ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

গণহত্যা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রসঙ্গে কিছু গোষ্ঠী সাধারণ ক্ষমা সম্পর্কে জেনে না জেনে , বুঝে না বুঝে অবিরত অসত্য বলে চলেছে। তারা বলছেন — বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং এটি মীমাংসিত বিষয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর সরকার যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেননি । এমনকি তখন বিচারের জন্য আইন প্রণয়নও করা হয়েছিল । সংবিধান পর্যন্ত সংশোধন করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি *দালাল ( বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ) আদেশ* জারি করেন । এরপর এই আদেশ ৬ ফেব্রুয়ারি , ১ জুন ও ২৯ আগস্ট ১৯৭২ তারিখে তিন দফা সংশোধনীর পর চূড়ান্ত হয় । দালাল আইনের অধীনে ৩৭ হাজারেরও বেশী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিভিন্ন আদালতে তাদের বিচার শুরু হয় । গণহত্যা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যাবতীয় অপরাধের বিচারের বিধান করে ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই *আন্তর্জাতিক অপরাধ ( ট্রাইব্যুনাল ) আইন ১৯৭৩* জাতীয় সংসদে পাস হয় ।

১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর দালাল আইনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই , তাদের জন্য সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে । সাধারণ ক্ষমার প্রেসনোটে স্পষ্ট বলা হয় — *ধর্ষণ , খুন , খুনের চেষ্টা , ঘরবাড়ী অথবা জাহাজে অগ্নিসংযোগের দায়ে দন্ডিত ও অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য হইবে না।* সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর দালাল আইনে আটক
৩৭ হাজারের বেশী ব্যক্তির মধ্যে প্রায় ২৬ হাজার মুক্তি পেয়েছিল । ১১ হাজারেরও বেশী ব্যক্তি এ সকল অপরাধের দায়ে আটক ছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল ।

বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিচারপতি সায়েম ও জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের সময় দালাল আইন বাতিল করে এ সকল অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। দালাল আইন বাতিল করলেও সে সময় তারা * আন্তর্জাতিক অপরাধ ( ট্রাইব্যুনাল ) আইন ১৯৭৩* বাতিল করেনি । ফলে এই আইনেই যুদ্ধাপরাধী মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হবে ।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের দায় থেকে অব্যাহতির অজুহাত তৈরি করতে যারা ১৯৭২ এর সিমলা চুক্তি ও পরবর্তী ত্রিপক্ষীয় চুক্তির কথা বলে, তারা জাতিকে বিভ্রান্ত করছে। সিমলা চুক্তি হয় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ১৯৭২ এর ২ জুলাই তারিখে,এখানে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে কোনো কথা নেই । বাংলাদেশ , ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে নয়াদিল্লিতে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দিকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে । এখানে কোথাও বলা হয়নি তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না। পাকিস্তান নিজ দেশে তাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পাকিস্তানের বিচারপতি হামিদুর রহমানকে নিয়ে গঠিত হামিদুর রহমান কমিশনও তাদের বিচারের মুখোমুখি করার পরামর্শ দিয়েছিল ।

এদিকে পাকিস্তানে আটকে পড়া ১ লাখ ৯০ হাজার বাঙালিকে ফেরৎ আনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীর কারণে । পাকিস্তানের পক্ষে মুসলিম বিশ্বেরও চাপ ছিল তখন । বঙ্গবন্ধু আটকে পড়া বাঙালিদের ফেরৎ আনলেন । সে কারণে বাংলাদেশ তাদের বিচার না করে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করেছে উপমহাদেশের শান্তি বজায় রাখার জন্য।এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে অব্যাহতির কোনো সম্পর্ক নেই । কারণ ত্রিপক্ষীয় চুক্তির পরও দালাল আইনে বাংলাদেশী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল এবং *আন্তর্জাতিক অপরাধ ( ট্রাইব্যুনাল ) আইন ১৯৭৩*-ও বাতিল করা হয়নি । তাই বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোনো অবকাশ নেই । যুদ্ধাপরাধের বিচার কখনোই তামাদি হয় না ।