ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

শিশুরা কি শুধু বইখাতার ভারি ব্যাগ টেনে নিয়ে স্কুলে যাবে আর কোচিং সেন্টারের তৈরি করে দেয়া প্রশ্নপত্রের উত্তর অবিরাম মুখস্থ করে পরীক্ষায় ’গোল্ডেন এ প্লাস’ নেয়ার আকাঙ্খায় দৌড়াদৗড়ি করবে? পুকুরে-নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা তারপর চোখ লাল রঙা করে শিশুদের সেই পাখির কিচিরমিচির শব্দের মতো কথা বলতে বলতে বাড়ি ফেরা, অবিরাম বৃষ্টি ঝরা দিনে পুকুরে নদীতে ঝাঁপ দেয়ার যে আনন্দ তা কি এখনকার শিশুরা উপভোগ করবে না? কানামাছি, ইচিং বিচিং, ডাংগুলি, লাটিম, রুমাল চুরি, ঘুড়ি উড়ানো, এক্কা দোক্কা, বুড়িছুট, হা-ডু-ডু, দড়িলাফ, ফুলটোক্কা, ষোলোগুটি, মার্বেল খেলা, দাঁড়িয়াবাঁধা, সাতচাড়া আরো কতো খেলা যে রয়েছে, সে সব খেলবে না এখনকার শিশুরা?

শিশুরা কীভাবে বড় হয়ে উঠবে, তাদের জীবনের রঙ কেমন হবে, তার কতটুকু রাষ্ট্র ভাবছে? সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনের রঙ কি পাণ্ডুবর্ণেরই থেকে যাবে? অন্যান্য আরো কমবেশি পঁয়তাল্লিশ জাতিগোষ্ঠীর উপেক্ষিত শিশুদের হতশ্রী জীবনমানের দৃশ্যমান অগ্রগতি আদৌ হবে তো? যৌনপল্লীর শিশুরা কেমন আছে? ’হরিজন’ ’দলিত’ পর্যায়ের শিশুরা সারা বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে মূলধারার শিশুদের সাখে একই বেঞ্চে বসতে পারে কি? এরা সেলুনে চুল কাটাতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয় কিনা, সকল রেস্তোরাঁতে নির্বিঘ্নে প্রবেশের অধিকার পাচ্ছে কিনা এই শিশুরা, রাষ্ট্র সেই সুযোগ নিশ্চিত করবে কবে? কোনো কোনো অঞ্চলের উচ্চ বর্ণের হিন্দু, মুসলিম সমাজপতি এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তার প্রতিকার সমাজ এবং রাষ্ট্র কবে এবং কখন করবে?

শিশুরা তো স্কুলেও থাকবে, পুকুরে-নদীতেও থাকবে। খেলাধুলায় থাকবে, পাঠাগারে থাকবে। আবৃত্তি বিতর্ক সব উঠোনেই ওরা বিচরণ করবে। শুধু স্কুলেই থাকবে শিশুরা তেমন না, আবার পড়ালেখা বাদ দিয়ে নদীতেই সাঁতার কাটবে তাও বলি না। শুনেছি গাধার নাকি বয়স গুনতে নেই! সে পাঁচ-দশ বছরেও গাধা, সত্তরেও গাধা। আমরা তো সেই শিক্ষা নিয়েই বড়ো হয়েছি। পুরো বই থেকে ৭-৮ টা প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করেছি, তাও সেই মুখস্থটুকুও ধরে রাখতে পারিনি। নকল করেছি, প্রথম বিভাগ অর্জন করেছি। প্রশ্ন করতেও শিখিনি, প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারিনি। প্রশ্ন করতে শিখবো কীভাবে? ক’জন শিক্ষক প্রশ্ন করা পছন্দ করতেন? আমাদের শিক্ষা কি অংশগ্রহণমূলক হতে পেরেছে? শিক্ষকরা কি ছাত্রছাত্রীদের চিন্তার জগতে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কখনো? অধিকাংশ শিক্ষক প্রশ্ন করাটাকেই তো মেনে নিতে পারেন না। কারণ মনে হয় একটাই- শিক্ষকের যদি উত্তর জানা না থাকে!

ক’জন শিক্ষক স্বীকার করবেন, তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের খবরের কাগজ কীভাবে পড়তে হয় তা শৈশব অথবা কিশোর বেলায় শিখিয়েছেন? ক’জন অভিভাবক তাঁদের ছেলেমেয়েকে সংবাদপত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন? আমরা কল্পনাশক্তি অর্জন করবো কোথা থেকে? শিক্ষক-ছাত্র অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ালেখা করে আসতে পারিনি। মগজ নির্জীব হয়েছে একারণে! মরিচা পড়ে জং ধরার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এজন্যই!

 

এমন শিক্ষকও আছেন যাঁদেরকে পরিদর্শকের দায়িত্ত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, তাঁরা নকল করতে দেন না বলে।এমন শিক্ষকও আছেন যারা অফিসকক্ষে শিক্ষার্থীকে নিয়ে খাতা ঘেঁটে ভুলগুলো শুদ্ধ করে দেন। না লিখতে পারা গ্রামার  লিখিয়ে নিচ্ছেন।ভুল করা অংক ঠিক করে দিচ্ছেন।আরোঅনেক কিছু করেন তাঁরা। অভিভাবকরা ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের দিয়ে নকল পাঠান পরীক্ষার হলরুমে। এভাবে কোনো শিশু যখন শিক্ষকের থেকে, অভিভাবকের থেকে এমন শিক্ষা পায় তখন সেই শিশুর শিশুতোষ মানসিকতা কোথায় গিয়ে ঠেকে?

 

প্রান্তিক ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থায় অসমতাকে পুরোপুরি দূর করার সময় সুযোগ এসেছে। এসব জাতিগোষ্ঠীর শিশুরা যার যার ভাষাতে কথা বলে। বাংলাদেশে এদের ত্রিশটির মতো ভাষা চালু আছে।’পাত্র’ ভাষার শিশুরা সেই ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পাক। ‘মাহাতো’, ‘লুসাই’, ‘বনোযোগী’ ‘হাজং’ সহ সকলেই যার যার ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা যেন পায় রাষ্ট্র সেই ব্যবস্থার দিকে যত দ্রুত হাঁটবে, সেই রাষ্ট্রকে তখন অশিষ্ট রাষ্ট্র বলতে পারবে না কেউ। এই সকল ভাষাভাষীর শিশুদেরও নিজস্ব খেলাধূলার চর্চা আছে, ঐ শিশুদের সংস্কৃতি,খেলাধূলার সুব্যবস্হা ও পৃষ্ঠপোষকতার ভার রাষ্ট্র যদি না মাথা পেতে নেয় তবে সেই রাষ্ট্র বর্বর রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হবে একসময়। সামাজিকপ্রবণ মানসিকতার নাগরিকরাও এসকল কাজের জন্য যত স্বত:ফূর্ততা নিয়ে এগিয়ে আসবেন শিশুদের মানসিক বিকাশের অগ্রগতি ততো দ্রুতই বাড়বে আশা করা যায়।

 

যে সমাজে শিশুদের জন্য পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার গড়ে ওঠে না, সেই শিশুরা মানসিক বৈকল্য নিয়ে বড় হবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না।সকল পরিবারের ঘরের ভেতর যদি পাঠাগার থাকে সেই সমাজে পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার গড়াও সহজ।রাষ্ট্রীয়ভাবে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জেলা পরিষদ,পৌরসভার মতো সকল প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা বাধ্যবাধ্যকতার আওতায় না আনলে রাষ্ট্র দায়ী হতেই থাকবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার চিন্তা যেন বাংলাদেশের কাছে অলীক ভাবনা।প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু উপযোগী পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করতে অসমর্থ হলে সে দায়ভার রাষ্ট্রের।

রাষ্ট্রীয়ভাবে শিশুদের জন্য সকল খেলায় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে এই শিশুদেরই মাদকে, জঙ্গীবাদে, সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রকট হবে। সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে হারিয়ে যেতে বসা খেলাধূলাগুলোকে খেলতে দিতে হবে শিক্ষার্থীদেরকে। রাষ্ট্র যত শীঘ্রই এই খেলাধূলাগুলোকে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আওতায় নেবে শিশুদের শারীরিক, মানসিক দৃঢ়তা ততো বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দেবে। পাঠাগার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে সময়ই কথা বলা শুরু করবে যে– সমাজের, রাষ্ট্রের চেহারা কেমন হবে।

 

শিশুদের মৌলিক অধিকারকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা রাষ্ট্র দেখাতে পারে না।রাষ্ট্রের অভিপ্রায়ই হবে সকল শিশুর জন্য নিবেদিত থাকার।