ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

টিউশন ফির ওপর ভ্যাট নির্ধারণের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন-
‘অনেক খাত থেকে আমাদের ওপর হুকুম আসছে। সে খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। সে টাকাটা কোথা থেকে আসবে? সেটার জন্য রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। আর এই রাজস্ব বাড়াতেই আমাদের বিভিন্ন জায়গায় খোঁচা দিতে হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট আরোপ সেটারই একটি অংশ ।’

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর পর সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন-
‘‌মালিক-শ্রমিকরা আমাদের ওপর চাপ দেন। তারা সঙ্গত কারণেই চাপ দেন। ফলে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না।’

আজ মন্ত্রিসভায় টিউশন ফির ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অর্থমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন। এ সিদ্ধান্তের মাত্র কিছুক্ষণ আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে ঝড় তুলেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‍”এই দায় সম্পূর্ণভাবে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের।
প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির আগে এই ছাত্ররাই যারা প্রাইভেট স্কুলে পড়েছে তারা সবাই ভ্যাট দিয়েছে।
গতবছর যার পরিমাণ ছিলো ৭১ কোটি টাকা!
দুই এক বছর পর পরই এই ইউনিভার্সিটিগুলো তাদের সেমিস্টার এবং অন্যান্য ফী বাড়ায়, যা ৭.৫% ভ্যাটের সমান বা বেশী। তখন ছাত্ররা আন্দোলন করেনা।
ভ্যাট কেন এতদিন আরোপ নিশ্চিত করা হয়নি তা জানানেই কিন্তু এটা জানি ১০% ভ্যাট যা জুনে প্রস্তাব এবং ইউনিভার্সিটি মালিকদের সাথে অর্থমন্ত্রীর আলোচনার পরে ৭.৫% নির্ধারণ করা হয়। খেয়াল করুন, ছাত্রদের সাথে আলোচনার প্রয়োজন হয়নি, কারন তখনই মালিকরা নিশ্চিত করেছিলেন তারাই এটা দেবেন।
মালিকরা অবশ্যই ছাত্রদের বিভ্রান্ত করেছেন। এটার দায় তাদের নিতেই হবে।
আরেকটি বিষয়, ইতিমধ্যে অর্ধেকের বেশী ছাত্র তাদের প্রয়োজনীয় ফী জমা দিয়েছেন। আমাকে কিছু ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক এটা নিশ্চিত করেছেন। তাহলে এখন আন্দোলন কেন?
ছাত্রদের যদি কোন দাবী থাকে তা তাদের সুরাহা করা উচিত ইউনিভার্সিটির সাথে, সাধারন মানুষকে জিম্মি করে নয়।
আর জুন মাসের মেনে নেয়া বিষয়ে সেপ্টেম্বরে কেন ঘোষনা ছাড়াই এই আন্দোলন? এই প্রশ্ন নিশ্চিত করে এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য আছে।
আর আন্দোলনে ভাষার ব্যবহার ইত্যাদি ? আশাকরি তাদের শিক্ষকরা তাদের জন্য কিছু ফ্রি কোর্স চালু করবেন, আর জাতীয় কিছু স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে যে ব্যঙ্গ করা যায় না, তাও তাদের বোঝাতে হবে।”

প্রতিমন্ত্রীর এই কথাগুলো সরকারের জন্যে আদৌ মঙ্গল বয়ে আনতে পারে কি না- সেটি বিজ্ঞজনেরাই বলতে পারেন। তিনি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের অভিমতটাই প্রকাশ করলেন। কিছুক্ষণ পর খোদ প্রধানমন্ত্রীই ভ্যাট প্রত্যাহার করে প্রকৃত অর্থে আন্দোলনের পক্ষেই সংহতি জানালেন। তাহলে এই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মুখটা গেল কোথায়?

আর, নেপথ্যের ইন্ধনে বা নির্দেশে কিংবা হুকুমে যদি একজন মন্ত্রীকে জনমনে প্রভাব ফেলে এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে দেশটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াল বোঝার অপেক্ষা রাখে না।

মালিক-শ্রমিকদের চাপের মুখে ভাড়া বাড়ানোর পর সেটি প্রকাশ্যে বলে দিয়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী কী বোঝাতে চাইলেন? অনেক খাত থেকে হুকুম আসছে, সে খাতে বরাদ্দ বাড়াতে যত্রতত্র ভ্যাট আরোপন করার কথাটি বলে অর্থমন্ত্রীই বা কি বোঝাতে চান? জনমতের বিরুদ্ধে একটার পর একটা সিদ্ধান্ত নেবেন, আবার বক্তব্যে খটকাও লাগাবেন। এভাবে কী তারা দেশটাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছেন? প্রশ্ন ওঠে- হঠাৎ কেন দেশটা অস্থিতিশীল হয়ে উঠল? উত্তর পেতে আর গভীরে যেতে হবে না। উত্তর একটাই- এই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শিশুসুলভ বক্তব্যগুলোই এর জন্য দায়ি।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এলাকা সিলেটে গিয়েছিলাম গত সপ্তাহে। শহরের রাস্তাঘাট দেখলে যে কারোরই মনে হবে অজ পাড়া গাঁয়ের কোন এক অবহেলিত সড়ক এটি। একটি রাস্তাও দেখিনি ভালো আছে। সিলেটের মানুষ অর্থমন্ত্রীকে নাম ধরে ধরে গালি দিচ্ছেন। তাঁরা অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে রাস্তাঘাটে চলাচল করছেন। দুদিন থেকে যার মাত্রাটা আমিও অনুধাবন করতে পেরেছি।

সিলেটবাসীর একটাই প্রশ্ন- বলতে গেলে মন্ত্রিপরিষদে প্রধানমন্ত্রীর পরেই তাদের নেতার (অর্থমন্ত্রী) অবস্থান। তিনি চাইলে গোটা সিলেট শহরকে কাচের মতো ঝকঝকে পরিস্কার করে রাখতে পারেন। কিন্তু নিজের শহরের প্রতি কেন তাঁর এতটা অবহেলা- সেটা কিছুতেই মেলাতে পারছেন না সিলেটের মানুষ।

যিনি নিজের শহরটাই ঠিক রাখতে পারছেন না, সেই তিনি কি করে গোটা দেশের অর্থনীতিকে ধরে রাখবেন- এই প্রশ্নও এখন অমূলক নয়। খোদ নিজের এলাকার মানুষের মুখেই তার প্রতি খিস্তি খেউড় শুনে প্রথম প্রথম খানিকটা বিচলিত বোধ করি।

আবার আসি ভ্যাট প্রশ্নে। ভ্যাট নিয়ে জল এতটা ঘোলা হবে কেন? অর্থমন্ত্রী বলবেন এক রকমের কথা। এনবিআর বলবে আরেক রকম। প্রধানমন্ত্রী বলবেন একরকম। আবার অর্থমন্ত্রী নিজের সুর পাল্টে বলবেন অন্যরকম। সরকারের ভেতরে আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে একটাই ঘোষণা দিলে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায় না। তিন-চারদিন ধরে ঢাকার মানুষ যে পরিমাণ কষ্ট করেছেন, সেটি লিখে বোঝানোর মতো না। বলতে গেলে গোটা রাজধানী স্থবির হয়ে পড়েছিল। মানুষ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। যা পারেনি বিএনপি-জামায়াত জোটের টানা অবরোধেও।

প্রথমে অর্থমন্ত্রী বললেন- ভ্যাট দিতে হবে শিক্ষার্থীদেরকে। এরপর এনবিআর জানাল- শিক্ষার্থী নয়, ভ্যাট পরিশোধ করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সংসদে প্রধানমন্ত্রীও একই কথা বললেন। পরে আবার অর্থমন্ত্রী বললেন- প্রথম বছর যেহেতু ছাত্ররা আন্দোলন করছে, তারা এ বছর ভ্যাট দেবে না। কিন্তু পরের বছর থেকে তাদেরকেই ভ্যাট দিতে হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি। এ সমস্ত কথাগুলো যথেষ্ঠ পরিমাণ বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।

শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে। তারা হরেক রকমের স্লোগানে মেতেছে। সুযোগ পেয়ে খোঁচাও মেরেছে। উসকানিমূলক স্লোগান ধরেছে। তবে তাদের আন্দোলন ছিল শতভাগ শান্তিপূর্ণ। আন্দোলন কাকে বলে এই ফাঁকে রাজনৈতিক দলগুলোকে শিক্ষা দিয়ে গেছে তারা। বিএনপি তো শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সমর্থন জানানোর ঘোষণাও দিয়েছে। তারা মূলত এই সুযোগে কিছুটা হলেও ফায়দা লুটতে চেয়েছে। শেষপর্যন্ত শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ হওয়ায় জল আর বেশি ঘোলা হয়নি।

তবে এতে কার লাভ, কার ক্ষতি- এই হিসাবটা কষতে হবে। ভ্যাট ভ্যাট করতে গিয়ে সরকারের উঠতি জনপ্রিয়তায় কিছুটা হলেও প্রভাব পড়েছে। এই কদিনে কিছু মানুষের মধ্যে সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়ে গেছে। সরকারের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের জোরে যাদের মন জয় হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকে অনেকেই সরে গেছে। আর, এর দায়টা কার?

ভ্যাট আর ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব তো আছেই; এর চাইতেও জনরোষ অন্যদিকে। মানুষ জানতে চায়- কার ‌’হুকুমে’ ভ্যাট নির্ধারণ হয়? কেন মালিক-শ্রমিকদের ‘চাপের’ মুখে ভাড়া বৃদ্ধি হয়? কারো হুকুমে বা চাপে যদি সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে সরকারে থেকে মন্ত্রীরা কী করেন? তাদের কী সিদ্ধান্ত নেওয়ার এতটুকু ক্ষমতা নেই!

ওই যে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন- রাজস্ব আদায়ে আমাদের বিভিন্ন খাতে খোঁচা দিতে হয়…। তাঁর একটা খোঁচাতেই আজ এই অবস্থা। মন্ত্রী-এমপিদের অতিকথনে আওয়ামী লীগ বারবার ডুবেছে। এবারও এই ধরনের অতিকথন ও প্রকারান্তরে ‘ফালতু-কথন’ বন্ধ না হলে শেষরক্ষা হবে না।

আশা করি, এবার অন্তত মন্ত্রী-নেতারা মুখবন্ধ করবেন। নইলে দেশটা আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আর, সেটি যদি হয়ে যায় ফায়দা লুটবে ওঁতপেতে থাকা সুযোগ সন্ধানীরা। মাঝখানে শিক্ষকদেরও একহাত নিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। ব্যস, অনিবার্য কারণেই ক্ষেপলেন শিক্ষকেরাও। পরে অবশ্য নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করেন মন্ত্রী। তাহলে লাভটা কার হলো?

 

> লেখক : সাংবাদিক;

ঢাকা, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৫

news.joynal@gmail.com