ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

‘মুক্তিযুদ্ধের চার জেনারেল‘ ‍শিরোনামে বিডিনিউজ ২৪.ব্লগে একটি পোস্ট বিধৃত হয়েছে । বলা যেতে পারে আমার এই পোস্টটির অবস্হান তার বিপরীত । এই ব্লগে অনেক বোদ্ধা লেখক-পাঠক আছেন যারা অনেক আগেই ইতিহাসের প্রাথমিক পাঠ শেষ করেছেন, এই পোস্টটি তাদের জানানোর উদ্দেশ্যে না । গৌরচন্দ্রিকা না করে সরাসরি মূল প্রসঙ্গে চলে যাওয়াটা সমীচিন হবে ।

প্রথমত, এম এ জি ওসমানী মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন না । তিনি ছিলেন প্রধান সেনাপতি । বঙ্গবন্ধু ছিলেন সর্বাধিনায়ক । চিফ অব স্টাফ ছিলেন আব্দুর রব । ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ছিলেন এ কে খন্দকার ( বর্তমানে পরিকল্পনা মণ্ত্রি ) ।

১৯৭১ সালে এম এ জি ওসমানী এবং আব্দুর রব দু‘জনেই অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ছিলেন । বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দু‘জনকেই জেনারেল পদে উন্নীত করেন ।

দ্বিতীয়ত, পোস্টটিতে তৎকালিন মেজর জিয়াকে বিচক্ষন বলা হয়েছে অথচ তাঁর কর্মকান্ডের ধূর্ততা ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বলা হয়নি । মুক্তিযুদ্ধকালিন সরকারের কার্যক্রম যত কারণে বিঘ্নিত হয়েছে তন্মধ্যে মেজর জিয়ার ষড়যন্ত্রের কারণগুলো ছিল অন্যতম । ১৯৮৭ সালে প্রদত্ত এক সাক্ষাতকারে মেজর জেনারেল (অব) কে এম শফিউল্লাহ্ ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমানের ওসমানীবিরোধী তৎপরতার কথা প্রকাশ করেন ।

জেনারেল শফিউল্লাহ্ বলেন, “ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জিয়া একসময় (জেনারেল) ওসমানীকে কমান্ডিং চিফ (পদ) থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করেন । এ ব্যাপারে তিনি আমাকে বলেন, (জেনারেল) ওসমানী পুরাতন (বৃদ্ধ) হয়ে গেছেন । সুতরাং ইয়ংদের (যুবকদের) মাঝ থেকে দায়িত্ব নিতে হবে । আমি এই প্রস্তাবের প্রতিবাদ করি এবং এ ব্যাপারে আমার সাথে তাকে আর কোন কথা না বলার জন্য বলি ।“ ( মহিবুল ইজদানি খান কর্তৃক গৃহীত সাক্ষাৎকার, সাপ্তাহিক ‘জনমত‘, লন্ডন,২৮ আগস্ট-৩ সেপ্টেম্বর,১৯৮৭)

১৯৮৯ সালের জুন মাসে সাপ্তাহিক ‘হলিডে‘ পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাতকারে লে.কর্ণেল (অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়াউর রহমান ও মেজর মঞ্জুর মিলে জেনারেল ওসমানীকে তাঁর পদ ও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল । জিয়া ও মঞ্জুর চেয়েছিল জিয়াউদ্দিন জেনারেল ওসমানীকে পদত্যাগ করতে বলবে । কিন্তু জিয়াউদ্দিন তা করেনি । তার অস্বীকৃতির ফলে জেনারেল ওসমানীকে সরিয়ে দেয়ার ব্যাপারটি বেশী দূর গড়ায়নি ।“ ( বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়,আবদুল মতিন, পৃষ্ঠা-৯৮, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি,১৯৯৩)

১৯৭১ সালের জুন মাসের কথা । প্রধানমন্ত্রি তাজউদ্দিন আহমদ মুজিবনগরে সেক্টর কমান্ডারদের বৈঠক আহ্বান করলেন । আলোচনার শেষ পর্যায়ে মেজর জিয়াউর রহমান বললেন, যেহেতু রণক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী লড়াই করছে, সেহেতু নীতি-নির্ধারণের লক্ষ্যে সামরিক কমান্ডারদের নিয়ে একটা ‘ওয়ার কাউন্সিল‘ অর্থাৎ ‘সামরিক কমান্ড কাউন্সিল‘ গঠনের কথা ।
সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদেরকে নিয়ে মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়া সত্ত্বেও বিকল্প হিসেবে ‘ওয়ার কাউন্সিল‘ গঠনের প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রি হতবাক হলেন । তাঁর ভ্রুযুগল কুঁচকে উঠল এবং অভ্যাসবশত অবিরাম নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি খুঁটতে লাগলেন । ( বঙ্গবন্ধু, এম. আর.আখতার মুকুল, পৃষ্ঠা-১৬৬)

“ এক কথায় মেজর জিয়াউর রহমানের প্রস্তাব হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক দায়িত্ব এবং নীতি নির্ধারণ সব কিছুই নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরিবর্তে সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক । ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে একবার নিজেকে ‘প্রেসিডেন্ট‘ ঘোষণা করার পর আবার ‘ওয়ার কাউন্সিল‘ গঠন করার প্রস্তাব উত্থাপন করায়, উপস্হিত অনেকেই স্তম্ভিত হলেন ।“ ( সেদিন ভিতরে-বাইরে ষড়যন্ত্র:কিছু কথা বলতেই হচ্ছে-এম.আর.আখতার মুকুল,দৈনিক সংবাদ, ঢাকা,১৭ এপ্রিল,১৯৯২)

১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় প্রদত্ত এক সাক্ষাতকারে নুরুল ইসলাম ভান্ডারি বলেন, আগরতলা সেক্টরের দু‘টি যুব ক্যাম্পে বক্তৃতাদানকালে মেজর জিয়া বলেন, “ বাংলাদেশ সরকার কিছুই করছে না । যুদ্ধ আমরাই করছি । এমপি সাহেবরা খুব আরামে আছেন ।“ এর প্রেক্ষিতে তিনি মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে জিয়ার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে গোপনে ‘ইনকোয়ারি‘ পরিচালনা করেন । ওসমানী সাহেব একথা শুনে চটে গিয়ে মেজর জিয়াকে ‘শুট ডাউন‘ (গুলি) করার কথা বলেন । ( বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, আবদুল মতিন, পৃষ্ঠা- ৯৯-১০০)

অনেকের মতে, মেজর জিয়া মুজিবনগরেই এ ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখেছিলেন ।