ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আমি যা ভাবি তা হয় না। এই ধরুন, যদি বলি আজ বাংলাদেশ জিতবে, তো জেতে না। আর যদি বলি- ভারত জিতবে, তখন দেখা যায় বাংলাদেশই জিতে যায়!

সেদিন আমার ভাবা উচিত ছিল- রবিবারও আদালতে ওদের জামিন হবে না; তাহলে বোধহয় আজ সত্যিই ওদের জামিন হয়ে যেত। কিন্তু এটা তো চার-ছক্কা আর উইকেটের খেলা না। পথশিশুদের এই বন্ধুদের নিয়ে আমি তো নেতিবাচক কিছু ভাবতেই পারি না। মনটা খুব ভারী হয়ে আছে- মানবতা বন্দি রইল বলে।

আরিয়ান, জাকিয়া, হাসিব ও শুভ- এই চার অদম্যের গল্প আপনাদের কাছে পুরনো। ওরা আজ বন্দি কারাগারে। গতকাল রবিবার শুনানি হয়েছে, কিন্তু জামিন মেলেনি। আজ আমার মতো সারা দেশে লাখো বন্ধু সকাল থেকে ক্ষণ গুণেছি ওদের মুক্তির আশায়। আমাদের প্রতীক্ষার শেষ প্রান্তটা অন্ধকারেই রয়ে গেলো।

ভীষণ কষ্ট পেয়েছি হাসিবের বড় ভাইয়ের কথাগুলো শুনে। সোহেল ভাই, তিনি প্রবাসে থাকেন। ছোট ভাইয়ের জন্য প্রচণ্ড মন খারাপ করে আছেন। তিনি বললেন- “খুব করেই মন চাইছিল, আজ (রবিবার) ওদের জামিনটা হয়ে যাক। আমি পুরোপুরিই প্রস্তুত ছিলাম। ভাবছিলাম, আজই ওদের জামিন হয়ে যাবে। কাল (শনিবার) সারারাত ঘুমাতে পারিনি। ভোর থেকে শুধু মিনিট গুণেছি। শেষপর্যন্ত বিকেল তিনটার অপেক্ষায় ছিলাম। বাবার সঙ্গে একটু কথা হয়েছে। ওদের জামিন হয়নি জেনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। সারাক্ষণ অজানা আশংকায় ছটফট করছি…।”

এই একজন ভাইয়ের অপেক্ষা-প্রত্যাশা সারা বাংলাদেশের লাখো মানুষের প্রতিধ্বনিই বলা চলে। তাঁর মতো আমাদের প্রত্যাশাও ওদের মুক্তি চাই। কিন্তু কারা প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি দেওয়ার মালিক আদালত। সেই আদালতের দিকে যাব না। সে বিষয়ে আমাদের সীমাবদ্ধতা তো আছেই। তবু আশা হারাতে চাই না। ওরা মুক্তি পাবে ঈদের আগেই।

রাজধানীর বনশ্রী থেকে ১০ শিশুকে উদ্ধারের পর পুলিশ এ চার অদম্য তরুণ-তরুণীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল, তারা মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। অনুসন্ধানের আগেই কাউকে অভিযুক্ত করে দেওয়া এ দেশের প্রশাসনের জন্য ডাল-ভাত। চোখ বন্ধ করলে এ ধরনের হাজার হাজার উদাহরণ দৃশ্যমান হবে। শুনেছি, আজ আদালতে অভিযোগের পক্ষে একজন সাক্ষি হাজির করেছেন পুলিশ। ফলে জামিনে ‘খটকা’ বাধে। আদালত নাকি, মামলার বাদিকে হাজির করাতে বলেছেন। কিন্তু পুলিশের দাবি, বাদিকে পাওয়া যাচ্ছে না।

ঘটনার শুরুর দিকে পুলিশের উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা আশ্বস্ত করে বলেছিলেন- অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চার তরুণ-তরুণী ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছেন। পুলিশ বিভাগ সাধ্যানুযায়ী তাদের পক্ষে সহায়তা করবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। সেদিনই আমার সন্দেহ জেগেছিল। কারণ, কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি- পুলিশ আশ্বস্ত করে কেবলই উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে। বাস্তব অর্থে তাদের আশ্বস্ততার কোন মূল্য নেই। তারা সে পথে এগোয় না। নইলে আজ নিজেদের অভিযোগ জায়েজ করতে সাক্ষি দাঁড় করাবেন কোন দুঃখে?

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, মুবারক (যে শিশুটির চাচা মামলার বাদি) যে মাদ্রাসায় পড়ত, সেই মাদ্রাসার শিক্ষক ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। ফলে বিষয়টি সুরাহা হচ্ছে না। ডিএমপি থেকে আমাকে আরো বলা হয়েছে যে, একজন খুনের মামলার আসামিও ক্ষেত্র বিশেষে জামিন পেয়ে যায়। এটা সম্পূর্ণ বিজ্ঞ আদালতের ওপর নির্ভর করে।

জানি না, আবার মাদ্রাসার হুজুর কেন এখানে জড়ালেন। এই মামলায় তাঁর জড়িয়ে পড়াটা আদৌ স্বাভাবিক ঘটনা কি না সেটাও বুঝতে পারছি না। আর যদি সাক্ষির প্রশ্নে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ শেষপর্যন্ত জায়েজ হয়ে যায়, মানবতা যদি বন্দি হয়ে থাকে- তাহলে সেখানেও আমার কিছু কথা আছে। পুলিশ অভিযোগের পক্ষে একজনমাত্র সাক্ষি হাজির করতে পেরেছে। আর, ওই অদম্য মানুষগুলোর হয়ে সপ্তাহকাল ধরে সারা দেশে কত মানুষ আওয়াজ তুলেছেন, সেটা কী কারো অজানা থাকার কথা? দেশের প্রথমসারির প্রায় সবগুলো পত্রিকা, টেলিভিশন, সংবাদ সংস্থা ওই চারজনের দৃষ্টান্তকারী ইতিবাচক কাজগুলো নিয়ে রিপোর্ট করেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে একজনকেও বলতে দেখিনি যে, তারা কোন অসামাজিক কাজে লিপ্ত। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ আজ সারা দেশের তরুণ প্রজন্ম রাস্তায় নেমে পড়েছেন শুধুমাত্র মানবতার জয়গানে। সত্য, সুন্দর ও সততাকে বাঁচিয়ে রাখতে। অজানা, অচেনা কোনো একদল তরুণ-তরুণীর হয়ে নইলে কেন এত ক্ষোভ-বিক্ষোভ-মানববন্ধনের বহর নামবে দেশে? এতগুলো মানুষের প্রত্যাশার কোন মূল্য নেই?

যারা জানেন না তাদের জন্য পুনরাবৃত্তি করছি। ‘অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’-এর কর্ণধার আরিফুর আরিয়ান, জাকিয়া, হাসিব এবং শুভ একটি মিথ্যা মামলায় ফেঁসে গেছেন। একজন বাদির দায়ের করা মামলার সূত্র ধরে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ তুলেছে। এই ফাউন্ডেশনের কর্মীরা রাজধানীর পাঁচটি এলাকায় ‘মজার ইশকুল’ নামে স্কুল খুলেছেন; যেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন কয়েক হাজার পথশিশু। মজার ইশকুল এ প্রজন্মের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

[আমিই শিশু পাচারকারী!]

আচ্ছা একটা বিষয় আমার কিছুতেই মাথায় ধরছে না। শিশু পাচারের মতো অভিযোগ চাট্টিখানা কথা না। এত বড় একটা ঘটনায় পুলিশ চারজনকে ‘অভিযুক্ত’ করতে চাইছে। ওদেরকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করা হয়েছে। তো পুলিশ কি নতুন কোন তথ্য উদ্ঘাটন করতে পেরেছেন? না পারলে আবারও তোদের রিমান্ডে নিতে চাইছেন না কেন? শিশু পাচার তো অনেক বড় একটা ঘটনা। সারা দেশের কয়েক লাখ তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছায় আওয়াজ তুলেছেন- আমিই শিশু পাচারকারী, আমিই শিশু পাচারকারী! তো পুলিশ এই লাখো তারুণ্যের নামে কেন মামলা ঠুকছে না? কেন এক এক করে সবগুলোকে ধরে জেলে ভরছে না? নাকি এই চারজন নিয়ে অন্য কোন ইন্টারেস্ট আছে?

ওরা যদি সত্যিকারের অপরাধী বা শিশু পাচারকারী হয়ে থাকে, তবে সে পথেই এগোবে পুলিশ- সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশাসনের মধ্যে সে ধরনেরও কোন লক্ষণ নেই। তাহলে তারা কী করতে চাইছে? আর যদি তাদের তদন্তে ওরা নির্দোষ প্রমাণ হয়, তবে কেন ওরা আজো বন্দি হয়ে থাকবে? কেন ওরা ঈদের আগে মুক্তি পাবে না?

আমার প্রত্যাশার প্রতিফলন সত্যি হোক, আর মিথ্যে হোক। আমি চাই ওরা শিগগিরই মুক্তি পাক। ওরা মুক্তি পেলে বাঁচতে মানবতা। নইলে সামনের কঠিন দিনগুলিতে আর কেউ সমাজের স্বার্থে নিজেকে বিলিয়ে দিতে যাবে না। আর কেউ মজার ইশকুল খুলে অসহায় শিশুদের নিয়ে ভাববে না। তখন সেই শূণ্যতাটুকু পূরণের ক্ষমতা কারো নেই।

চারজনের মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-শুভাকাঙ্খীদের প্রত্যাশা বিফলে যেতে পারে না। ওদের জীবন থেকে একটি ঈদ কেড়ে নেবেন না। আমার মতো আরো যারা ঢাকায় বা গ্রাম ছেড়ে বিভিন্ন শহরে থাকেন কাজের তাগিদে, তাঁরা ঈদ এলে ছোটেন নাড়ীর টানে। মায়ের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন বলে। আরিয়ান, জাকিয়া, হাসিব ও শুভর মায়েদের জীবন থেকে এই আনন্দটুকু কেড়ে নেবেন না। প্লিজ।

লেখক, সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com