ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

আমাদের সবার ইচ্ছেগুলোই নড়বড়ে নাকি আমার ইচ্ছেগুলোই নড়বড়ে তা বুঝতে জীবনের বেশকিছুটা সময় হারিয়ে ফেললাম। ইচ্ছা ছিল মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স নিয়ে আলাদা একটি পোস্ট লিখবো। কিন্তু ইচ্ছাটা এলোমেলো হয়ে গেল।একেবারেই ইচ্ছা ছিল না লেখাটাকে নতুন ধাঁচে আনতে। নতুন ছাঁচে ফেলে লিখতে চেষ্টা করার আগ্রহ তৈরি করা, যাতাকলে পিষে যাওয়ার মতো অবস্থা মনে হচ্ছে।

আমরা যেন বেশ ভয়ংকর সময় অতিক্রম করছি এখন।কোন পথে হাটবো আমরা,সত্যিই কি জানি?আমাদের চাওয়া, আমাদের প্রশ্ন সবকিছু কি দেশের জন্যই,দেশের মানুষের জন্যই?নাকি শুধুই নিজেদের জন্য,নিজের জন্য?আমরা আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি।মেঘের ভেলায় ভাসতে ভালোবাসি।কিন্তু আমরা কি জানি মেঘের কত রঙ?মেঘের রঙ যদি চিনতে বা জানতে চেষ্টা করি,তবে কি চোখ বুঁজে মেঘের ভেলায় ভাসলে আদৌ মেঘের রঙ চেনা সম্ভব!

আমরা কখনো ছেঁড়া স্বপ্নও দেখি।আবার স্বপ্নগুলোকে ছিঁড়েও ফেলি।ছেঁড়া স্বপ্ন দেখলে ক্ষতি বোধ হয় খুব একটা নেই কিন্তু স্বপ্নকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলে তখন স্বপ্ন আর হাতের মুঠোয় থাকে না।আমরা আমাদের স্বপ্নগুলোকে যেন না হারায়।

চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।এর প্রেক্ষিতে জবাবদিহিতার স্বার্থেই এই আলোচনা।আমি বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাতিঘর।মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিশ্চয়ই আমাদের কাছে অলীক কিছু না।আলমডাঙ্গার ডাকবাংলোর প্রাচীর ঘেঁষে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে আইনের মাধ্যমে। সারাদেশে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এই ভবন তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে।এই ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা নীতিমালার আওতার মধ্যেই হয়েছে। শুধু মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের সাথেই বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল প্রতিষ্ঠিত হতে হবে আর অন্য কোথাও স্হাপন করা যাবে না, এমন কথা কোথাও বলা নেই। তবে এই ভবনের সাথে বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল থাকবে এটা সিদ্ধান্ত। আমার কাছে মনে হচ্ছে না, বঙ্গবন্ধু গরাদের ভেতর জেলেবন্দী! তবে যার যার নিজস্ব মত থাকতে পারে, সে অধিকার সকলের রয়েছে। একটি ভবনের সুন্দর মনোরম প্রাচীর থাকবে এবং নাগরিকদের জন্য দৃশ্যমান হবে এমন ভাবেই মুর‌্যালটি স্হাপন করা হয়েছে।

আমি প্রাচীরচিত্রসহ ভবনের ছবি দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করবো, যাদের এই ভবন দেখার সুযোগ হয়নি তাঁদের জন্য– যে বঙ্গবন্ধু ‘গরাদের ভেতর জেলে বন্দী’ নন এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি কারো পায়ে লেগে তাঁর অবমাননা হবে এমন নীচেও স্হাপন করা হয়নি।যতটুকু প্রয়োজন তেমন উঁচু জায়গাতেই তাঁর প্রতিকৃতি স্হাপন করা হয়েছে।

এই ভবন এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির নকশা স্হানীয়ভাবে হয়নি।সেই জন্য কোনো স্হানীয় প্রকৌশলীর তাঁর কর্মপরিধির বাইরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল ওখানে স্হাপন না করার সক্ষমতা দেখানোর সুযোগও নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারও কর্মপরিক্রমা সুনির্দিষ্ট।উনারও এখতিয়ার নেই যেখানে মুর‌্যালটি স্হাপিত, সেক্ষেত্রে অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্হা নেয়ার। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বা প্রাচীরচিত্র আলমডাঙ্গার অন্য আরো উন্মুক্ত জায়গায় হওয়ার সুযোগ রয়ে গেছে যা স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীসহ নাগরিকদের প্রয়োজন মেটাবে। অন্য প্ল্যাটফরমে আমার ইতোপূর্বের লেখাতেও আমি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রেখেছি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অথবা প্রাচীরচিত্র আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গনের উন্মুক্ত স্হানে স্হাপন করার জন্য।

যে বাসভবনে আমাদের অবস্হান তার সামনেই মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সৌভাগ্য যে, আমার পিতা আবদুল হামিদ প্রতিদিনই বাড়ির ভেতর থেকে বাইরে বের হতে বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল দেখতে পান, ঢোকার সময়ও দেখতে পান। অনেক সময় বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখেনও তিনি। আমার পিতার কাছে, আমার কাছে মনে হয়নি যে এখানে বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল প্রতিষ্ঠা করে তাকে অসম্মানিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তিনি কীভাবে ধারণ করেন তা আলমডাঙ্গা শহরে তার চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ্য থেকে শুরু করে তার সমসাময়িক এবং যারা পঞ্চাশোর্ধ হয়েছেন তারাসহ সকলেরই জানার কথা।

প্রসঙ্গত কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন। আমার পিতা আবদুল হামিদ প্রায় আড়াইযুগ অর্থাৎ সুদীর্ঘকাল আলমডাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটিতে সভাপতি ও পরবর্তীতে নীতিমালা পরিবর্তনের কারণে সহ সভাপতির দায়িত্ত্ব পালন করেছেন।বাহাত্তর পরবর্তী সময় থেকে প্রায় ২০০০ সাল পর্যন্ত। যখন আমার পিতা সভাপতির দায়্ত্ত্বিভার গ্রহণ করলেন তখন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ত্ব পালন করছেন জনাব লতাফত হোসেন, যিনি আলমডাঙ্গা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন।

উনার আগে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ত্ব পালন করেছেন তাদের মধ্যে পাইকপাড়ার জনাব রহিম উকিল ছিলেন।রেলওয়ে স্টেশনের বুকিং ক্লার্ক জনাব কলিমুদ্দিন মিয়াও কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। জনাব রবকুল উকিল শিক্ষকতা করেছেন ৬৬ সালের দিকে। কালিদাসপুরের একজন শিক্ষকও এখানে শিক্ষকতা করেছেন। ‘৬১ সালে কয়েকজন ছাত্রী নিয়ে এই বিদ্যালয়ের সূচনা পর্ব। ছাত্রী সংখ্যা সম্ভবত ১০-১২ জন হবে। একটা ক্লাস নেয়া হতো মাত্র। ছাত্রীরা হলেন শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক জনাব আব্দুল জব্বার মিয়ার মেয়ে নাজু আপা, শহীদ ডা.বজলুল হক সাহেবের মেয়ে বিলকিস পারভীন রানু আপা, শ্রদ্ধেয় চাচা হবিব দারোগা সাহেবের মেয়ে মায়া আপা, জনাব ডা.আব্দুল হান্নান সাহেবের ভায়ের মেয়ে আদিল আপা, গোবিন্দপুরের জনাব ডা. শমসের আলী মিয়ার শ্যালিকা রেবা আপা, জনাব সিরাজুল হক(রবু মিয়া) এর স্ত্রী বুলবুল ভাবীসহ আরো কয়েকজন। প্রথম পর্যায়ে একটা শ্রেণিরই পাঠদান করা হতো, তা হলো পঞ্চম শ্রেণি। চোখের চিকিৎসক রাধা বিনোদ বাবুর ছোট্ট দোতলা দালানে তখন ক্লাস নেয়া হতো। যারা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন তারা সেই ভাঙাচোরা দালান নিশ্চয়ই দেখে থাকতে পারেন।

জনাব লতাফত হোসেন যখন বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আসলেন তখন বলে কয়েই এসেছেন যে উনি অল্প বেতন গ্রহণ করবেন কারণ বিদ্যালয়ের দুর্দশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। আগে যারা শিক্ষকতা করেছেন তাঁরাও সামান্য অর্থ গ্রহণ করেই পাঠদান করেছেন। কথিত আছে জনাব লতাফত হোসেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী। প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এক মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, যে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ হয়ে জনাব আবদুল হামিদ কীভাবে সভাপতির দায়িত্ত্ব পালন করলেন?

জবাবদিহিতার জায়গা থেকে বলি-আলমডাঙ্গা বালিকা বিদ্যালয় কি জনাব লতাফত হোসেনের? নাকি আলমডাঙ্গার জনগণের? নিশ্চয়ই বালিকা বিদ্যালয় আলমডাঙ্গার জনগণের এবং জনগণের। জনগণের প্রতিষ্ঠানেই অভিভাবকদের ম্যান্ডেট নিয়েই জনগণের প্রধিনিধিত্ত্ব করেছেন তিনি। লতাফত হোসেনের কথায় উঠাবসা করেননি। জনগণের প্রতিষ্ঠানকে একজন কথিত মুক্তিযুদ্ধবিরোধীর হাতে ছেড়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি ঘরে বসে থাকবে এমনটা দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে আমার কাছে! জনাব লতাফত হোসেন’র মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তাকে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার না করার দায় তৎকালিন সভাপতির উপর কীভাবে বর্তায়! কাউকে বহিষ্কারের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। তাও আবার মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কার্যকলাপের অভিযুক্ততার দায়। যা একটি জটিল প্রক্রিয়া, নাগরিকদের নিশ্চয় তা বোঝার যোগ্যতা রয়েছে।

প্রধান শিক্ষক লতাফত হোসেন অনেক বছর আগে মারা গেছেন। বালিকা বিদ্যালয় থেকে চাকরিও ছেড়ে এসেছেন ‘৮০ সালের দিকে। লতাফত হোসেন যুদ্ধাপরাধ করেছিলেন কিনা, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিলেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। যদি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে থাকেন তাহলে ইতিহাসের পাতায় তিনি অভিযুক্তই থাকবেন। আমি-আপনি চাই বা না চাই, কারো না কারো মতাদর্শ থাকবেই যে তিনি বাংলাদেশের পক্ষ নিবেন নাকি পাকিস্তানের। দেখার বিষয় হলো, তিনি কোনো অপরাধে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন কিনা।শান্তিযোগ্য অপরাধ করেছিলেন কিনা।

সেই ’৭৩ এর শুরু থেকে জনাব আবদুল হামিদের সভাপতি থাকাকালিন, বালিকা বিদ্যালয়ের তুলনামূলক চিত্র কেমন ছিল আলমডাঙ্গার নাগরিকবৃন্দ সবাই জানেন এবং ঐ বিদ্যালয়ের পুরনো সকল ছাত্রছাত্রীদের স্মৃতিতে সারাজীবন গেঁথে থাকার কথা। সেই সময়কালের প্রেক্ষাপটে কোন প্রতিষ্ঠানকে অল্প সময়ের ভেতর গড়ে তুলতে পারা কতো যে কষ্টসাধ্য তা বোঝার যোগ্যতা আলমডাঙ্গার মানুষের রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ শেষে দু’বছর পর বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়েছে।একজন মাত্র শিক্ষক জনাব আব্দুল জলিলকে নিয়োগ দিয়ে বিজ্ঞান বিভাগের যাত্রা শুরু। জলিল সাহেব ভাড়াও থাকতেন জনাব লতাফত হোসেনের বাড়িতে। জেনেছি, ওয়াপদার একজন কর্মকর্তা বালিকা বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করার পেছনে অবদান রেখেছেন সেই সময়।তিনি আজ প্রয়াত।গত ১৬ ডিসেম্বর পরলোকগমন করেছেন তিনি।

সাধ্যের ভেতরে থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য,ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখা, খেলাধূলার জন্য কী করেছেন আবদুল হামিদ তা শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দসহ নাগরিকরা জানেন।আবার সকল মানুষই যে একজনের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করবে এমনটা এই পৃথিবীতে ঘটে বলে আমি জানি না।বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সব অধ্যায় কি সকলে জানেন?অজানা থেকে যায় অনেক ঘটনা।সব ঘটনা সকলেই যে জানতে পারেন,এমনটা সব সময় হয় না।ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলার তাহেরহুদা ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ছিলেন আমার বড় নানা প্রয়াত জনাব মোয়াজ্জেম হোসেন। ভবানিপুর বাজারে যখন যাত্রাপালা হতো বিশেষ করে আলমডাঙ্গা বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালিন ৬২-৬৪ সাল পর্যন্ত, তিনি তিন বছর যাত্রাপালা থেকে বড় অঙ্কের চাঁদা সংগ্রহ করে দিতেন বালিকা বিদ্যালয়ের জন্য।আমাদের এমন ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলো কখনো নিজেরা জনসম্মুখে বলার চেষ্টা করিনি কখনো।

বিদ্যালয়ের পরিচালনার ভার শুধুই সভাপতির একার না। আরো সদস্যরা সেখানে থাকেন। সম্মিলিত সিদ্ধান্তে পরিচালনা করতে হয় একটা প্রতিষ্ঠানকে। তাছাড়া একজন লতাফত হোসেনকে বিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত করলেই কি সারা আলমডাঙ্গা সাফসুতরো হয়ে যেত! বীর মুক্তিযোদ্ধারা কি দাবি তুলেছিলেন তখন, যা আমার পিতা কর্ণপাত করেননি? আমার পিতা নিজেই বাধ্য হয়েছিলেন শহীদ ডা. বজলুল হক সাহেবের হত্যামামলা সেই ‘৭২ সালেই প্রত্যাহার করে নিতে।হানাদার বাহিনী আগুনে ভস্ম করে দিয়েছে যে বাড়িতে আমরা থাকি সেই বাড়িঘর।লুট করে নিয়ে গেছে ডাক্তারখানার ওষুধ থেকে টাকাপয়সা সবকিছু।এমন প্রতিকূল অবস্হার ভেতরে থেকে জনাব আবদুল হামিদ বালিকা বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন।

বিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় কেরানি প্রয়াত জনাব খোন্দকার নুরুদ্দিন যিনি এক শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার পিতা।তিনি বিদ্যালয়ের সকলের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন ।জনাব লতাফত হোসেন এর অসুন্দর, অপ্রত্যাশিত আচরণ এর কারণে জনাব নুরুদ্দিনকে বিদ্যালয় পরিত্যাগ করে চলে যেতে হয়নি।মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিদ্যালয়ের চাকরিতে বহাল ছিলেন সভাপতি আবদুল হামিদের কারণেই।একেক জনের একেক রকম অভিযোগ মিটিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান মোটামুটি সফলতার সাথে পরিচালনা করা সহজসাধ্য না কিন্তু আমার পিতা আবদুল হামিদ তা করার চেষ্টা করেছেন, যা সাক্ষ্য দেবে সেই সময়কাল।

স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের প্রতিষ্ঠান আলমডাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে লতাফত হোসেন থাকাকালিন আবদুল হামিদ সভাপতির দায়িত্ব পালন করে শহীদ ডা.বজলুল হক এর আত্মাকে নাকি আঘাত করেছেন? হতবাক হওয়ার মতো ধারণা জন্মালো আমার। কোন ব্যক্তির সহযোগী হলেই কি ঐ ব্যক্তির চেতনা ধারণ করতে হবে? কী অদ্ভুত ভাবাবেগ! আবদুল হামিদ তো নিজের স্বকীয়তা থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেন।এখন কোনো ব্যক্তি যদি মুক্তিযুদ্ধের সম্পূর্ণ বিপরীত চেতনায় বিশ্বাস করেন তাহলে কি তাঁর সহযোগীকেও সেই চেতনা ধারণ করতে হবে? বিস্ময়কর সংজ্ঞার্থ!এক ব্যক্তির চিন্তার জগত কি আরেক ব্যক্তির চিন্তার জগতের কাছে কেউ বর্গা দিতে পেরেছে?

বর্তমান কুষ্টিয়া অঞ্চলের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব মিয়া।সম্ভবত বছর দেড়/দুই আগে মারা গেছেন।তার আগে উনি আমাকে খুব দেখতে চেয়েছিলেন আবদুল হামিদের পুত্র হিসেবে। দেখা হয়েছে আমাদের।আমার সাথে দেখা করার ঐকান্তিক ইচ্ছে ছিল তার। কারণ তিনি আমার কাছেও তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন আব্বার জন্য। হরিণাকুন্ডু উপজেলার শ্রীপুরের একজন চিকিৎসক যিনি রাজাকারদের ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দেয়াকে অন্যায় ও অন্যায্য ভাবতেন, তিনি ফিরিয়ে দিলেন মৃতপথযাত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব মিয়াকে। তখন জনাব আবদুল হামিদ মুক্তিযুদ্ধকালিন সেই বিভীষিকাময় রাতে তরিতরকারির থলেতে শাকশব্জিসহ চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, ওষুধ নিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে সেই গ্রামে তার চিকিৎসা সেবা দিয়ে দ্রুত ভারতে যেতে সাহায্য করেছেন। আবদুল হামিদ এই বয়সেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে ঘটনা তুলে ধরেন, বার্তা পৌঁছে দেন নতুন প্রজন্মের কাছে,কী করণীয় তাদের বাংলাদেশের জন্য।

আবদুল হামিদের মতো এমন ব্যক্তিত্ত্বের কাছে যদি আমরা ‘তিনি মুক্তিযুদ্ধকে ভুলে গিয়েছেন কিনা’ এমন প্রশ্ন তুলি তাহলে তো অশনিসংকেত এর লক্ষণ মনে হচ্ছে!