ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সুপ্রিম কোর্ট ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের যে রায় দিয়েছে তার বিরুদ্ধে সরকার বা বিজ্ঞজনদের মূলত তেমন কোনো বক্তব্য নেই। সমালোচনায় স্হান পেয়েছে মাননীয় প্রধান বিচারপতির কিছু পর্যবেক্ষণ যা জাতীয় সংসদ, মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতৃত্বকে হেয় করা হয়েছে বলে আওয়ামীলীগ, মুক্তিযুদ্ধের কিছু পক্ষশক্তি এবং বোদ্ধাজনদের কারো মনে এই অভিপ্রায় জন্ম নিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব রায় ঘোষণার পর সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছেন,তিনি এখনো পদত্যাগ দাবী করে চলেছেন। এদিকে সরকার অসন্ত্তষ্ট হলেও রায় গ্রহণ করে নিয়েছে । প্রধান বিচারপতির কিছু পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আওয়ামীলীগ তাঁদের বক্তব্য পেশ করলে সাথে সাথে বিএনপি বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ, ষড়যন্ত্রসহ নানা ধরনের অভিযোগ আনা শুরু করে।দেশের উচ্চআদালত নিয়ে সেদিনও বিএনপি’র বিস্তর অভিযোগ ছিল ।

একসময় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ‘ন্যাপ’ এর সাথে অতি ডান,অতি বামপন্থীরা এক হয়ে গাটছড়া বেঁধেছে । ছাত্রলীগ থেকে বের হয়ে একদল ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে’ দীক্ষিত হয়ে দল গঠন করেছে । বঙ্গবন্ধু যখন দেশ গড়তে ব্যস্ত সময় অতিক্রম করছেন তখন এসব দল দেশকে অরাজক পরিস্হিতির দিকে নিয়ে যেতে নানা ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পালন করেছে । তখন দৈনিক গণকণ্ঠ, কঠোর চীনপন্থী বলয়ের সাপ্তাহিক হলিডে এবং সাপ্তাহিক সংবাদপত্র – হক কথা বিভিন্ন রকমের গুজব ছড়িয়ে জনগণের বিরাট অংশকে বিভ্রান্ত করেছে, দেশকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে,সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে ।

১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সাল,পল্টন ময়দানে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন-সরকারকে হটাতে হলে সশস্ত্র বিপ্লব প্রয়োজন ।তিনি বলেন – তাঁর বয়স ৯১,বয়স থাকলে তিনি এই সশস্ত্র বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতেন ।তিনি আরো বলেন,যারা বিপ্লব করবে তাদের জন্য আমি দোয়া করি। যারা সশস্ত্র হামলা করবে তাদের তিনি বাংলার বীর সেনানী আখ্যা দেন । প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের উল্লেখ করে বলেন,’ক্ষমা চাই , সমানাধিকার চাই । রাষ্ট্রপতি আদেশের ৮ ও ৫০ ধারা বাতিল করার দাবী জানান ।’ অর্থাত অপরাধীদের ছেড়ে দেয়ার দাবী জানান । এভাবেই বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে সেই সময় ।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক ক্ষমতার মসনদে বসেন । পরবর্তীতে খন্দকার মোশতাককে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে হিসেবে রাষ্ট্রপতি বানিয়ে তিনি নিজে ক্ষমতায় আসীন হলেন । একইভাবে যখন এইচএম এরশাদ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তখন তিনিও বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে শিখণ্ডির রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন । বাংলাদেশে যতবার সেনাবাহিনীর কতিপয় জেনারেলরা অবৈধভাবে রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিজেরা নিয়েছেন তার বৈধতা দিয়েছেন কারা ? এর ভেতর তৎকালীন কিছু বিচারপতিগণ ছিলেন । সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে রয়েছে বিচারপতিগণ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হতে পারবেন? স্বচ্ছ সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল এই বিচারপতিদের বিচার করতে পেরেছে কিনা আমাদের জানা নেই ।

দেশের দু.সময়ে বিচারকরা নাকি নিশ্চুপ থাকতে পারেন না। সেই সকল বিচারকদের নিয়ে এবং যে বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল তাঁকে নিয়েও আপনারা কথা বলুন,প্লিজ।

প্রশ্ন উঠেছে,কোনো এক ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদক থেকে নাকি রায়ের ড্রাফট এসেছে । যদি তা সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আমরা অধিকাংশ জনগণই তো বাংলা ভাষাভাষি, কিন্তু সেই তরুণ কাল থেকে দেখছি, ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদকেরা দেখি ভেতরে ভেতরে দেশ চালানোর চেষ্টা করে! সেই অবজারভার, হলিডে থেকে শুরু………… !

প্রধান বিচারপতি বলেছেন- ‘বিচার বিভাগ অন্য দুটি স্তম্ভের থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো । তা-ও ডুবুডুবু অবস্থায়, পানির ওপরে নাক উঁচু করে ভেসে আছে।’ যেখানে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সংসদে পাসকৃত এই আইনকে আলট্রা ভায়ার্স ঘোষণা করতে পারলেন,পর্যবেক্ষণ কড়া ভাষায় লিখলেন, এরপর এমন মন্তব্যে তখন হতবাক হওয়া ছাড়া কী আর করার থাকে ! তবে রায়ের মাধ্যমে কিছুটা হলেও প্রমাণ হয় বিচার বিভাগ স্বাধীন হতে পেরেছে। বিচার বিভাগ স্বাধীনতা ভোগ করছে বলেই এ রায় দিতে পেরেছে ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় সংবিধানে বিচারপতি অপসারণের ব্যবস্হা রাখা হয় সংসদের মাধ্যমে, কিন্তু অপসারণের সকল কার্যক্রমই যে সংসদ সম্পন্ন করবে তা তো না । কিন্তু জিয়াউর রহমান তাঁর সেনা শাসনের সময় এই বিধান পরিবর্তন করে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তর করেন । এইচএম এরশাদের অবৈধ শাসনকালে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিদ্যমান ছিল । প্রধান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন ১৯৮২ সালের ১১ এপ্রিল এজলাসে অবস্হানকালিন অজানা টেলিফোনে সংবাদ পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে এজলাস থেকে অপমান সয়ে সাধারণ নাগরিকের মতো বাসায় ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন । তখন সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল জনাব কামালউদ্দিনকে কোনো প্রকার সুরক্ষা দিয়েছিলেন? তখন মাননীয় বিচারপতিগণ সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে কোনো প্রতিকার চেয়েছেন কিনা আমরা জানি না । প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যদি অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে তখন সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের প্রধান কে হবেন?

কোনো বিচারপতির ক্ষেত্রে অসদাচরণ ও অসামর্থ্যের কারণে কোনো অভিযোগ এলে তা তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণ পেলে বিষয়টি সংসদে উত্থাপিত হবে । সংশোধনীর পর সে অনুযায়ী আইন হওয়ার কথা, তাতে বিচারপতি এবং সম্মনিত কোনো ব্যক্তির সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি হবে। সংসদ তো কিছু করবে না।কী বলা আছে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে –

৬০[ ৯৬। (১) এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধানাবলী সাপেক্ষে কোন বিচারক সাতষট্টি বৎসর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন।

৬১[ (২) প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোন বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।

(৩) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন।

(৪) কোন বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করিয়া স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন।]

ষোড়শ সংশোধনী ম্যাচিউর করতে ‘বিচারকদের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য তদন্ত ও প্রমাণ আইন ২০১৬’ সংশ্লিষ্ট আইন তৈরির কাজ শুরু করে সরকার । চূড়ান্ত ড্রাফট পর্যন্ত তৈরি হয়। এই আইনে বিচারকদের কোন আচরণ, অসদাচরণের পর্যায়ে পড়বে তা সুস্পষ্ট করা হয় । তদন্ত ও প্রমাণের প্রক্রিয়া নিয়েও ড্রাফট হয়। কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে প্রথমে মাননীয় স্পিকার বরাবর যাবে । স্পিকার অভিযোগ যাচাই এর জন্য সম্ভবত ১০ সদস্যের একটি কমিটির কাছে পাঠাবেন। সাত কর্মদিবসের মধ্যে উক্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে হবে । প্রতিবেদনে তদন্তের পরামর্শ দেওয়া হলে মাননীয় স্পিকার সাবেক একজন অ্যাটর্নি জেনারেল ও বাংলাদেশের একজন সম্ভ্রান্ত নাগরিক/জুরিস্টকে সদস্য এবং একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি বা আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতিকে কমিটির চেয়ারম্যান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করবেন। তদন্তে অভিযোগ পাওয়া গেলে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে অভিযুক্ত বিচারকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে। বিচারক আইনজীবী গ্রহণের মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের বিধানও সেই ড্রাফটে ছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বিচারকের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণিত হলে তখন স্পিকার তা সংসদে উত্থাপন করতে পারবেন। এরপর সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য যদি বিচারকের বিপক্ষে ভোট দেন তাহলেই সেই প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬ (২) অনুযায়ী অভিযুক্ত বিচারককে তিনি অপসারণে সম্মতি দান করবেন। এছাড়া, বিচারপতির অসামর্থ্য বিষয়ে ড্রাফটে বলা হয় মেডিক্যাল বোর্ডে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তিনি শারীরিক বা মানসিকভাবে অযোগ্য কিনা তা নিশ্চিত করার সুযোগ রাখা হয়। এমনকি কোন বিচারকের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভিত্তিহীন বা মিথ্যা অভিযোগ কেউ এনে থাকেন তাহলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান করা হয়। বিচারকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয় তাতে।
উক্ত আইনের ড্রাফট নাকি এফিডেভিট আকারে আদালতে উত্থাপন করা হয়। এমনকি আইনটির ড্রাফট বিচারপতিদের কাছেও পাঠানো হয় আলোচনা করে মতামত জানানোর জন্য। অথচ বিচারকবৃন্দ মামলার শুনানি শেষ করে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করলেন। যে দুটি অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, ষোড়শ সংশোধনী তা লঙ্ঘন করেছে কি ?

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় দিতে গিয়ে আদালত বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের ফলে দলের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না। তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনও সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ৭০ অনুচ্ছেদ রাখার ফলে সংসদ সদস্যদের সবসময় দলের অনুগত থাকতে হয় । বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তারা দলের বাইরে যেতে পারেন না । যদিও উন্নত অনেক দেশে সাংসদদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা আছে।’

বর্তমান ৭০ অনুচ্ছেদ কোন অবস্থায় প্রয়োগ করা হয়েছে? এটা কি সকল ক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ আছে ? বলা হচ্ছে, দলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়া যাবে না । এযাবত কালে সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোটাভুটি একবারও হয়েছে ? যেটা হয় সেটা বিলের পক্ষে, বিপক্ষে। যখন অনাস্থা প্রস্তাবের প্রসঙ্গ আসবে তখন দলের পক্ষে, বিপক্ষের প্রশ্ন আসবে। এক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদের যুক্তি দেখানো কি আসলেই যৌক্তিক! তবে হ্যাঁ, ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭০ অনুচ্ছেদে আরও দুটি ব্যাখ্যা সংযোজন করেন যা সংসদ সদস্যদেরকে নেত্রীর অনুগত কর্মচারিতে পরিণত করেছিল।

যার একটি হলো – কোনো সময় কোনো রাজনৈতিক দলের সংসদীয় দলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে এবং স্পিকার বিভক্তি ভোটের দ্বারা উক্ত দলের নেতৃত্ব নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিলে, কোনো সংসদ সদস্য ভোটদানের ব্যাপারে এরূপে নির্ধারিত নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করলে তিনি উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং সংসদে তার আসন শূন্য হবে।

দ্বিতীয়টি হলো – কোনো ব্যক্তি নির্দলীয় প্রার্থীরূপে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদান করলে তিনি উক্ত দলের প্রার্থীরূপে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বলে গণ্য হবেন । আওয়ামী লীগের বিগত রাষ্ট্রপরিচালনার (২০০৯-২০১৩) সময়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দ্বাদশ সংশোধনী পর্যন্ত সংশোধিত ৭০ অনুচ্ছেদটি মূল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয় । সুতরাং এখন আর সেই সংশোধনী নাই। মূল ৭০ অনুচ্ছেদ আছে ।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী – রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া

৪১[ ৭০। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরুপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-
(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা
(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,
তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।]

এদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট পিটিশনের শুনানি উচ্চ আদালতে চলমান। বিচারাধীন বিষয়ে আপিল বিভাগের মাননীয় বিচারপতিদের এমন মন্তব্য চলমান রিট পিটিশনের রায়কে প্রভাবিত করতে পারে কিনা জাতির মনে এমন সন্দেহ তৈরি হলে তা দোষের কিছু ?

সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রীম কোর্টের রায়ের বাধ্যতামূলক কার্যকরতা হলো, ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী- ’আপীল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন হাইকোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রীম কোর্টের যে কোন বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন অধঃস্তন সকল আদালতের জন্য অবশ্যপালনীয় হইবে।’

এমন হলে উচ্চ আদালতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিচারাধীন বিষয়ে আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণ প্রদান করে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল মামলায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করার প্রশ্ন উঠলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে ? ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ আত্মস্হ করে উচ্চ আদালত কতখানি স্বাধীন থেকে তাদের বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবে, এমন ভাবনা থাকে বৈকি। এমন পর্যায়ে বিচার বিভাগ তাঁদের স্বাধীন মত পেশ করার মর্যাদা নিজেরাই অক্ষুন্ন রাখতে না পারলে তখন ’হস্তক্ষেপ’ নিয়ে সন্দেহের অঙ্গুলি কোন দিকে যাবে ?

প্রধান বিচারপতি রায়ে লিখেছেন :
‘নো নেশন-নো কান্ট্রি ইজ মেড অব অর বাই ওয়ান পারসন’ – ‘কোনো জাতি বা দেশ কোনো এক ব্যক্তিকে দিয়ে গড়ে ওঠে না, কিংবা কোনো একজন দ্বারা তা গঠিতও হয় না।’ আমরা বাংলাদেশের জনগণ এতটুকু জানি- জাতি গঠনে,দেশ গঠনের পেছনে জনগণের অবদান কেউই অস্বীকার করতে পারে না,আওয়ামীলীগও করেনি কখনো। তাহলে আদি সংবিধানের প্রস্তাবনায় এমন স্বীকারোক্তি থাকতো না,যা নীচে বিধৃত হলো-

আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া ২[ জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের] মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি;
৩[ আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল-জাতীয়তাবাদ,সমাজতন্ত্র,গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে;

কিন্তু প্রায় ২৪ বছর ধরে এই শোষিত-বঞ্চিত জনগণকে স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন যিনি দেখালেন,সারা বাংলা চষে বেড়ালেন, সংগ্রাম করলেন তাঁর পরীক্ষিত নেতা কর্মীদের সাথে নিয়ে । একক ব্যক্তিত্ত্ব হয়ে উঠলেন,বাংলার জনগণকে এক ঐক্যে বাঁধলেন , জাতির জনক হয়ে উঠলেন । যিনি সাহস করে বলতে পারলেন – এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ । সেই বঙ্গবন্ধুকে ‘ফাদার অব দ্য নেশন’ স্বীকার করে নিয়ে মিমাংসিত বিষয়কে অমিমাংসিত করে তোলা কিসের আলামত বলা যায় ! কোনো বিজ্ঞজন আমেরিকার প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন-তাঁদের ৭ জন ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ আছেন সেই প্রেক্ষাপটেই নাকি প্রধান বিচারপতি ঐ ধারণা থেকে সকল গণপরিষদ সদস্যদের কর্মকাণ্ড স্বীকার করে নিয়ে আইনগত স্বীকৃতি দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধে শুধু সকল সদস্যরাই না বাংলাদেশের জনগণের সকল ত্যাগ, কর্মকাণ্ড স্বীকৃত হয়েই আছে আদি সংবিধানে। মুক্তিযুদ্ধ যে জনযুদ্ধ তার প্রমাণ তো আদি সংবিধানের প্রস্তাবনাতে রয়ে গেছে। সকল সদস্য (ব্যতিক্রম ছাড়া) নিজ হস্তে সেই সংবিধানে স্বাক্ষর করেছেন। আদি সংবিধানই তো জনভিত্তির প্রমাণ,আইনি ভিত্তির অকাট্য দলিল। তাহলে বিচার বিভাগকে নতুন করে আইনি ভিত্তি দিতে ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ প্রসঙ্গ টেনে আনা কতটুকু গ্রহণীয়। খন্দকার মোশতাক আহমদ যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেননি বরং বাধার সৃষ্টি করেছেন স্বাধীনতাকে রুখতে,সেই মোশতাক গং সাহেবদেরকে এই দেশের জনগণ ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ বলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হতে হবে !

পরবর্তীকালে যদি বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে তখন জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ এর আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করবে কিনা সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তখন এমনও বলা হতে পারে ‘ফাউন্ডিং ফাদার্স’ থাকলে একজন জাতির জনক এর আর প্রয়োজন নেই। বলা হবে সব মিটমাট হয়ে গেল,দেশে আর কোনো বিভাজন থাকলো না। বিএনপি একারণেই এই রায়কে ঐতিহাসিক বলা শুরু করেছে কিনা তা জানা এবং বোঝার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে জাতিকে।