ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

একাত্তরে যে দলের পাষণ্ডরা বাংলাদেশকে মৃতপুরী বানালো, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে ছারখার করে দিলো, মা-মেয়েকে ধর্ষণ করে দলের কর্মসূচী বাস্তবায়ন করল সেই দল ‘জামাত‘ কে নাকি বিচারের আওতায় আনতে আপত্তি! আপত্তি জানালো কে? যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশেষ দূত। যে বিচারের অপেক্ষায় বাংলাদেশের জনগণ যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করেছে, সেই বিচারের রায়ে অভিযুক্ত পাষণ্ডদের নাকি মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে না।

বাংলার মাটিতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকানোর স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চা্য় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত।যে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে বিশ্বব্যাপী অভিযান চালিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল করার চেষ্টা করে চলেছে অথচ তারা এই দলের পক্ষে ওকালতি শুরু করল যে সংগঠন ধর্মের নামে রাজনৈতিক অধিকারের নামে সবসময় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে।

কয়েকমাস আগে মার্কিন এ্যামবাসেডর এ্যাট লার্জ স্টিফেন জে র‌্যাপ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পরিদর্শন শেষে মন্তব্য করেন যে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য, অপরাধী বিচারের নামে একটি রাজনৈতিক দল অথবা বিশাল একটি গ্রুপকে বিচারের মুখোমুখি করা ঠিক হবে না।

আদালত জামায়াতকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।জামায়াত শুধু পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে ধর্ষণ,লুটপাট,বাঙালি হত্যা করার সহযোগিতা করেনি বরং রাজাকার, আল-বদর নামের সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীকে সবরকমের সহযোগিতা করেছে।তবে শহীদ পরিবার এবং জনগণের বৃহৎ অংশ যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের তাঁরা মানবতাবাদী স্টিফেন র‌্যাপ কে এ মন্তব্যের জন্য তার গালে চুমু দেয়ার সাধ করবে না।

১৯৭১ সালে জামায়াত যত অপরাধ করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করার জন্য যেসব চিহ্নত দেশ বর্বর হানাদারদের অস্ত্র-গোলাবারুদের যোগান দিয়েছিল বাংলাদেশের জনগণ তাদেরকে চিনে ও জানে। বাংলাদেশে যেমন ফাঁসি দেয়ার বিধান রয়েছে তেমন যুক্তরাষ্ট্রেও রয়েছে,আর না থাকলেই বা কী! আমাদের শুদ্ধ আইন দিয়ে আমরা শুদ্ধ বিচারকার্য পরিচালনা করব।অতএব জামায়াতকে ধোয়া তুলসি পাতা বানানোর চেষ্টা বৃথাই হবে আশা করি। জামায়াত ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা এবং নিকৃষ্টতম গণনির্যাতন চালিয়েছে।জামায়াত শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাই করেনি বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দিয়েছে,আমরা বহু ত্যাগের বিনিময়ে সে পঙ্গুত্বকে জয় করে চলেছি।

আমরা যদি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে দায়িত্ব পালনে ভয় ভীতি উপেক্ষা ও বিচারকর্যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য প্রশংসা না করি তবে তা কৃপণতা ও শঠতা হবে।| অনেকে ট্রাইব্যুনালের রায়কে গ্রাম্য সালিশ বৈঠকের রায় বলে বিদ্রুপ করেছেন। একদিন বিশ্বের জনগণ নিশ্চয় বুঝতে পারবে আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় অপরাধীদের বিচার করছে না বরং মানবিক হয়ে চার দশকের ঝুলে থাকা একটি ঘৃণ্য অপরাধের কার্যকর সমাধানের অদম্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।

যুদ্ধ শেষ হয়েছে চার দশক আগে কিন্তু যুদ্ধের অনেক প্রমাণিত তথ্য রয়ে গেছে আজোবধি। এই অপরাধের জন্য পাকিস্তান দোষী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তাদের যে মর্মপীড়া তা সহ্য করা হবে না। জামায়াতকে তার পাপের ও অপকর্মের জন্য শাস্তি পেতে হবে।

একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনতে আবার সংশোধন হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ(ট্রাইব্যুনালস) আইন,২০১৪।এই সংশোধনী কার্যকর হলে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে জড়িত ব্যক্তির সঙ্গে সংগঠনও শাস্তির আওতায় আসবে। এছাড়াও অভিযুক্ত সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান থাকতে পারে খসড়া আইনে।এ আইন সংশোধনের খসড়া নাকি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করেছে আইন মন্ত্রণালয়, যা অনতিবিলম্বে মন্ত্রিসভায় উঠবেবলে জানা গেছে।জামায়াতের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতার কার্যক্রমের তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করেছেন তদন্ত কমিটি।রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ দাখিলের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে এসে অপেক্ষমান।

২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় উচ্চ আদালত। বিচারক ওই রায়ে সংগঠনের বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের ক্ষেত্রে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘মূল আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কোন দল বা গোষ্ঠীকে বিচারের সম্মুখীন করার বিধান করা হলেও কোন দল মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাকে কী ধরনের দন্ড ও সাজা প্রদান করা হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। আমার নিঃসংকোচ অভিমত এই যে, ঐ আইনে মানবতা বিরোধী কোন দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে, সেই দলের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দন্ড আরোপের বা গৃহিত ব্যবস্হা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান করা প্রয়োজন।‘

বর্তমান আন্তর্জাতিক অপরাধ(ট্রাইব্যুনালস)এ্যাক্টের ২০ ধারায় আছে-
20(1) The Judgement of a Tribunal as to the guilt or the innocence of any accused person shll give the reasons on which it is based:

Provided that each member of the Tribunal shall be competent to deliver a judgement of his own.

(2) Upon conviction of an accused person,the Tribunal shall award sentence of death or such other punishment proportionate to the gravity of the crime as appears to the Tribunal to be just and proper.

যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে শত প্রতিকূলতা মাড়িয়ে নিজ সংকল্পে দৃঢ় থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অশেষ ধন্যবাদ,বাংলাদেশের জনগণও এই বিপদসঙ্কুল মুহূর্তে ধৈর্য ধারণের জন্য ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে জাতির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা অপেক্ষায় আছি সরকার কতটুকু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।