ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের পর অর্জন করা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে যিনি বা যারা সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রশাসন করলেন, জনগণের উপর কর্তৃত্ত্ব দেখালেন, তিনি বা তারা কীভাবে একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার স্বীকার করে নিয়ে গণতন্ত্র দিলেন- তাও আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র?

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন না মেনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে নিজে রাষ্ট্রপতি হলেন। তিনি ক্ষমতাকে বৈধ(!) করতে সবরকম চেষ্টা করেছেন। সাধারণ মানুষ দেখতে পেয়েছে ১৯৭৭ সালের ৩০ মে গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলেন এবং এমন ধারাবাহিকতা রক্ষা করলেন আরেক সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ।

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হওয়ার পর বিচারপতি আবু সায়েম সর্বপ্রথম যে ভাষণ দেন তাতে তিনি ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দেন। অতঃপর তিনি সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে ১৯৭৬ সালের ২১ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এএসএম সায়েম বলেন, ‘জাতীয় জীবনের বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে নির্বাচন জাতীয় সংহতি বিপন্ন করবে বিধায় পূর্বঘোষিত সময়ে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভবপর হচ্ছে না।’ এরপর ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর বিচারপতি এএসএম সায়েমের নিকট থেকে জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ নিয়ে নেন। তারপর ১৯৭৭ এর ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েমকে সরিয়ে জিয়াউর রহমান নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন।

জিয়াউর রহমান পলিটিক্যাল পার্টি রেগুলেশন অ্যাক্ট (পিপিআর) এর মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বৈধতা প্রদান করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা হয়ে গেলেন! সংবিধানের কোন ধারা বলে তিনি রাষ্ট্রপতি হলেন? জাতি তাকে সেই অধিকার প্রদান করেছেন? জিয়াউর রহমান কীভাবে রাষ্ট্রের কর্মকর্তা অর্থাৎ সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি পদে একইসাথে অধিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষমতা অর্জন করলেন? বিচারপতি এএসএম সায়েম কীভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হলেন? সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদ তাকে উড়ে এসে এই জায়গাটিতে জুড়ে বসার অধিকার দিয়েছে? জনগণ কি তাকে এই আসনে বসার অধিকার দিয়েছে?

ফরমান জারি হয়ে গেল ১৯৭৫ এর ৬ নভেম্বর, অতঃপর বিচারপতি এম সায়েম রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হলেন! খন্দকার মোশতাক নামমাত্র রাষ্ট্রপতি। খালেদ মোশাররফ আরেক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নিলেন বটে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের, ষড়যন্ত্রকারীদের নোংরা খেলার মারপ্যাঁচে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার সুযোগ পেলেন না। উর্দ্ধতন সেনা কর্মকর্তদের অনেকেই তার পাশে থাকলেন না, যদি থাকতেন তাহলে ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো হয়ত। আবারো গণতন্ত্রায়নের পথে চলতে শুরু করতো বাংলাদেশ।

এদিকে জাতীয় চার নেতার নৃশংস হত্যাকান্ডের পর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান হয়। আবার খালেদ মোশাররফ নিহত হবার আগেই জিয়াউর রহমান মুক্ত। জিয়া বন্দী ছিলেন বটে তবে তার বাসার টেলিফোন ছিল সচল। তারপর কারো না কারো ইশারায় সকালবেলা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো খালেদ মোশাররফ, কর্ণেল হায়দার, কর্ণেল হুদাকে। প্রাণে বেঁচে গেলেন শাফায়াত জামিল।

এরপর বিচারপতি সায়েম মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করলেন- (LAW AND PARLIAMENTARY AFFAIRS DIVISION) NOTIFICATION DATED 8th November, 1975। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন যখন জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, একই সময় তিনি সেনাপ্রধান পদেও অবস্থান করছেন। এই সমস্যা দূর করার জন্য ১৯৭৮ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি একটি ফরমান জারি করলেন-

The Second Proclamation (Thirteenth Amendment) Order, 1978, which was issued on 29 April, 1978, stipulated as follows:

(1) The Chief Martial Law Administrator shall be Commander-in-Chief of the Defense Services of Bangladesh and shall exercise his power of superintendence, command and control over the services either directly or through their Chiefs of staff; and

(2) The CMLA shall NOT be deemed to be a person holding an office of profit in the services of the Republic for any purpose whatsoever.

এই ফরমান অনুযায়ী (১) প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হবেন এবং তিনি সরাসরিভাবে কিংবা বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানদের মাধ্যমে তার সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন এবং (২) যে কোন ব্যাপারে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসককে প্রজাতন্ত্রের অধীনে বেতনভোগী অফিসার নন বলে গণ্য করা হবে। (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়, আবদুল মতিন, পৃষ্ঠা-১০৬)

এদিকে ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়।  এরপর জারি করা হয় কয়েকটি অস্বাভাবিক গেজেট নোটিফিকেশন। ১৯৭৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির গেজেট নোটিফিকেশন নং ৭/৮/ডি-১/১৭৫-১৬০ অনুযায়ী জিয়াউর রহমান নিজেকে লে. জেনারেল পদে উন্নীত করেন। এরপর ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল গেজেট নোটিফিকেশন নং ৭/৮/ডি-১/১৭৫-২৭০ অনুযায়ী উপর্যুক্ত বিজ্ঞপ্তি নাকচ করে পুনরায় নিজেকে লে. জেনারেল পদে উন্নীত করেন, যা ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে কার্যকরী হয়। পুনরায় ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল আরো একটি গেজেট নোটিফিকেশন নং-৭/৮/ডি-১/১৭৫-২৭১ জারি করা হয়। এটি লে. জেনারেল পদ থেকে অবসর গ্রহণ বিষয়ক, যা ১৯৭৮ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে কার্যকরী হয়।

জিয়াউর রহমানের পদোন্নতি, পদত্যাগ ও নিয়োগ নিয়ে ১৯৭৯ সালে যে গেজেট বিজ্ঞপ্তিগুলো প্রকাশ হয়েছে তার অসংগতি নিশ্চয় পাঠকের বোধগম্য হবে।

১৯৭৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জিয়াউর রহমান নিজেকে ‘অবিলম্বে’ লে. জেনারেল পদে উন্নীত করেন। নোটিফিকেশন নং-7/8/D-1/175-160 এ বলা হয়েছে- ‘BA-69 Major General Ziaur Rahman, BU, PSC is promoted to the rank of temporary Lieutenant General with immediate effect.’ অর্থাৎ জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অস্থায়ী লে. জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছেন। এই তারিখে পদোন্নতি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাথে অসংগতিপূর্ণ।

সেক্ষেত্রে পুনরায় ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল 7/8/D-1/175-270 গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে-
“BA-69 Major General Ziaur Rahman, BU, PSC is promoted to the rank of temporary Lieutenant General with effect from 28thApril 1978.”
2. This Cancels This Ministry’s Notification No.7/8/D-1/175-160 Dated 28th February 1979.

আবার ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল অবসর সংক্রান্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তি নং-7/8/D-1/175-271 তে বলা হয়েছে-
“BA-69 TEMPORARY LIEUTENANT GENERAL ZIAUR RAHMAN, BU, PSC IS RETIRED FROM THE SERVICE OF THE BANGLADESH ARMY WITH EFFECT FROM 29TH APRIL 1978.”

এই গেজেট বিজ্ঞপ্তিগুলোর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। অথচ সেনাবাহিনী প্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানকে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে যা সাংবিধানিকভাবে অবৈধ। তিনি পেছনের তারিখ ব্যবহার করে নিজের পদোন্নতি ও অবসর গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।

রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণ যাদের কোনো অধিকারই দেয়নি, অর্থাৎ বিচারপতি এএসএম সায়েম এবং জিয়াউর রহমান কোন রাষ্ট্রীয় অধিকার বলে ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক বিধি জারি করেন? অথচ তখনও বঙ্গবন্ধুর সরকার বৈধ সরকার। বিএনপি বলে- জিয়াউর রহমান আওয়ামীলীগকে পুনর্জন্ম দান করেছেন। আওয়ামীলীগকে পুনর্জন্ম দেয়ার অধিকার সেই সরকার কোথা থেকে অর্জন করলেন? শুধুমাত্র সামরিক বুট ও রাইফেলের ব্যবহার এবং বিশ্বের যেসব শক্তিধর দেশ বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগণের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেননি তারাই জিয়াউর রহমানকে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করার শক্তি যুগিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সেই সামরিক সরকারের নিকট বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ১৯৭৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রথম দলের ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচি পেশ করতে বাধ্য হয়। পুনরায় ৮ অক্টোবর আরেকটি সংশোধিত দলিলপত্র সেই সরকারের কাছে পেশ করে আওয়ামীলীগ কিন্তু সামরিক সরকার এই আবেদন নাকচ করে দেয়। বলা হয়, আওয়ামীলীগ নাকি রাজনৈতিক দলবিধির শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হয়েছে সেই আবেদনে। সেটা ১৯৭৬ সালের রাজনৈতিক দলবিধির ১০ নম্বর ধারার সঙ্গে নাকি সংগতিপূর্ণ না।

”জীবিত বা মৃত কোন ব্যক্তির পূজার উদ্রেক করে বা ব্যক্তিত্ত্বের মাহাত্ম্য প্রচার অথবা বিকাশে সহায়তা করে এমন বিষয়” নিষিদ্ধ করা হয় ১০ নম্বর ধারায়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দিয়ে ৪ নভেম্বর অবৈধ সামরিক সরকারের নিকট থেকে আওয়ামীলীগ অনুমোদন লাভ করে। এতে জনগণ বাংলাদেশের স্থপতির প্রতি অস্বীকৃতির নমুনা দেখলো।

(তথ্যসূত্র- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ। এম.এ.ওয়াজেদ মিয়া, পৃষ্ঠা-২৭৭,২৭৮)

জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাবিরোধী দালাল, রাজাকার, আলবদর সদস্যদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা হলেন, প্রবক্তা হলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি দিলেন, পুরস্কৃত করলেন, সম্মান দিলেন। অতঃপর তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীকে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়ে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের সাথে, বাংলাদেশের মানুষের সাথে কেমন আচরণ করলেন তা কি বুঝিয়ে বলার আর কিছু দরকার পড়ে?

প্রশ্ন হলো তৎকালিন নির্বাচন কমিশন কীভাবে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায় তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করলেন? বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসার কৌশল হিসেবেও যদি জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা দাবি করেন সেটা কতটা বৈধ?

জিয়াউর রহমান কোন পদ্ধতিতে দৃঢ়তার সাথে বিএনপি গঠন করলেন? ক্ষমতার মসনদে বসে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয় করে দল গঠন করা দৃঢ়তা? কৌশল অবলম্বন করতে গিয়ে ইতিহাস পাল্টে দেয়া, বিকৃত করার কোন অধিকার আমাদের কারো আছে কি?