ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

 

সরকার আকস্মিক এক সিদ্ধান্তে গত ১ আগষ্ট থেকে দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলো থেকে থ্রি-হুইলার মানে তিন চাকার বাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট চালক-মালিক বা যাত্রীদেরকে সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র চারদিন। সরকারের এ সিদ্ধান্তে আমি অকুণ্ঠ সমর্থন জানাই। তবে সমর্থনের আগে আমার কিছু বলার আছে।

2

 

মহামান্য রাষ্ট্র মহাশয়, মাননীয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে দেওয়া সরকারি গাড়ি দুদিনের জন্য প্রত্যাহার করুন। এরপর তাঁকে খালি রাস্তায় ছেড়ে দিন। তখন দেখব- তিনি লক্কড়-ঝক্কড় লোকাল বাসে ওঠেন, নাকি সিএনজি অটোরিক্শার শূন্যতা অনুভব করেন।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় মহাসড়ক থেকে সিএনজি অটোরিক্শা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তাতে দেশের বড় একটি শ্রেণির মানুষ চরম উদ্বিগ্ন। প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ যানবাহনের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন- সবাই জানি। কিন্তু দুর্ঘটনা কেবল সিএনজি অটোরিক্শাকে ঘিরে ঘটে না। শুধুমাত্র এই দিকটা বিবেচনায় নিতে গেলে মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহনই চলাচলের যোগ্যতা হারাবে। অটোরিক্শা নিষিদ্ধের দিন থেকে অদ্যাবধি দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ালো?

মহাসড়ক থেকে অটোরিক্শা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়তো রাষ্ট্রের কাছে যৌক্তিক। কিন্তু দেশের পরিবহন খাতের এই সময়ের ব্যবস্থাপনার বিপরীতে এটি কতটা বাস্তবসম্মত, সেটি প্রশ্নের দাবি রাখে। মহাসড়কগুলোর দুই ধারে যথেষ্ঠ পরিমাণ জায়গা আছে, যেখানে আলাদা একটি করে লেন তৈরি করে অটোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। রাষ্ট্র কেন ওদিকে নাক গলালো না?

আমরা মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে অগ্রসর হতে পারি, সেটি কেবলই আয়-রোজগারের বেলায়। পরিবহনে এর ছিঁটেফোটাও দেখা যায় না। সময়ের দাবিতে দুই লেন চার লেনে রূপ পেতে পারে, চার লেন আবার আটে প্রসারিত হবে; অটোর জন্য ছোট ছোট দুটো লেন বানাতে কত আর যাবে?

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দুই লেন থেকে চার লেনে সম্প্রসারিত হচ্ছে। কাজটি প্রায় শেষপর্যায়ে। ২৬ মিটার প্রস্থের এই চার লেনে প্রতি দুই লেনের প্রস্থ সাড়ে ১০ মিটার। মাঝখানে পাঁচ মিটার জায়গা ডিভাইডার হিসেবে অচল পড়ে থাকবে। ডিভাইডারের এই জায়গাটা আরো সংকুচিত করে রাস্তার দুই পাশ থেকে কিছুটা যুক্ত করা হলে সিএনজি অটোরিক্শার জন্য আলাদা লেন নির্মাণ কোন ব্যাপারই না। কিন্তু সরকার সেদিকে দৃষ্টিই রাখল না!

রাষ্ট্রের এই একগুঁয়েমি সিদ্ধান্তের কারণে কেবল আমরা অতি সাধারণ যাত্রীরাই ভোগান্তি সইছি তা নয়, কয়েক লাখ অটো চালকের ঘরে ঘরে নেমে এসেছে হাহাকার। অটো কম্পানিদের ব্যবসায় লালবাতি জ্বলতে শুরু করেছে। তাতে কার কি! রাষ্ট্রের যে কিছুই হবে না! রাষ্ট্রের চালকেরা তো একেকজন বসে আছেন নিরাপদ দূরত্বের আসনে। এই ‘দুর্যোগটা’ সৃষ্টি না করলে হতো না?

মহাসড়ক থেকে মুখ ফিরিয়ে এখন সবগুলো অটোরিক্শার জায়গা হবে আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়কগুলোতে। সেখানে চাহিদার কয়েকগুণ অটো থাকা মানে চালকদের কপালে হাত দিয়ে বসে থাকা। তাদের আয়ে ভাটা পড়বে। সংসারে অশান্তি শুরু হবে।

এই গেল অটোরিক্শা চালকদের জীবনে আসা দুর্যোগের প্রসঙ্গ। এবার আসুন, আমরা নিজেদের কথা বলি। আমরা যারা সাধারণ যাত্রী, আমাদের যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, কেনার সামর্থ্যও নেই- আমাদের কী হবে! মহাসড়কে গুটি কয়েক লোকাল বাস চলাচল করে। সেগুলো লক্কড়-ঝক্কড়। সিএনজি অটোর যাত্রীদের এখান থেকে ওখানে নিয়ে যাওয়ার বেলায় ওই বাসগুলোকে অবধারিতভাবে যেখানে সেখানে থামতে হবে। তাতে মহাসড়কে নতুন ঝামেলার তৈরি হবে না তো?

3

 

গত কয়েকদিনের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, মানুষ রাস্তায় যানবাহনের অভাবে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়ছেন। পুরুষ যাত্রীদের পাশাপাশি নারীরাও সর্বোচ্চ ঝুঁকি মাথায় নিয়ে পিকআপের পিঠে চড়ছেন। আমরা কি ভুলে গিয়েছি ২০১১ সালের ১১ জুলাইয়ের সেই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির কথা? চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে এমন পিকআপের পিঠে চড়তে গিয়েই তো প্রাণ হারিয়েছিল ৪৪ জন শিশু-কিশোর! এখন যেভাবে গণহারে পিকআপ ভ্যানে যাতায়াত শুরু হয়েছে, তারা সবাই তো সিএনজি অটোরিক্শার যাত্রী ছিলেন। তাহলে কোন রকমের প্রস্তুতি ছাড়া তাদেরকে কেন এমন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হলো?

আমি সড়ক দুর্ঘটনা চাই না। চাই না আর একটি লাশও যেন সড়কে প্রাণ হারান। সর্বশেষ আজ শুক্রবার ৭ আগষ্ট সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় দেশের ২২টি জাতীয় মহাসড়কের তালিকা প্রকাশ করেছে, যেগুলোতে অটোরিক্শা চলাচলের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে এবং থাকবে বলে পুনঃঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এও বলেছেন যে, তাঁর মন্ত্রিত্ব গেলেও এ সিদ্ধান্ত থেকে নড়বেন না!

এমন অনড় মন্ত্রী দেখাও আজকাল ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু তাঁর ভেবে দেখা উচিত ছিল, কোনটা আগে- হুট করে থ্রি-হুইলার বন্ধ করে দেওয়া, নাকি বন্ধের আগে সাধারণের নাগালে থাকে এমন বিকল্প তৈরি করা?

1

 

সড়কে যানবাহনের সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে অটোরিক্শা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্র প্রমাণ করল নাগরিকের মাথা ব্যথা বেড়ে গেলে ওষুধ সেবন নয়, মাথাটা ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াই ‘যৌক্তিক’ সিদ্ধান্ত! আপনি পাল্টা প্রশ্ন রাখতে পারেন- ব্যথা হলে মাথা কাটার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত কি-না। দুটো আলাদা বিষয় হলেও তত্ত্ব কিন্তু অভিন্ন। মাথাকাটা তত্ত্ব অবাস্তব হলে অটো-তত্ত্ব বাস্তবসম্মত কি-না জানতে ইচ্ছে করে।

আমি দুঃখিত মাননীয় মন্ত্রী। আপনাকে লোকাল বাসের মুখে দাঁড় করাতে চাই না। আমার এই অভিব্যক্তি অতি সাধারণ নাগরিকদের অব্যক্ত মনোবাসনারই প্রতিধ্বনি। সুতরাং বিষয়টি ভেবে দেখুন প্লিজ।