ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসলেও জাতীয় পার্টিকে মূলত ক্ষমতাসীন দলের ‘লেজ’ বলে অভিহিত করে থাকেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। এই কথার যুক্তিও কিন্তু কম নয়। সংসদে বিরোধী দল হিসেবে সরকারের সমালোচনার দিক থেকে তারা মোটেও সফল নয়। জনসাধারণের দৃষ্টি কাড়তে ব্যর্থ। দলটির ভেতরেই তো অনেক মত। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সরকারিবিরোধী মন্তব্য করে বেড়াচ্ছেন। আর রওশন এরশাদের নেতৃত্বে অপরপক্ষ সরকারের লেজুড়বৃত্তিতেই ব্যস্ত বলে মনে করেন অনেকে।

বিএনপি নির্বাচন করেনি, ফলে তারা এখন সংসদের বাইরে। বাইরে বলতে দলটি একেবারে ‘ঘরবন্দিই’ বলা চলে। কারণ, তারা মাঠেও নেই ঘাটেও নেই। বিবৃতিতেও এখন আগের মতো নেই। মাঝে মধ্যে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানালেও কার্যত সেটি অগ্রহণযোগ্য।

সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজ বলতে আমরা যেটিকে বুঝি, সেই শ্রেণির প্রতিনিধিরাও আজ নীরব। তারা চুপষে গেছেন অজানা কারণে। একের পর এক ইস্যুতে সম্প্রতি মাঠ গরম হলেও তারা যেন মুখে তালা মেরেছেন! মুখে কলুপ এঁটেছেন! তাঁদের মুখ থেকে বের হচ্ছে না কোন কথা। আলোচনা নেই, সমালোচনাও নেই। তাঁদের সাম্প্রতিক অবস্থান অনেকটাই নাটকীয়।

দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সর্বশেষ ভ্যাট ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন গেল। প্রায় পাঁচ থেকে ছয়দিন আন্দোলন করে শেষপর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সফলও হয়েছেন। ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে এ আন্দোলনে সর্মথন জানায় বিএনপি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানায় ছাত্রলীগ। সরকারি দলের কয়েকজন নেতার কণ্ঠেও শিক্ষার্থীদের পক্ষে ইতিবাচক বক্তব্য বেরিয়েছে।

এর আগে তেল ও গ্যাসের মূল্য বাড়ায় সরকার। সংসদে একদিন জাতীয় পার্টি এর প্রতিবাদে ওয়াকআউট করলেও সেটি ততটা জোরালো প্রতিবাদ ছিল না। তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপির তরফ থেকেও শক্তিশালী প্রতিবাদ হয়নি।

ওই পরিস্থিতিতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি করে সরকার। কোন কোন ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি হলেও চুপ ছিল সংসদের বিরোধী দল। প্রতিবাদ জানায়নি বিএনপিও। ২৩টি মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিক্শা বন্ধ করা হলে জনদুর্ভোগ নেমে আসে সাধারণের জীবনে। প্রথমদিকে মাত্রাতিরিক্ত দুর্ভোগে সারা দেশের মানুষ ফুঁসে উঠেছিল। তারও কোন প্রতিবাদ হয়নি।

বিএনপি বা জাতীয় পার্টির বিষয় বাদ দিলে আলোচনায় থাকে সুশীল সমাজ নামে পরিচিত সম্মানিত নাগরিকেরা; দেশে ছোটখাট নানা ইস্যুতে যাদের কণ্ঠে ‘রক্ত’ ঝরে। সরকারের সমালোচনায় মুখর থাকেন সর্বদা। রহস্যজনক কারণে সাম্প্রতিক সময়ের কোন পরিস্থিতিতেই সুশীলদের কথা বলতে দেখা যায়নি। প্রতিবাদ তো দূরে থাক, টু শব্দ পর্যন্ত বেরোয়নি তাদের মুখ থেকে। টেলিভিশনের টক শো থেকেও তাদের অনেকে দূরে সরে গেছেন।

বিশেষ করে নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার গ্রেফতারের পর সুশীল সমাজের ভূমিকা নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ড. কামাল হোসেনসহ ওই শ্রেণির নাগরিকেরা এখন পর্দার আড়ালে। ফলে প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই এখন। সরকার একতরফা কোন সিদ্ধান্ত নিলেও কারো কিছুই করার নেই। মামলার ভয়ে কি না তারা চুপ হয়ে আছেন, কিছুই অনুমান করার জো নেই।

চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ হয় ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের। এ সংগঠনের আহবায়ক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামছুল হুদা। মাহমুদুর রহমান মান্নার গ্রেফতারের আগে টানা কয়েকদিন শামছুল হুদার নেতৃত্বে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বেশ তৎপরতা ছিল। তারা রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক সমঝোতার আহবান জানিয়ে চিঠিও দেন। ওই চিঠির সূত্র ধরে রাজনৈতিক অঙ্গন মোটামুটি সরগরম হতে শুরু করছিল। কিন্তু হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা সঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্নার একটি টেলিকথন ফাঁস হয়ে গেলে দৃশ্যপট বদলে যায়। উল্টো নিজেরাই তখন তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন। ২৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হন মান্না।

ওই ঘটনার পর দীর্ঘদিন ধরে চুপ করে আছেন ওই শ্রেণির নাগরিকেরা। তবে গত মাসে ঢাকার একটি সেমিনারে বক্তব্য দিয়েছিলেন শামছুল হুদা। তিনি ওই সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনাও করেন। তবে তিনি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি ইস্যুতে কোন কথা বলেননি।

ফেব্রুয়ারিতে গঠিত ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’-এ সদস্য হিসেবে আছেন এম হাফিজউদ্দিন খান, মোহাম্মদ শাহজাহান, জামিলুর রেজা চৌধুরী, আকবর আলি খান, সি এম শফি সামী, রাশেদা কে চৌধুরী, রোকেয়া আফজাল রহমান, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ, শাহদীন মালিক, আহসান এইচ মনসুর ও বদিউল আলম মজুমদারের মতো আলোচিত-সমালোচিত ব্যক্তিরা। রহস্যজনক কারণে তাঁদের সবার মুখেই তালা!

অতি সম্প্রতি পথশিশুদের নিয়ে ভাল কাজ করতে গিয়ে ‘ভুলের’ শিকার হয়ে কারাগারে আটক রয়েছেন চার তরুণ-তরুণী। আরিফুর আরিয়ান, জাকিয়া, হাসিব ও শুভ নামে ওই চার সমাজকর্মীকে বিনা অপারাধে আটক রাখার বিষয়টি দেশব্যাপী তরুণ প্রজন্মের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সুশীল সমাজের নাগরিকরা এই ইস্যুতেও নিশ্চুপ। তাদের এই ‘অন্তর্ধান’ বড়ই রহস্যময়!

লেখক : সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com