ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

89_Bangabandhu_s+38th+death+anniversary_150813

 

রাষ্ট্রনায়ক হত্যার ঘটনা পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও রয়েছে কিন্তু জিঘাংসা নিয়ে সপরিবারে নিরীহ নারী পুরুষ ও শিশুদেরকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা এবং ফরমান জারি করে সেই নৃশংস হত্যাকান্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করার ঘটনা সম্ভবত এই বাংলাদেশেই বিদ্যমান ছিল। ঘাতকেরা কি বোঝেনি ধৈর্য, তিতিক্ষা ছাড়া সংগ্রামের ফল অর্জন করা কঠিন। অহিংসার পথে চলা মানুষটাকে ওরা মারল সহিংসভাবে, ইয়াহিয়া খান- টিক্কা খান-জুলফি ভুট্টো কবর খুঁড়ে রেখেও যাঁকে হত্যা করার সাহস দেখাতে পারেনি।

একাত্তরে ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অহিংস নেতা‘শেখ মুজিবের বিচার হবে‘ ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি বার্তা প্রেরণ করল  (The Foreign Minister, Mr. Swaran Singh, sent the following message to the UN Secretary General, U Thant, on August 10, 1971) –

“ We are distressed and shocked at the announcement made in Rawalpindi that they propose to commence Sheikh Mujibur Rahman’s trial from tomorrow. ……. We would like to appeal to your excellency to take urgent steps to request government of Pakistan not to take this action………..” ( বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ:দলিলপত্র, দ্বাদশ খন্ড,পৃষ্ঠা-৭০)

বাংলাদেশের জনগণের “Unquestioned Leader” সম্পর্কে ২৪ জাতি সম্মেলনের আহ্বান- মুজিবকে বিনা শর্তে মুক্তি দিন।
THE STATESMAN, SEPTEMBER 19,1971
RELEASE MUJIBUR UNCONDITIONALLY
CALL BY 24-NATION CONFERENCE
INTERNATIONAL CONFERENCE ON BANGLADESH
(বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, চতুর্দশ খন্ড,পৃষ্ঠা-৮৯১)

 

লক্ষণীয় যে, অন্য দেশ ও জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রাণপ্রিয় নেতার জীবন রক্ষার চেষ্টায় উদগ্রীব। আন্তর্জাতিক চাপ ও পৃথিবীর শান্তিপ্রিয় জনগণের দাবির মুখে পাকিস্তান সরকার তাদের সামরিক কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো। অথচ আপাদমস্তক নিরহংকারী বিশ্বস্ত নেতাকে বাংলার কুপুত্রেরা নিমেষেই হত্যা করে ফেলল।

 

তিনি কতোটা সহিষ্ঞু ও প্রাজ্ঞ নেতা ছিলেন তা অনুমান করা যায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য পদ লাভের ব্যাপারে চীনের ভেটো প্রদান এবং আরব দেশগুলোর স্বীকৃতি সংক্রান্ত বিষয়ে। বলে রাখা ভাল জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্তির প্রস্তাব যখনই উত্থাপিত হয়েছে, চীন বার বার সে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। উল্লেখ্য, নিরাপত্তা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে যখন বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব পাস হয় তখন চীন ভেটো প্রদান করে। এই প্রথম জাতিসংঘে সদস্যপ্রাপ্তির পর চীন নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু ব্যাপারটিকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্য ও দুঃখজনক আখ্যায়িত করে বলেন-

“অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে ভেটো দিয়েছিল জাতিসংঘে গণচীনের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে। আমরা তখন বলেছিলাম যে গণচীনকে বাদ দিয়ে জাতিসংঘ অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। আজ সেই গণচীন ভেটো দিয়েছে জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্তির বিরুদ্ধে। গণচীন জাতিসংঘের সদস্যপদ পেয়েছে,নিশ্চয়ই বাংলাদেশও একদিন পাবে।“ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ;এম.এ.ওয়াজেদ মিয়া,প্রকাশ-১৯৯৩, পৃষ্ঠা-১৩৯)

তিয়াত্তর সাল। সেপ্টেম্বর এর প্রথমার্ধ। তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি মিশর,সিরিয়া ও জর্ডান। নিজেদের ভূখন্ড জবরদখল থেকে মুক্ত করতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ঐ দেশগুলো। এছাড়াও সব আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবিরাম প্রচারণা চলছিলো। বঙ্গবন্ধু ধৈর্যচ্যুত না হয়ে কূটনীতির আশ্রয় গ্রহণ করলেন। আরব দেশগুলোর প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন-“আরবরা আমাদের স্বীকৃতি দিক বা না দিক, তাঁরা আমাদের ভাই। তাঁদের ন্যায্য সংগ্রামে আমরা তাদের পাশে আছি“। ক‘দিন পর ১৫ সেপ্টেম্বর সিরিয়া এবং মিশর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করল। ১৬ অক্টোবর জর্ডান স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে। এরপর ১৮ অক্টোবর যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ঐ দেশগুলোর জন্য তিনি শুভেচ্ছাস্বরূপ চা এবং মেডিক্যাল টিম পাঠালেন। অতঃপর ৪ নভেম্বর কুয়েত এবং ৫ নভেম্বর ইয়েমেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

সারা বিশ্বজুড়ে জবরদখল, বৈষম্য, শোষণ, হিংসার বিরুদ্ধে থেকে যিনি সংগ্রামরত থাকার চেষ্টা করেছেন মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত, তাঁকে নিকৃষ্টভাবে হত্যা করল ওরা। এক পিঁপড়া অন্য এক পিঁপড়াকে কখনো কামড়ায় না বলেই শুনেছি।কিন্তু মানুষ পরিচয়ে ওরা হত্যা করেছে আরেক মানুষকে।ধর্ম,দেশপ্রেম নিয়ে গর্ব করা ওরাই তো এসব করেছে।

১৯৭৬ সালের ৩০মে লন্ডনের“দি সানডে টাইম্স“ পত্রিকায় প্রকাশিত বিবৃতিতে মেজর ফারুক দম্ভ করে বলে-“জাহান্নামের পথ থেকে আমার দেশকে রক্ষা করার জন্য আমি গত বছর (১৯৭৫)১৫ অগাস্টের সামরিক ক্যু পরিচালনা করি।“ ইসলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য শেখ মুজিবকে মৃত্যুবরণ করতে হয় বলে ফারুক মন্তব্য করে। অথচ বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালেই ২৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সলের কাছে জরুরী বার্তা প্রেরণ করলেন বাংলাদেশের মুসলিমদের হজ পালনের সুযোগ প্রদানের জন্য। মাঝে চড়াই উতরাই পর্বের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা অনেক।

১৯৭৩ সালের ঘটনা-আলজিয়ার্সের জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে মুয়াম্মার গাদ্দাফি এবং বাদশাহ ফয়সলের সাথে পৃথক সাক্ষাতে দুজনের কাছে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি ও বাদশাহ ফয়সলের কাছে পুনরায় হজ পালনের সুযোগ দেয়ার কথা বললেন তিনি। তাঁরা শর্ত আরোপ করলেন যে – বাংলাদেশকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র‘ ঘোষণা দিতে হবে। বাদশাহ ফয়সল পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি দেয়ারও শর্ত চাপিয়ে দিলেন। তাদের দুজনকে বঙ্গবন্ধু যা বলেছেন তার সংক্ষেপ রূপ হলো – গাদ্দাফিকে তিনি বললেন, আল্লাহতায়ালা শুধু মুসলমানদের রব নন,তিনি রাব্বুল আলামিন; সকলেরই স্রষ্টা,মহান। বাংলাদেশের জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মুসলমান,হিন্দু,খৃস্টান,বৌদ্ধ সকলেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণ করেছে; এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাদশাহ ফয়সলকে বললেন, বাংলাদেশ মিসকিন এর মতো কোনো সাহায্য চায়নি। আমাদের পরহেজগার মুসলমানরা পবিত্র কা‘বা শরীফে নামাজ আদায়ের অধিকার চাচ্ছে। এখানে দুনিয়ার সকল মুসলমানের নামাজ আদায়ের হক রয়েছে; এ ব্যাপারে শর্ত আরোপ কেন? অবশেষে ১৯৭৪ সালের ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশ থেকে প্রথম হজ ফ্লাইট মক্কার উদ্দেশে রওনা হয়।

আমার সাধারণ ধারণা অহিংস মানুষ যাঁরা তিনি যেই হোন; তাঁরা সকলের দুঃখে দুঃখী হন, বেদনার্ত হন বলেই ভুক্তভোগীদের প্রকট সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসেন। অন্যদেরকেও উদ্বুদ্ধ করেন। এভাবেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১৪ অক্টোবর পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশের লাখ লাখ জনগণকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবের নিকট জরুরী বার্তা প্রেরণ করেন। ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক রেডক্রস প্রধানের নিকটও একই বিষয়ে জরুরী বার্তা প্রেরণ করেন। আটকে পড়া লাখ লাখ মানুষকে ফেরত এনে প্রমাণ করলেন তিনি বাংলার মানুষকে কত ভালবাসেন।আটকে পড়া মানুষদের দেশে ফিরিয়ে আনার স্বার্থে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের ফেরত দিতে বাধ্য হলেন।

১৯৭৫ সালের ২৯ এপ্রিল-৬মে কিংস্টন কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা এবং বিহারি সমস্যা সমাধানের দাবী উত্থাপন করেন এবং‘সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে‘ সমাধান ঘটবে বলে যৌথ ইশতেহারে ঘোষণা আদায় করলেন।
এর আগে ১৯৭৪ সালের জুন মাসে জনাব ভূট্টো বাংলাদেশ সফরে এলে বঙ্গবন্ধু আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের তার দেশে ফেরত নেয়া এবং বাংলাদেশের প্রাপ্য পরিসম্পদ পরিশোধ করতে পাকিস্তানের কাছে ৫ হাজার কোটি টাকা দাবি করেন। জনাব ভূট্টো মৌলিক ইস্যু এড়িয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। তখন বঙ্গবন্ধু সাফ জানিয়ে দেন, বাংলাদেশের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে না। জুলফি ভূট্টো বাংলাদেশে এসে অন্যান্য দলের যেসব নেতাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন তাদের মধ্যে ন্যাপ(ভাসানী)শীর্ষনেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া অন্যতম। জনাব ভূট্টোকে যাদু মিয়ার পরামর্শ ছিল কোন অবস্হাতেই যেন সব বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে ফয়সালা না করা হয়। এরপর জনাব ভূট্টো বাংলাদেশের দায়দেনা ও পাওনা সম্পর্কে বাংলাদেশ ত্যাগ করার প্রাক্কালে সাংবাদিকদের বলেন – “ I have not brought a blank Cheque.” কিংস্টন সম্মেলনে যোগদানের তিন মাস পর বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়।

এদিকে বঙ্গবন্ধু নিহত হবার কয়েক মাস আগে ১৯৭৪ সালের ২৯ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিষয়ক সেক্রেটারি ড. হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফরে এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে দীর্ঘ আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করলেন – “ A man of vast conception. I had rarely met a man who was the father of his nation and this was a particularly unique experience for me. ( একজন প্রগাঢ় ধ্যান ধারণা সম্পন্ন ব্যক্তি।যিনি একটা জাতির পিতা,এ জাতীয় ব্যক্তির সাথে আমার কদাচিৎ সাক্ষাৎ হয়েছে এবং এজন্য এটা (সাক্ষাৎ) ছিল আমার জন্য অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা।“

ড.কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এমন মন্তব্য দেয়ার পর তাঁর ঢাকা ত্যাগের মাসখানেকের মধ্যে “ক্যু প্ল্যানিং সেল“ এর কাজ শুরু হয় বলে জনৈক উচ্চপদস্হ মার্কিন কর্মকর্তা লরেন্স লিফসুল্টজকে জানিয়েছেন।

 

তথ্যসূত্র:
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়; আবদুল মতিন, র‌্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশান্স, প্রকাশকাল -১৯৯৩
মুজিব ও সমকালীন রাজনীতি; জাওয়াদুল করিম, প্রকাশকাল-১৯৯১
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ; এম.এ.ওয়াজেদ মিয়া,ইউপিএল,প্রকাশ-১৯৯৩