ না কিন্তু ইসরাইলের কি একথা বলার অধিকার আছে? ইসরাইলের নিজেরই কি কোনো সংবিধানিক ভিত্তি আছে?

৫.
জাতিবিদ্বেষী ইসরাইল যদি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় তাহলে ফিলিস্তিনিদেরও ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিতে হবে তাদের। এতো যে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চলছে, কোথায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ। হাসপাতাল, স্কুল, উপাসনালয়ও বাদ যায়নি ইসরাইলের বর্বর বোমা হামলায়। ইসরাইল ফিলিস্তিনিদেরকে জাতিগতভাবে নিধনের সকল অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের নীতিই হচ্ছে যে কোনো অবস্হায় ফিলিস্তিনিদেরকে নির্যাতন নিষ্পেষণের মধ্যে রাখা, হোক সে নারী অথবা শিশু। অন্যের ভূখন্ড জবরদখলে নিয়ে কী করে বৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কতটা জাতিবিদ্বেষী ও নির্মম হলে বোমা হামলার দৃশ্য উপভোগ করতে পাহাড়ের উপরে উঠে পপকর্ণ খেতে খেতে (ডেনমার্কের এক সাংবাদিকের শেয়ার করা ছবির সত্যতা যদি থেকে থাকে) তারা হাততালি দেয়।(দৈনিক ইত্তেফাক,১৬জুলাই,২০১৪)

 

ফিলিস্তিনে একের পর এক মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি করে ইসরাইল বর্ণবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে কিনা বিশ্বের সভ্য মানুষেরা ভেবে দেখুন।