ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে বাংলা । সবচেয়ে ব্যবহৃত মাতৃভাষাও বাংলা । বাঙালির মাতৃভাষা যেমন বাংলা তেমনি সংখ্যালঘু জাতিরও মাতৃভাষা রয়েছে । সকল জাতিরই মাতৃভাষা রক্ষার অধিকার রয়েছে । বাংলাদেশে ৪৫-৪৬টির অধিক সংখ্যালঘু জাতি বসবাস করে । তাদের নিজস্ব ভাষা চর্চার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ুক এমনটা যেন না হয় । রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন ত্রুটি না থাকুক যাতে তাদের প্রতিনিয়ত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় ।

শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক পাঠ্যক্রমে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির উপাদানগুলো রাখা উচিৎ যাতে তাদের শিশুরা শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে তীব্র আকর্ষণ বোধ করে, আগ্রহী হয়ে ওঠে । ঐ সকল শিশু তাদের নিজস্ব ভাষা অর্থাৎ মাতৃভাষাকে অবলম্বন করে বিদ্যালয়ে আসে । এসেই যদি দেখে শ্রেণি শিক্ষক ভিন্ন ভাষায় ( তাদের কাছে) পাঠদান করাচ্ছেন যা ঐ শিশুদের কাছে অপরিচিত তাহলে ঐ শিশুদের কিছুতেই স্বস্তিবোধ করার কথা না ।

সংখ্যালঘু জাতির শিশুরা যে ভাষা জ্ঞান নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে তা তাদের পরিবারের ভাষা, সমাজের ভাষা যা তার পাঠ্য বইয়ের ভাষা থেকে ভিন্নতর । যে কারণে পাঠের বিষয়বস্ত থেকে যায় তাদের কাছে দুর্বোধ্য । ভাষাগত দুর্বলতার কারণে বাংলাভাষী শিশুদের সাথে পেরে না ওঠায় পর্যায়ক্রমে ঐ সকল শিশুরা প্রাথমিক স্তরেই ঝরে পড়ে বিদ্যালয় থেকে যা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর ।

ভাষা সংস্কৃতিকে লালন করে । ভাষার বিলুপ্তি ঘটলে সংস্কৃতিরই বিলুপ্তি ঘটে । যদিও সব ভাষার লিখিত রূপ নেই তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সংখ্যালঘু জাতির ভাষা রক্ষার জন্য তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষাপদ্ধতি কী উপায়ে চালু করা যায় তার ব্যবস্হা করা । মাতৃভাষা বিহীন শিক্ষাব্যবস্থা জাতিগত পরিচয় সঙ্কট তৈরি করে । আর শিশুরা শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে ভীতির মুখোমুখি হয় যা কল্যাণ রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে কোনক্রমেই মানানসই হতে পারে না । রাষ্ট্র তো জনগণের সকল মৌলিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করবে এটাই তো অধিকার ।

আমার ধারণা রাষ্ট্র তা অবলীলায় স্বীকার করে । কিছু খুঁত রয়ে গেছে তবে রাষ্ট্র নিশ্চয় সে খুঁতকে নিখুঁত করে নেবে । মাতৃভাষা তো সকল জাতির যার যার সত্ত্বাকে উন্মিলিত করার উৎকৃষ্ট মাধ্যম । সে ভাষা অবহেলায় হারিয়ে ফেললে সেই জাতির ঐতিহ্য হারিয়ে যায়, রাষ্ট্র দায়ী হয় । শুধু রাষ্ট্র ও সরকার নয়, গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে সকল ভাষা রক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করা । আমরা যদি একে অপরের মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কাজ করি তাহলে সকল জাতি গোষ্ঠীর একে অপরের প্রতি আস্থা রাখার জায়গাও মজবুত হবে ।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সকল রাষ্ট্রকে সংখ্যালঘু জাতির ভাষার প্রতি শুধুমাত্র সহানুভূতি নয়, অধিকারের মর্যাদা দিতে হবে । আমরা সকলে মিলেমিশে মানুষের পরিচয়ে বেঁচে থাকতে চাই । শুধু ঐকান্তিক ইচ্ছেটুকু থাকলেই সকল সমস্যার সমাধান অনেকখানি সম্ভব । ঐ যে মূল্যবান কথাটুকু- সকলের তরে সকলে আমরা….