ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

একটি নতুন প্রবাদ শুনুন- ঘুমিয়ে আছেন ‘ডাক্তার মশাই’ কলঙ্কিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবু ডাক্তারদের অন্তরে!

‘চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু’- এ ধরনের খবর কয়েক বছর পর নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনায় রূপ নিবে! এখন যেমন প্রতিদিনই তাজা মানুষ লাশ হচ্ছেন সড়ক দুর্ঘটনায়, তখন রোজ রোজ চিকিৎসকের অবহেলাজনিত মৃত্যুর খবরেও অবাক হওয়া যাবে না! কারণটা পরিস্কার। এবার ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষায় উতরে যাওয়া হবু চিকিৎসকেরাই তো তখন পুরোদস্তুর ‘ডাক্তার’!

কলঙ্কিত পরীক্ষায় পাশ করা ‘ডাক্তারের’ নৈতিক ভিত্তি কী?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গতকাল বুধবার জোর গলায় বললেন- ‘মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। তাই আগের পরীক্ষা বাতিল হবে না এবং পুনরায় পরীক্ষাও হবে না।’ এর আগে ৩ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন- ‘মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস দুঃখজনক ঘটনা…’। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিহতে নিজের নানা পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন তিনি।

ফাঁস হওয়া প্রশ্নে অনুষ্ঠিত মেডিক্যাল পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান খবর। সরকার সরাসরি শিক্ষার্থীদের দাবি নাকচ করে দিলো। অভিযোগের জোরালো তদন্ত না করেই দাবি নাকচ করে দেওয়া মানে বোঝেন? দুই মন্ত্রীর কণ্ঠে পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য কী প্রমাণ করে?

অনেকের ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু আমি জোরগলায় বলতে পারি, কিছু একটা তো ঘটেছেই। ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত চারজনকে আটক করেছিল র‌্যাব। আটক ইউজিসি কর্মকর্তার আকস্মিক মৃত্যু শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে আরো যৌক্তিক করে তোলে। কারো কারো মতে, ইউজিসি কর্মকর্তার মৃত্যুটা ‘স্বাভাবিক নয়’। তিনি বেঁচে থাকলে থলের বিড়াল বের হলেও হতে পারত।

এখন থলের বিড়াল থলেই আছে। ওই বিড়াল যেন বের না হয়, যেন সেগুলো জনতার চোখের আড়ালেই থাকে, তার বন্দোবস্তি চলছে! নইলে কেন যথাযথ তদন্ত ছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলে দেবেন যে প্রশ্ন ফাঁস হয়নি? অভিযোগ উঠতেই পারে। আগে তদন্ত হোক, তারপর তদন্তের ফল। অবশ্য তদন্ত হলেও কী! আজকাল জালিয়াতির তদন্তেও জালিয়াতি হয়!

গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষাখাতে অস্থিরতার অন্যতম উপাদান প্রশ্নপত্র ফাঁস। এসএসসি, এইচএসসি তো আছে, জেএসসি-পিএসসির মতো প্রাথমিক স্তরের পাবলিক পরীক্ষাগুলো এই ‘মহামারি’ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের কচিমনে এই মহামারি চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বে মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষা। মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন যারা, তারাই একসময় ডাক্তার হবেন। তারাই রোগীর জীবন-মরণের অন্যতম ভরসা হবেন। আর, সেখানেই যদি গলদ থাকে, তবে মানুষ যাবে কোথায়? অসুখ হলে সারাবে কে? কলংকিত পরীক্ষায় পাশ করা ডাক্তারের নৈতিক ভিত্তিই বা কী?

এমন কেলেঙ্কারিতে উতরে যাওয়া হবু ডাক্তারেরা একদিন সনদধারী হলেও তারা নিজেদের প্রতি কতটা সন্তুষ্ট হবেন জানি না। নীতির দিক থেকে তাদের মূল্যই বা কেমন? ডাক্তারের বেশ ধরে তারা যখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বেন, গোটা পরিবেশটা লেজে-গোবরে হয়ে যাবে না তো?

জেনে রাখা ভালো- ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা হয়েছিল সহজ প্রশ্নে। এবার পাস নাম্বার ২০ করার একটা প্রস্তাব ছিল। কিন্তু সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে আশংকায় পাস নাম্বার ৪০-ই রাখা হয়। কিন্তু সহজ করে দেওয়া হয় পরীক্ষার প্রশ্ন। লাউ আর কদু তো একই জিনিষ হয়ে গেলো! একে তো সহজ প্রশ্ন, তার ওপর ফাঁস আর কলঙ্কের কালোচিহ্ন।

সরকার যেহেতু কেলেঙ্কারির অভিযোগ একবাক্যে নাকচ করে দিয়েছে, শিক্ষার্থীদের উচিত ঘরে ফিরে যাওয়া। রাস্তায় উত্তপ্ত রোদে পুড়ে আর কী হবে? এখন আমাদের একটাই করণীয়- কয়েক বছর পর আজকের হবু ডাক্তারেরা যখন পূর্ণ ডাক্তারি সনদ পেয়ে চিকিৎসালয়ে বসে যাবেন, তখন তাদের বয়কট করা। কিন্তু তাদের চিনবেন কী করে? মুশকিল তো।

আমার তরফ থেকে দায়িত্বশীলদের নচিকেতার গানের একটি লাইন উপহার দিই- তোমারও অসুখ হবে, তোমারই দেখানো পথে/ যদি তোমাকেই দেখে কোনো ডাক্তার…

লেখক : সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com