ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

বানের আঘাতের ক্ষত শুকোতে কতদিন লাগবে জানি না। এই দেশে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে প্রতি বছর বন্যা দেখা দেয়, আমরা এসবের খোঁজ রাখি না কারণ গণমাধ্যমে সেগুলো আসে মাত্রায় স্বাভাবিক হিসেবে। যে বছর ব্যাপক বন্যা হয়, গণমাধ্যমেও কাভারেজ পায় বিপুল আকারে তখন আমাদের প্রাণ কাঁদে। প্রতিবছর যে কিছু না কিছু অঞ্চলে বন্যা ধেয়ে আসে যা আমাদের কাছে স্বাভাবিক, তা কিন্তু ঐ বন্যা দুর্গত অঞ্চলের মানুষদের জন্য বিষফোঁড়া আকারেই দেখা দেয়, আমরা তার কতটুকুই বোঝার চেষ্টা করি!

এবারের বান আমাদের প্রাণ কাঁদাচ্ছে। বানের জলে বানভাসিরা ভিটেমাটি হারায়। জমি জিরেতের ফসলহানি চোখের সামনে দেখে আর হায় হায় করে, মাতম করে। গৃহের প্রাণিগুলো ভেসে কোথায় হারায় কেউই জানে না। বৃষ্টির জলে চোখের জলও মুছে যায় তাদের। আমাদের চোখে পড়ে ওতটুকুই, ভেজা শাড়ি আর ভেজা লুঙ্গি। শিশুদের ফ্যাকাসে ঠোঁট আর বিবর্ণ চেহারা দেখে মনে হয় রক্তের বড্ড অভাব ঐ শরীরে। তারপরও এই বানে ভাসা বাংলাদেশে ঈদ উপলক্ষে প্রায় প্রতি ঘরে ঘরেই আমাদের ঈদ উৎসব চলতে থাকবে! জিভ নাড়াচাড়া করবে লুচি পরোটায় আর দুধ সেমাইয়ে। তবে প্রতিমন্ত্রি জুনায়েদ আহমেদ পলক যে ঘোষণা দিয়েছেন বানভাসিদের জন্য ঈদের দিন সেমাই খাওয়াবেন, ভাত-গোশত খাওয়াবেন। এতে যদি একদিনের জন্যে হলেও কিছুটা ঈদ উৎসবের আমেজে বানভাসি বাবা-মা, ভাই-বোন, শিশুদের মন আনন্দ উছলে ওঠে মন্দ কী!

এর মধ্যে মিয়ানমার সরকারের সহিংসতা, গণহত্যার কারণে আবার কঠিন বিপদের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের ভাষ্য, সহিংসতার সূত্রপাত হয় দেশটির নিরাপত্তাবাহিনীর ওপর রোহিঙ্গা জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলার মধ্য দিয়ে। এদিকে শরণার্থীদের ভেতর পুরুষের সংখ্যাও নাকি কম দেখা যাচ্ছে। রোহিঙ্গা নারীদের কথায় বোঝা যাচ্ছে, অনেক রোহিঙ্গা পুরুষ এখন এই ধরনের বিভিন্ন দলে যোগ দিয়ে সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই এর চেষ্টা করছে (দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩১ আগস্ট)। আমরা নিরীহ রোহিঙ্গা জনগণের জন্য উদ্বিগ্ন। মিয়ানমার কেন রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করবে না এর সদুত্তর মিয়ানমার সরকারের কাছে নেই। রোহিঙ্গারা নিজের রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার ফিরে পাবে না, এটা মানবাধিকারকে পদপিষ্ট করার উদ্ধত ভঙ্গিমা মিয়ানমার রাষ্ট্রের।

আবার রোহিঙ্গা জনগণের নির্যাতিত, নিপীড়িত হওয়ার সুযোগ নিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশের চট্টগ্রামকে নিয়ে স্বাধীন আরাকান ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করার চক্রান্ত করবে, এটাও হতে দেয়া যায় না। বাংলাদেশকে উভয় সঙ্কটে ফেলে দেয়ার পেছনে যদি ষড়যন্ত্র থাকে আর বাংলাদেশের জনগণ তা রুখতে না পারে তবে চরম ক্ষতির কারণ হবে এই রাষ্ট্রের জন্য। আমরা নিগৃহিত রোহিঙ্গা জনগণের প্রতি সমব্যথীই শুধু নই, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি রোহিঙ্গা জনগণকে আশ্রয় দিচ্ছে, চিকিৎসা দিচ্ছে, এর চেয়ে বেশি আর কত সম্ভব বাংলাদেশের পক্ষে! আফ্রিকা মহাদেশে লাখ লাখ মুসলিম শিশু নিহত হয়, যা অবর্ণনীয়। দশকের পর দশক ধরে নিপীড়নের শিকার ঐ সকল জনগণ, বিশেষ করে নারী ও শিশুদেরকে যখন হত্যা করা হয় সেখানে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে আল-শাবাব গোষ্ঠী ও বোকো হারাম যখন খাবার সরবরাহে বাধা দেয় তখন আমরা উদ্বিগ্ন হই।

ঈদ উৎসব উপলক্ষে যখন সারা বিশ্ব থেকে শুভেচ্ছা বাণী আসতে থাকবে আমাদের কাছে, তখন আমাদেরও বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে তাদের কাছে জোর দাবি থাকবে সারা বিশ্বের সকল নির্যাতিত নিগৃহিত জনগণকে, নিরাপরাধ নারী ও শিশুদেরকে আপনারা মুক্তি দিন। নিপীড়িত জনগণকে ফিরিয়ে দিন তাদের মাটিতে, তাদের জমিনের ওপর খোলা আকাশে তাদের প্রাণভরে নিশ্বাস নিতে দিন। সারা বিশ্বের নিষ্পেষিত জনগণের অধিকার কুক্ষিগত করার আইনগত ক্ষমতা আপনাদের থাকতে পারে না। আপনারা দখলদার হতে পারেন না। আপনাদের জন্য সারা বিশ্বের মানবতা কাঁদবে, আমরা তখন নিশ্চুপ থাকতে পারি না।

সবশেষে শুভেচ্ছা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কর্তৃপক্ষ ও ব্লগ কর্তৃপক্ষের জন্য। অন্তহীন ভালোবাসা রইল সকল প্রিয় নাগরিক সাংবাদিকবৃন্দের জন্য।বিচারপ্রার্থী বাংলাদেশের সকল নাগরিক যেন সুবিচার থেকে বঞ্চিত না হন। রূপাদের মতো সকল পরিবার সুবিচার পাক।

নিরাপদ ও আনন্দে ভরে উঠুক সকল নাগরিকের জীবন। ন্যায্য অধিকার সকল নাগরিকের জীবনে আসতে থাকুক। উন্নয়ন ও মানবিক উন্নয়ের দিকে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ। ভালো থেকো বানভাসি বাবা-মায়েরা। ভালো থেকো রোহিঙ্গা ভাই-বোনেরা। সবচেয়ে ভালো থেকো সারা বিশ্বের যুদ্ধে পতিত, বন্যার্ত ও অন্যান্য দুর্বিপাকে থাকা আদরের শিশুরা, তরুণ-তরুণীরা।

ঈদ শুভেচ্ছা ।