ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

সারাবছর নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যতটুকু বেড়ে যাওয়া অবস্থায় থাকে রমযান এলে সেটা আরো বেড়ে মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায় । বর্তমানে দেশে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি খুব একটা স্বাভাবিক না।তেল চিনির দাম তো সাধারণ মানুষের কাছে দুর্ভোগের বিষয় হয়ে উঠেছে । প্রতিবছর জনগণ যেন দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়েই থাকছে । ভোজ্যতেল চিনি হাতেগোনা কয়েক লোভী চক্রের কাছে জিম্মি । যখন তখন যেমন ইচ্ছে তেমন দাম নির্ধারণের মালিক বনে বসেছে ঐ চক্র । জিনিসপত্রের অনৈতিক মূল্যবৃদ্ধির এ খেলা আজ নতুন নয় । ব্যবসায়ীরা সরকারকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে আবার তারা প্রতিশ্রুতি ভাঙছে , প্রতারণা করছে । তেল চিনি বাজার থেকে উধাও করে দিচ্ছে । অথচ এফবিসিসিআই সভাপতি রোজা শুরুর আগেই এক টিভি চ্যানেলে তথ্য দিয়েছিলেন , ৯৭ হাজার টন চিনির মজুত রয়েছে । এলসি হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার টন এবং বাংলাদেশ সুগার করপোরেশনের মজুদ ৫৩ হাজার টন । মোট মজুদ প্রায় পৌনে চার লাখ টন । রমযান মাসে চিনির চাহিদা পৌনে তিন লাখ টন । উদ্বৃত্ত থাকবে প্রায় এক লাখ টন । অন্যদিকে ভোজ্য তেলের মজুদ ১ লাখ ৩১ হাজার টন । এলসি হয়েছে ৩ লাখ ৬৭ হাজার টন । মোট মজুদ প্রায় ৫ লাখ টন । রমযান মাসে চাহিদা আড়াই লাখ টন । উদ্বৃত্ত থাকবে প্রায় আড়াই লাখ টন । বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একই রকম তথ্য দেয়া হয়েছে । তাহলে তেল চিনি গেল কোথায় ? এসব তেল চিনি দেশের ভিতরেই ছিল । বড় বড় লোভী ব্যবসায়ীরা তো সবসময় নিত্যনতুন অজুহাত খাড়া করে। সেই সুযোগ ছোট ব্যবসায়ীরাও নেয় ।

রমযান মাসের আগের দিন সন্ধ্যায় পুরো মালিবাগ বাজার ঘুরেছি । চিনি পাইনি । অতি পরিচিত কয়েক দোকানি বলেছে সকলের কাছেই চিনি আছে , তাদের কাছেও আছে কিন্তু বিক্রি করবে না। তারা নাকি বেশী দামে কিনেছে ,সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে তাদের ক্ষতি হবে । তারা প্রতি কেজি ৭০ টাকায় বিক্রি করবে কিন্তু এই মুহূর্তে করবে না কারণ সরকারি সংস্থা বাজার নজরদারিতে নেমেছে , তাই তারা প্রকাশ্যে দোকানে এখন চিনি তুলবে না । ঐ দোকানিদের একজন আমাকে পরামর্শ দিলেন— এলাকার মহল্লার দোকান থেকে চিনি নিতে কারণ ওখানে নজরদারি হয়না , ৭০ টাকাই দাম নেবে কিন্তু পাবেন । এলাকার মহল্লার দোকানে এলাম ।

দোকান মালিক চিনির দাম বললেন , ৭৫ টাকা প্যাকেট । তিনি নাকি ৭১ টাকায় কিনেছেন । ফিরে এলাম । প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষে আবার সেই দোকানে চিনি আনতে গিয়ে তার কর্মচারীকে পাই। তিনি নেই। কর্মচারীর কাছ থেকে ২ কেজি চিনি নিয়ে ২০০ টাকা দিলে তিনি আমাকে ৬০ টাকা ফেরৎ দেন । আমি প্রশ্ন করলে ৭০ টাকা কেজির কথা বললেন ঐ কর্মচারী । বললেন উনারা ৬৬ টাকায়
কিনেছেন । প্রিয় ব্লগার ও পাঠকবৃন্দ বুঝে নিন অবস্থাটা । ঐ কর্মচারীও যে অসত্য বললেন না তার নিশ্চয়তা কোথায় ? তাহলে কি ঐ ব্যবসায়ীরা ৬৫ টাকাতেই চিনি বিক্রি করতে পারতেন ! আমি জানিনা আপনারা এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন কিনা । আমাকে সবসময় কমবেশী এ পরিস্থিতিতে পড়তে হয় ।

বাজার বিশ্লেষকরা বলেন , রমযান মাসে দাম বাড়ার একটা প্রবণতা থাকে । সারাবিশ্বে যখন বিশেষ সময়গুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দাম কমে সেখানে বাংলাদেশে বিশেষ সময়ে দাম বাড়ার প্রবণতা ! ঐ ভদ্রভাষা *প্রবণতা* বাজার বিশ্লেষকদের এক্ষেত্রে মুখেই আনা উচিৎ না । তাতে ঐ লোভী মুনাফাখোররা আরো বেশী প্রশ্রয় পায় ।

এখন প্রশ্ন এসে যায় সরকার কি তাহলে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না ? নিচ্ছে । অনেকখানিই নিচ্ছে । এসকল জিনিষের দাম কমানোর জন্য এলসি প্রক্রিয়াকে একেবারেই সহজ করেছ সরকার। আমদানি পণ্যের শুল্ক কমানো হয়েছে ,বাদ দেয়া হয়েছে। প্রতারণা মূলক ডিও প্রথা বাতিল করে পরিবেশক প্রথা চালু করা হয়েছে ,যা সফল হতে ব্যবসায়ীরা বাধা সৃষ্টি করছে । চালের কথায় ধরুন ।

যে সকল উপাদানের অভাবে চালের দাম বাড়ে , প্রায় সকল উপাদানই সফলতার সাথে সরকার মিটিয়ে চলেছে । কৃষিঋণ থেকে শুরু করে সার বিতরণ , সেচ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা ২৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতির মাঝেও । ভর্তুকি দিয়ে কৃষি সরঞ্জাম কৃষকের কাছে ব্যাংকের মাধ্যমে সরবরাহ ইত্যাকার কাজ সরকার করে চলেছে।এতে কৃষির উৎপাদন প্রচুর বেড়েছে।

বিশ্বব্যাপী মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্য সঙ্কটের মুখেও খাদ্যশস্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকার সাফল্য ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে ইতোমধ্যে । আরো অন্যান্য উপাদান রয়েছে যেগুলো সরকার মেটাচ্ছে তারপরও চালের দাম আশানুরূপ ধরে রাখা যাচ্ছে না । লোভী ব্যবসায়ীদের নৈতিক অধঃপতন এতোটাই ঘটেছে , যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে । বাংলাদেশে গুদামের অভাব এতই প্রকট যে সরকার খাদ্যশস্য সংগ্রহ করে প্রয়োজন মতো গুদামজাত করতে পারছে না । বর্তমানে অনেক শস্যগুদাম নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম । পাশাপাশি হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে ওএমএস চালু রেখেছে সরকার।

টিসিবি কে সচল করা হয়েছে , যে টিসিবি কে বিগত সময়ে একপ্রকার বন্ধই করে দেয়া হয়েছিল । সরকারের উচিৎ হবে টিসিবি কে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। টিসিবি কে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে টেনে তুলে আনা ।

এদেশের সকল ভালো উপায় উদ্যোগ তো ভেস্তে যায় শুধুমাত্র দুর্নীতি অদক্ষতা আর অব্যবস্থাপনার কারণে । দুর্নীতি আমাদের জাতীয় জীবনকে তো আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করেছেই । যে কাজটি সরকারের করতে বাকি তাহলো মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রচলন থেকে বেশ খানিকটা বেরিয়ে আসা । সেটা না করলে লোভী ব্যবসায়ীদের দাপুটে খপ্পর থেকে জনগণ মুক্তি পাবে না । মুক্তবাজার অর্থনীতির খানিকটা নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে । এ অর্থনীতির মহাসুযোগ নিয়ে যেসকল লোভী ব্যবসায়ীরা দানবে পরিণত হয়েছে , এদের থেকে দেশকে দেশের জনগণকে মুক্তি দিতে হবে ।

ধারার পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক ধারায় ফিরে এসেছে বাংলাদেশ।সরকারকে গণতন্ত্রের সাথে সমাজতন্ত্রের ধারা নিয়েও চলতে হবে। সে ধারায় বাজার নিয়ন্ত্রণ না করলে সরকার ঠেকাতে পারবে না এদের দৌরাত্ম্য। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিও সামাল দেয়া সম্ভব হবে না । ফিরে পাবে না জনগণ তাদের কাঙ্খিত কল্যাণ রাষ্ট্রের চেহারা ।

আমরা যারা সাধারণ মানুষ , সকলে মিলে আরো সচেতন হই যাতে বর্তমান টালমাটাল বিশ্বে আমরা যেন টিকে থাকতে পারি । ইউরোপ ও অন্যান্য বিশ্বের বহু দেশ ক্রেডিট কার্ড নির্ভর অর্থনীতির দেশ । আমাদের অর্থনীতি এখনও সঞ্চয় নির্ভর । আমরা সঞ্চয়ী বলেই গেল বিশ্বমন্দায় অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশ এতো বড় ধকল মোটামুটি কাটিয়ে উঠেছে । সময়ের প্রয়োজনে কখনো উদারনৈতিক কখনো তো রক্ষণশীলতার পথ আমরা বেছে নিতে পারি । আবারো অর্থনৈতিক মন্দার কবলে এগিয়ে চলেছে সারাবিশ্ব।

খুবই কষ্টে জমানো সঞ্চয়টুকুই আমাদেরকে টিকে থাকতে সাহায্য করবে সঙ্কটময় মুহূর্তে। আমরা যেন ধৈর্য না হারায়,যদিও তা অনেক কষ্টের । আমরা দেশের জনগণ যেন ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি । কঠিন এ বিপৎসঙ্কুল সময়ে আমরা যেন বিভ্রান্ত না হই ।

জনগণের প্রতি মুহূর্তের সজাগ দৃষ্টি ও সচেতনতা খুবই প্রয়োজন এখন । আমরা যেন অনৈক্যে জড়িয়ে না পড়ি । অনেক বাধা অতিক্রম করে আমরা গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জন করেছি। যদিও এরমধ্যে ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে অনেক। তারপরও আমরা এসব ভুলগুলো ঠিকই কাটিয়ে উঠব আল্লাহপাকের অশেষ রহমতে । সকল অনাচার , বিশৃঙ্খলা ও ভ্রূকুঞ্চন আমরা পেছনে ঠেলে এগিয়ে যাব । এগিয়ে যেতে হবে আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্যই ।