ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পার হয়ে গেল অথচ রাষ্ট্রীয় নানা বিষয়ে আমাদের তর্ক থামেনি । মৌলিক বিষয়ে অনেকে একমত হতে এগিয়ে আসছেন না । রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচীতে ভিন্নতা আছে , থাকবে । কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিষয়ে মতভিন্নতা ! সেই মতভিন্নতা থেকে মতবিরোধ যা আজো থামেনি । রাষ্ট্রের আদর্শ-মূলনীতি সম্পর্কে জাতীয় ঐকমত্য বিশ্বের প্রায় সব দেশেই রয়েছে ।বাংলাদেশ অন্যতম রাষ্ট্র যেখানে রাষ্ট্রের আদর্শ-মূলনীতি নিয়ে মিছে বিতর্ক তোলা হয়েছে । পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় অর্থে দল গঠন করে যারা নিজের দলের আদর্শ রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন , তারা একবারও জানতে চাননি রাষ্ট্রের নাগরিকরা তাদের এ আদর্শ মানতে চায় কিনা । মানবে কিনা । প্রতিটি নাগরিকের আজ নিজের কাছে জিজ্ঞাসা করার সময় এসেছে — মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জনের পর যে আদর্শকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল , সেগুলো কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর আদর্শ ছিল কিনা । সেসব আদর্শ তো কোন বিশেষ দলের ছিল না । বরং দীর্ঘ সংগ্রাম , আন্দোলনের ভিতর দিয়ে উঠে আসা জাতির
আশা-আকাঙ্খা আর স্বপ্নের প্রতিফলন ছিল । রক্তপাত , সাড়ে সাত কোটি জনগণের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবন দানের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র বাঙালি জাতি অর্জন করে নিল সেই মুক্তিযুদ্ধই তো শুরু হয়েছিল জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমগ্র বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কতিপয় জাতি দ্রোহী ছাড়া ।

কেমন বাংলাদেশ আমরা চাই ? কোন ধরনের রাষ্ট্র আমরা চাই ? নিশ্চয় কল্যাণ রাষ্ট্র । অসাম্প্রদায়িক ও একে অপরের সাথে মিলেমিশে থাকা স্বপ্নের রাষ্ট্র । যেখানে রাষ্ট্র নিজেই হবে কল্যাণকর,স্বয়ংসম্পূর্ণ । রাষ্ট্র নিপীড়ক হবে না । এক্ষেত্রে প্রতিটি নাগরিকেরই কর্তব্য রয়েছে তবে এগিয়ে আসতে হবে সকল রাজনৈতিক দলকে । যদিও রাষ্ট্রীয় আদর্শগত বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে গেছে এরই মধ্যে । তবুও কিছু অপূর্ণতা রয়ে গেছে । সে অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দিতে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি’কে এগিয়ে আসতে হবে । আওয়ামীলীগ ও অন্যান্য দলের মতো বিএনপি রাষ্ট্রের মূল আদর্শগত বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করলে বাঙালি জাতি মূল সংবিধানের পরিপূর্ণতা ফিরে পেতো । এটা তো সত্য জনগণের একটা অংশ আজ কিছুটা বিভ্রান্তিতে । কারণ তো মোটাদাগে একটাই । সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে রাষ্ট্রধর্ম ও অন্যান্য বিষয়ের অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে বলে । একারণে জাতি আজ বিভক্ত । তাতে রাষ্ট্রের কোন কল্যাণ হয়নি । বাংলাদেশ কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যেতে পারেনি ।

মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কোন কাজ করা হলে বিভক্তি থাকলেও তার ফলাফল ভাল হওয়ার আশা করা যায় কিন্তু অসৎ উদ্দেশের পরিণতি শুভ হয়না । *বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম* ,*রাষ্ট্রধর্ম* এবং *বাংলাদেশী* জাতীয়তাবাদ কে সংবিধানে সন্নিবেশ যারা করেছিলেন তাদের উদ্দেশ্য মহৎ ছিলো না । তারা জনগণের অনুমতি নেয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি । আমার যদি মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহপাকের উপর বিশ্বাস পরিপূর্ণরূপে থাকে । ধর্মাচার যথাযথ পালন করি , দুর্নীতি না করি ,প্রতারক না হই, প্রতি কাজের শুরুতে যদি মহান সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করি তাহলে সংবিধানে *বিসমিল্লাহ* এবং *রাষ্ট্রধর্ম* থাকা না থাকা নিয়ে কি আসে যায় । সংবিধানে আজকে *বিসমিল্লাহ* রয়ে গেছে তাতে আমরা কতটুকু ধার্মিক হতে পেরেছি ,কতটুকু সৎ হতে পেরেছি , কতটুকু দেশপ্রেম অর্জন করতে পেরেছি ? দেশপ্রেমও তো ঈমানের একটা অঙ্গ । আসলে যারা সংবিধানে এতবড় মূল্যবান জিনিষকে সন্নিবেশ করেছেন তারা ধর্মাচার পালনের জন্য নয় , সেটাকে সিঁকেয় তুলে রাখতে চেয়েছেন সারাজীবন । এটা সৃষ্টিকর্তার
প্রতি ভালবাসা নাকি শঠতা !

যখন দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ অর্থের অভাবে অভুক্ত থাকে , চিকিৎসাসেবা পায় না , খোলা আকাশের নীচে শুয়ে রাত কাটায় । এতোবড় অমানবিকতাকে ভ্রুক্ষেপ না করে সংবিধানে যারা *বিসমিল্লাহ* সন্নিবেশ করে দিয়েছিলেন মহান আল্লাহতায়ালা তাদের প্রতি খুশী হবেন ? অবশ্য ততদিন আমাদের মতো অধমদের হাশরের মাঠে যাওয়ার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে
হবে । দেখা যাক ! মহান সৃষ্টিকর্তা উনাদের মতো উত্তম রাজনীতিকদের নাকি অধম জনগণের পক্ষে থাকেন ।

ধর্ম তো কল্যাণের ডাক নিয়ে এসেছে । ধর্মের হুকুম পালন করলে মঙ্গল হয় কিন্তু ধর্মের নামে অধর্মের চর্চা হতে থাকলে কি ধরনের কত রকমের অরাজকতা ,হানাহানি ,বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধ যুগ যুগ ধরে চলতে থাকে সেটা সারা পৃথিবীতে এ ধরনের রাষ্ট্রের দিকে তাকালে বোঝা যায় ।

যারা মহাগ্রন্থ পবিত্র কোরআনকে *একমাত্র সংবিধান* বলেন , দেশের সংবিধানকে স্বীকার করেন না । উনারাই কেন আবার এই সংবিধানে *রাষ্ট্রধর্ম* এবং *বিসমিল্লাহ* সন্নিবেশ করার আন্দোলনে বেপরোয়া !

এদেশের জনগণ ধর্মবিরোধী না । কোন রাজনৈতিক দলও ধর্মবিরোধী না । তাহলে ধর্ম উদ্ধারের নামে যে অস্থিরতা শুরু করার চেষ্টা করা হচ্ছে এতে কার মঙ্গল ? চল্লিশটা বছর জুড়ে দেশ অস্থিরতার মাঝে টিকে আছে । দেশ জুড়ে অস্থিরতা থাকলে জাতির জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো কিভাবে পূরণ হবে । ভাত-কাপড়ের , চিকিৎসার সুব্যবস্থা গড়ে না উঠলে যে অসহনীয় জীবন ধিকি ধিকি করে চলে তাতে কি ধর্মের মূল সুর নষ্ট হয় না ! ধর্মের যত পালনীয় বিধান রয়েছে তার মধ্যে তো দারিদ্র্য দূরীকরণও একটি । যারা সরাসরি ধর্মের নামে রাজনীতি করেন ,প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি পেশের তাদের একটি মিছিলও যদি দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য হতো জনগণ তাদের উপর ভরসা করতো । কিন্তু উনারা সে কর্মটি করেননি ।

আসলে যে গাছের শেকড় উপড়ে ফেলা হয় সে গাছ কি বাঁচে ! বাঙালিত্ব যে আমাদের শেকড় । মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাতিঘর । মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের যে মালা এক সুতোয় গাঁথা ছিলো সেটা তো একটা সময় ছিঁড়ে ফেলা হলো । তবে সেই মালা একই সুতোয় গাঁথার সময় এসেছে । যতদিন রাষ্ট্রের আদর্শগত বিষয়ে এক হবে না রাজনৈতিক দলগুলো ততদিন কল্যাণ রাষ্ট্রের উদ্দেশে এগিয়ে যাওয়া কষ্টকর হবে ।

দেশের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র । বিপুল জনগোষ্ঠী ভূমিহীন , নদী ভাঙনের শিকার উদ্বাস্তু হয়ে শহরে এসে মানবেতর জীবন যাপন করে , ভিটেমাটি হারিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির জীবন বেছে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না—- এদের স্হায়ী পুনর্বাসনের জন্য দলীয় কর্মসূচী থাকা এবং সরকারে থেকে যথাযথ বাস্তবায়ন করা সবচেয়ে জরুরী । এদেরকে রেললাইন এর ধারে শুইয়ে রেখে কল্যাণ রাষ্ট্রের
পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব ।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মুক্তবাজার অর্থনীতির বিপক্ষে থাকা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না । তবে এর লাগাম অবশ্যই সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করা এবং কল্যাণমুখী অর্থনীতির আদর্শ বাস্তবায়ন করার ওপর জোর দেয়া উচিৎ । শুধুমাত্র মুক্তবাজার অর্থনীতির আদর্শ এদেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি সেটা জনগণের কাছে স্পষ্ট । চাল,ডাল,তেল,নুন কিনতে গেলে সেটা সবাই
হাড়ে হাড়ে বোঝে ।

কথাগুলো খুব সহজে বললাম । কথা বলা যত সহজ এর বাস্তবায়ন বহু কঠিন । তবুও আমাদের এই কঠিন পথেই এগুতে হবে । কোন বিকল্প নেই । বিশাল জনসংখ্যার দেশে জন সমস্যাকে জনসম্পদ হিসেবে তৈরী করা না গেলে মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে সময় লাগবে না । ঐদিন আমরা পেতে চাই না । আমরা চাই সেই দিন —- যে শিশুটি আজ খালি পায়ে খালি পেটে বিদ্যালয়ে
যাচ্ছে , সে যেন জুতা পায়ে ভরা পেটে বিদ্যালয়ে যেতে পারে আগামী দিন ।

সে আগামী দিন যেন অনন্তকাল পর না হয় ।