ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

শুনছি অস্ট্রেলিয়া আসবে শিগগিরই। তাদের মনের ভয় কাটতে শুরু করেছে নিশ্চয়ই। নইলে তো বাংলাদেশের মাটিতে খেলতে তাদের এলার্জি থাকার কথা। যাক তারা আসছে, ভাল খবর। ক্রিকেটপ্রেমীরা উজ্জীবিত হবেন।

‘অনিশ্চয়তা’ কাটিয়ে আগামী জানুয়ারির যুব বিশ্বকাপও হবে সোনার বাংলার মাটিতে। এই অনিশ্চয়তা শব্দটি কেন যে ভারতীয় গণমাধ্যম সৃষ্টি করলো বুঝতেই পারি না। ‘মুম্বাই মিরর’ নামে ভারতের একটি ইংরেজি দৈনিকে খবর বেরিয়েছিল- উদ্ভুত পরিস্থিতিতে যুব বিশ্বকাপ বাংলাদেশে হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়। বিকল্প হিসেবে পত্রিকাটি নিজের দেশ ভারতের নামটা এক নম্বরে লিখেছে। পাশে লিখেছে শ্রীলঙ্কা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম।

সব শঙ্কার ঘোর কাটিয়ে আজ বিসিসি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, যুব বিশ্বকাপ বাংলাদেশেই হচ্ছে। বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে রাখা অস্ট্রেলিয়াও আসছে শিগগিরই। তাহলে মুম্বাই মিরর-এর সেই খবরটি তো বানোয়াটই বলা চলে। পত্রিকাটির খবরে আরো বলা হয়েছিল- আইসিসির সভায় বিসিসিআই-এর কর্মকর্তারা বাংলাদেশে টুর্নামেন্ট আয়োজনের কতিপয় বাধা-বিপত্তি তুলে ধরবেন। এমনকি তারা বিকল্প ভেন্যুর প্রস্তাবও রাখবেন। খবরটি উদ্দেশ্য প্রণোদিত ছিল- তাতে কোন সন্দেহ নেই। তারা হয়তা চেয়েছিল, বাংলাদেশে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি ভুয়া খবর আলোচনায় নিয়ে আসা। যাতে করে বাংলাদেশের প্রতি আইসিসি এবং ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর ধারণা আরো নেতিয়ে পড়ে!

দক্ষিণ আফ্রিকার যুব দল আসার কথা ছিল বাংলাদেশে। অস্ট্রেলিয়া দলের সফর স্থগিতের পর ওই দলটিও আসেনি। একে একে একাধিক দুঃসংবাদে আমাদের মন ভেঙে পড়ার দশা। বাংলাদেশের ক্রিকেট যখন বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে, ঠিক তখন এ ধরনের ঘটনাগুলো হতাশ করারই কথা।

অস্ট্রেলিয়ার সফর স্থগিত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার যুবদল না আসার কারণ হিসেবে বাতাসে অনেক রকমের গুঞ্জন উড়ছিল। বিশ্বময় বাংলাদেশে ‘জঙ্গিবাদের সাম্প্রতিক তৎপরতার’ দিকে তীর ছোড়া হচ্ছিল। পরপর দুজন বিদেশি নাগরিক খুনের ঘটনা যেন ওদের পক্ষে ‘সেরের ওপর সোয়া সের’!

আমাদের দেশে বিদেশি নাগরিকেরা দুশ্চিন্তায় থাকবেন, খুন হবেন- এটি একেবারেই বিশ্বাস হয় না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে রাজপথে নিত্য খুনোখুনি আর তাজা রক্ত বয়ে গেলেও বিদেশিদের ভয় পাবার কোনো কারণ ছিল না। এখন তো সেই রক্তাক্ত রাজনীতিও নেই। দুজন বিদেশি নাগরিকের খুনের ঘটনার তদন্ত চলছে। স্বরাস্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দুটো ঘটনারই ক্লু উদ্ঘাটন নিয়ে আশাবাদি বক্তব্য দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- শুধুমাত্র খুনোখুনি আর জঙ্গিবাদ ইস্যুতেই আমাদের ক্রিকেট, আমাদের ভেন্যু পাকিস্তানের রূপ পাচ্ছিল? আর, এই জঙ্গিবাদ শব্দটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে লাভটাই কী হলো? ‘নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ’ নামক বাক্যটিও আজকাল জোরেশোরে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছে; যা এই মুহূর্তে একেবারেই যুক্তিযুক্ত! এখন কেউ বলছেন দেশে জঙ্গিবাদ আছে, কেউ বলছেন- নেই। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস নিয়েও একই ধরনের তর্কযুদ্ধ চলছে দেশে।

দেশে সম্প্রতি বেশকিছু হত্যাকাণ্ডের পর আইএস-এর দায় স্বীকারপত্র প্রকাশ পাচ্ছে। আসলে ওই পত্রগুলো আদৌ আইএস-এর পাঠানো কি-না নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আইএস-এর নাম ব্যবহার করে দেশিয় কোনো জঙ্গি সংগঠন এই কর্মকাণ্ডগুলো ঘটিয়ে থাকতে পারে বলেও আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটা হতে পারে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো নিজেদের আড়ালে রাখার অপকৌশলের অংশ!

আইএস-এর শাখা বাংলাদেশে থাকুক বা না থাকুক, জঙ্গিবাদ থাকুক বা না থাকুক- এগুলো কোনোদিনও এ দেশের ক্রিকেটে অন্তরায় হয়নি। আমার বিশ্বাস, সামনের দিনগুলিতেও হবে না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক হানাহানিতে শত শত মানুষের প্রাণ নিভে গেলেও খেলার মাঠে এর প্রভাব কখনোই পড়েনি। কখনো বিদেশি টিম আক্রান্ত হয়নি। তবুও ওদের আচানক অভিযোগ আমরা মাথা পেতে নেব?

ঘটনার ভেতরে ঢুকলে আমার কাছে একটা বিষয় পরিস্কার হয়ে ওঠে। জঙ্গিবাদ আসলে ইস্যুই না, এটি নামমাত্র। বাংলাদেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পর্যায়ক্রমে নেতিবাচক ধারণাগুলো মূলত উদ্দেশ্যমূলক। আমাদের ক্রিকেটে নিশ্চিতভাবে শকুনের চোখ পড়েছে। টাইগারদের আটকে রাখার জন্য নিশ্চয়ই এর চাইতে ভালো অপকৌশল হতে পারে না! গত এক বছরের, বিশেষ করে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের পর অগ্রগামী বাংলাদেশকে চেয়ে হতচকিত হয়েছে বিশ্ব! এ কোন বাংলাদেশ- অনেকের বিশ্বাস করতেই যেন কষ্ট হচ্ছিল।

সেই জিম্বাবুয়ে দলকে ক্রিকেটের তিনটি ক্যাটাগরিতে বাংলাওয়াশ দিয়ে শুরু। বিশ্বকাপের পরও দুর্দান্ত নৈপুণ্য। চোখ কপালে ওঠার দশা! পাকিস্তান, ভারত ও আফ্রিকাকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে টাইগাররা রীতিমত চমকে দিয়েছে বিশ্বকে। আর, বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে তো খুব কাছ থেকে দেখেছে গোটা বিশ্ব। ভারতের সঙ্গে সেই ম্যাচে আম্পায়ারদের জালিয়াতির শিকার না হলে যে কোন কিছুই ঘটতে পারত। তখন সেটিকে মোড়লেরা ‘অঘটন’ আখ্যা দিলেও দিতে পারতো। তাতে কী আসে যায়। বিশ্বকাপের পর পাকিস্তান, ভারত ও আফ্রিকাকে যে লজ্জা দিয়েছি আমরা, তাতে ‘অঘটন’ শব্দটা অন্তত বাংলাদেশের সঙ্গে যায় না!

উঠতি বাংলাদেশকে আটকে রাখার কোনো মন্ত্রই ছিল না মোড়লদের কাছে। ভদ্রলোকের খেলায় অভদ্রতার নজিরও তো কম দেখতে হয়নি। তরুণ মুস্তাফিজকে বুড়ো ধোনির গুতা, পরাজয় সামনে দেখে সাকিবের সঙ্গে পাকিস্তানি বোলার ওয়াহাব রিয়াজের তর্কযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাগুলো দেখেছে বিশ্ব। এইসব অভদ্রতা অসৌজন্যতার নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে। আমার মনে হচ্ছে- এই বদলে যাওয়া বাংলাদেশের সামনে জঙ্গিবাদ-আইএস কোনো ইস্যুই নয়, বরং টাইগারদের থামিয়ে দেওয়াই ওদের চক্রান্ত। আমাদের উচিত- সত্যিটা বের করে আনা। নইলে ওরা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ক্রিকেটপাগল বাংলাদেশি বাঙালিদের জন্যে এই সত্যিটা আজ সময়ের দাবি।

লেখক : সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com