ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

সংবেদনশীল, সদা প্রাণবন্ত, সত্যিকারের সুষ্ঠু ধারার এক শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম সৈয়দ ফজলুল হক বিএসসি। বাংলাদেশের রাজনীতির শুদ্ধপুরুষ খ্যাত এ ব্যক্তিত্ব ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের একান্ত বিশ্বস্ত। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ফজলুল হক আমার একমাত্র বিএসসি’। বঙ্গবন্ধু-পরিবারের সঙ্গে ওঁৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বিএসসি ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহ-শিক্ষক।

Mirsarai_BSC-Pic-15.01.2012

প্রয়াত এই মহাপুরুষ ছিলেন পাকিস্তান গণ-পরিষদের সদস্য। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় তাকে জেলে যেতে হয়েছিল। ছিলেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ছয় দফা আন্দোলনসহ দেশের নানা আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রগামী সৈনিক বিএসসি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। অত্যন্ত মেধাবী, ত্যাগী, নির্লোভ এ ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত। পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে ওপারে গেছেন ষোলো বছর ছুঁই ছুঁই। আজো তাঁর স্মৃতি বহন করছে গ্রামের বাড়ির সেই কুঁড়েঘরটি। ছন আর বেড়ার তৈরি নুয়ে পড়া এই ঘরটি থেকে তিনি রাজনীতি পরিচালনা করতেন। এই ঘর থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৯৭০ সালের পাকিস্তান গণ-পরিষদের নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন তিনি।

মীরসরাই উপজেলার ১৩ নম্বর মায়ানী ইউনিয়নের পূর্ব মায়ানী গ্রামের সৈয়দ বাড়িতে গিয়ে কথা হয় ফজলুল হক বিএসসির একান্ত সহচর বেশ কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে। কেবল আওয়ামী লীগই নয়, ভিন্নধারার রাজনৈতিক নেতারাও একবাক্যে ফজলুল হক বিএসসির গুণমুগ্ধ। সকলেই অবলীলায় স্বীকার করেন রাজনীতিতে ফজলুল হক বিএসসির দৃষ্টান্তকারী ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা।

জন্ম ও শিক্ষা :
সৈয়দ ফজলুল হক বিএসসি জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৮ সালের ১ নভেম্বর। তাঁর পিতা সৈয়দ আহাম্মদ মিয়ামমারের রেঙ্গুনে চাকরি করতেন এবং মা হোসনে আরা বেগম ছিলেন গৃহিণী। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। মীরসরাইয়ের আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে তিনি মেট্টিক পাশ করেন। ১৯৪৮ সালে এইচএসসি পাশ করেন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হওয়ার কারণে পাকিস্তান সরকার তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক করে। সেখানে বসেই তিনি বিএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেন। এরপর পাকিস্তান সরকার তাকে মাষ্টার্স পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত করে। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, বিএসসি পড়াশোনা অথবা রাজনীতি দুটোর যে কোনো একটা করতে পারবেন। কিন্তু রাজনীতির এই প্রাণপুরুষ রাজনীতি থেকে নিজেকে বিচ্যুত করেননি।

জীবন ও রাজনীতি :
চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালে রাজনীতিতে যুক্ত হন ফজলুল হক বিএসসি। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনীতি দিয়ে রাজনৈতিক জীবনে পা রাখেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে যুক্ত হন। ছাত্রনেতা হিসেবে ক্রমেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। রাজনীতিতে অসামান্য অবদান রাখায় একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর নজরে পড়েন বিএসসি। সেই-ই শুরু।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পারিবারিক যোগসূত্র সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতার পূর্বে নানা কারণে বঙ্গবন্ধুকে মোট ১৪ বার জেলে যেতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু-পরিবারের সেই দুঃসময়ে তিনি ছায়ার মত থাকতেন। পাশাপাশি নিজের এলাকার খোঁজখবরও নিতেন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান গণ-পরিষদের নির্বাচনে মীরসরাই-ফটিকছড়ি আসনে তিনি প্রার্থী হন। গ্রামে তাঁর একটি কুঁড়েঘর ছিল। বেড়া আর ছনের তৈরি ঘরটি থেকে তিনি পুরো নির্বাচন এমনকি পরবর্তী সময়ের রাজনীতি পরিচালনা করেন। জামায়াত সমর্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাওলানা দেলোয়ার হোসেনকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ফজলুল হক বিএসসি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন মিত্র বাহিনীর সঙ্গে। সদ্য স্বাধীনতার আমেজে শুরু হয় দেশ পুনঃগঠনের কাজ। ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশের ত্রাণ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশনীর সভাপতি। তবে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর শুরু হয় বিএসসির নতুন আরেকটি অধ্যায়। সে অধ্যায়ের পাতায় পাতায় শুধুই কষ্ট। বিএনপি ক্ষমতায় এলে ১৯৮০ সালে তিনি কারারুদ্ধ হন। অন্ধকার কারাগারে তাঁর ওপর চলে নির্যাতন-নিষ্ঠুরতা। পাঁচ মাস পর জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ফের বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দল গোছাতে শুরু করেন।

১৯৯৯ সালের ১৬ জানুয়ারি বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন ফজলুল হক। মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর লাশ গ্রামে আনতে দেননি। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা রাজনীতির এই শুদ্ধপুরষকে। বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের প্রথম কবরটি ফজলুল হকের। গেটে লেখা রয়েছে, ‘রাজনীতির শুদ্ধপুরুষ সৈয়দ ফজলুল হক বিএসসি’। বিএসসির স্ত্রী মাজেদা খাতুন সন্তানদের নিয়ে ঢাকায় থাকেন। তাঁর তিন ছেলে ও চার মেয়ে রয়েছে।

মানুষের হৃদয়ে বিএসসি এবং তাঁর স্মৃতিচি‎হ্ন :
মীরসরাই তথা বাংলাদেশের মানুষ আজো তাঁকে স্মরণ করেন। সুষ্ঠুধারার রাজনীতি চর্চায় এখনো তাকে অনুসরণ করেন অনেকে। এলাকায়ও যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয় তাঁকে। তাঁর গ্রাম পূর্ব মায়ানীতে সরেজমিনে গেলে কথা হয় অনেক প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মতে, বিএসসি ছিলেন মিরসরাই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। নির্লোভ এ রাজনীতিবিদ ইচ্ছে করলে অনেক কিছু করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ভোগের রাজনীতি করেননি। সত্যিকারের সুষ্ঠুধারার রাজনীতি করেছেন। অর্থ-বিত্তেও সমৃদ্ধ ছিলেন না। কিন্তু রাজনীতিতে মেধার প্রয়োগ ঘটাতেন।

স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের নাগরিক, সচেতন ব্যক্তিদের মতে, সৈয়দ ফজলুল হক বিএসসির রাজনৈতিক জীবন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। অথচ তিনি যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। ত্যাগী এই নেতা রাজনীতির বীজবপন করে গেছেন। তিনি আমাদের সকলের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

বিএসসির গড়া স্টুডেন্ট পাবলিকেশন্সের দেখভাল করেন তাঁর ছোট ছেলে সৈয়দ এহতেশামুল হক শাহরিয়ার। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ছাত্রাবস্থায় শিক্ষকতা করেছেন। মীরসরাইয়ের মিঠানালা রামদয়াল উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে যখন শিক্ষক সংকট ছিল, তখন তিনি সেসব বিদ্যালয়ে পড়াতেন। বঙ্গবন্ধু যখন জেলে ছিলেন এবং নানা সময় রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন তাঁর পরিবারের দেখাশোনা করতেন বাবা। এমনকি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকেও পড়াতেন।’

গ্রামের বাসিন্দা আমিনুর রহমান ভুঁইয়া (৬৮) ছিলেন বিএসসির একান্ত সহচর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিএসসি যতদিন গ্রামে অবস্থান করতেন, পুরো সময়েই পাশে ছিলেন আমিন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে সম্মান করতেন, চাচা বলে সম্বোধন করতেন। মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী তাঁর মরদেহ গ্রামে আনতে দেননি। বিএসসি পুরো উপজেলা পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন। মানুষের দুঃখ-কষ্টের সাথী হয়েছেন। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের রাজনীতির গুরু। একটি ছনের ঘর থেকে তিনি যেভাবে রাজনীতি পরিচালনা করতেন, তা সত্যিকার অর্থেই এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিরল দৃষ্টান্ত।’

গ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সানাউল্যাহ চৌধুরী, বিএসসির ভাতিজা সৈয়দ আজিম উদ্দিন বলেন, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আপোষহীন। ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন লড়াকু সৈনিক। শক্তিশালী এ বক্তা ছিলেন আদর্শ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ। তাঁর মৃত্যুর পরেও কোন সংবাদপত্রে তাঁকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য লেখালেখি হয়নি।

বিএসসির ভাতিজা সৈয়দ ইমতিয়াজ উদ্দিন ও সৈয়দ মঈন উদ্দিন বলেন, আমরা বিএসসির পরিচয়ে গর্ববোধ করি। তিনি যেমন বাংলাদেশের রাজনীতির শুদ্ধপুরুষ, তেমনি আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেরও প্রেরণা।

সৈয়দ ফজলুল হক বিএসসি জীবদ্দশায় ১৯৮৬ সালে গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন মাজেদা হক উচ্চ বিদ্যালয়। এ ছাড়া উপজেলার আরো অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তাঁর অনন্য ভূমিকা ছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, যে ঘর থেকে তিনি রাজনীতি করতেন সেই ঘরটি এখন নুয়ে পড়েছে। অনেকের মতে, বিএসসি জীবন এবং রাজনীতি নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে সেই ঘরটি সংরক্ষণ করে রাখা জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com