ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

পিটিয়ে হত্যার দৃশ্যটি ভিডিও করে ইউটিউবে ছাড়া হয়েছিল বলেই আমরা দেখেছি রাজনের মতো শিশু কত নিষ্ঠুরভাবে খুন হয়। মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন সংসদ সদস্য বলেই শিশু সৌরভকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার খবর এত দ্রুত চাউর হয়। আর, শিশু গৃহকর্মী মাহফুজা আক্তার হ্যাপির ওপর নির্মম নির্যাতনের খবর বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যায় শাহাদাত হোসেন জাতীয় ক্রিকেটার বলে!

১০ বছরের মফিজুল একটি কাচের গ্লাস ভেঙেছিল বলে হোটেল মালিকের লাঠির বেদম প্রহারের খবর কজন জানি? হোমওয়ার্ক করেনি বলে আট বছরের সায়েমকে ব্ল্যাকবোর্ড মোছার ডাস্টরের আঘাতে বেহুঁশ বানিয়ে দিয়েছিলেন শ্রেণিশিক্ষক- সে খবরও জানি না।

2_149846কিছুদিন ধরে আমরা রাজন, সৌরভ আর হ্যাপিদের নিয়ে পড়ে আছি। আমরা যদি অন্তরের চক্ষু দিয়ে খুঁজি এমন কয়েক হাজার রাজন-সৌরভ-হ্যাপি আবিস্কার করতে পারব। তারা আমাদের আশপাশেই ছড়িয়ে আছে। আমরা না দেখছি তাদের বিধ্বস্ত মুখ, না শুনছি তাদের অব্যক্ত আর্তনাদ! সারাদেশের নির্যাতনকারীরা এতটা প্রভাবশালী নয় বলেই অগণিত ঘটনা আমাদের কানে পৌঁছায় না।

আমরা আসলে ইস্যুভিত্তিক জাতি। গত মাসে বনশ্রী থেকে আরিয়ান, জাকিয়া, হাসিব ও শুভ নামে চার তরুণ-তরুণীকে আটক করে শিশু পাচারকারী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কয়েকদিন ধরে দেশের গণমাধ্যমগুলো গরম ছিল।

এরপর এলো হ্যাপি, তারপর সৌরভ। ওই ফাঁকে হারিয়ে গেলো হাজারো শিশুর ‘নিয়ামক’ ওই মানবতার গল্পগুলো। রাজনের খুনি কামরুলকে সৌদি থেকে দেশে ফেরানো হয়েছে। আবার প্রাণ পেল রাজন ইস্যু! গণমাধ্যমকে একা দুষব কেন? প্রশাসনই বা কী করছে? অভিযোগ তো থরে থরে জমা হয়, কটা ঘটনাইবা তাদের কাছে গুরুত্ব পায়? আমরা স্যোশাল মিডিয়াকর্মীরাই বা কি করছি?

লেখাটি পড়তে গিয়ে আমার ওপরও বিরক্ত হতে পারেন। তাতে কী! আমি তারপরও আপনাকে একটি অনুরোধ জানাই- আপনি যেখানে আছেন, সেই বাড়ির বা চারপাশের চার বাড়ির গৃহকর্মীদের দিকে অন্তত একটিবার তাকান। ওই গৃহকর্মীদের সবাই ভালো আছে- এই দৃষ্টান্ত দেখাতে পারবেন না, চ্যালেঞ্জ! নির্যাতনের চিহ্ন চোখে পড়লে পুলিশে খবর দিন। আপনার দেওয়া তথ্যে প্রশাসন যন্ত্র সেদিকে সচল না হলে বুঝব- হ্যাপিকে ‘নির্যাতনকারী’ মানুষটি জাতীয় দলের ক্রিকেটার, তাকে ইস্যু বানিয়ে আলোচনায় আসা সম্ভব বলেই আইন এতটা তৎপর!

সত্যিই আজ দেশটা ভরে গেছে রাজন-সৌরভ-হ্যাপিতে।

 

দামি পৃথিবীর মূল্যহীন প্রতিবন্ধী শিশু!

আমরা গাড়ির ভেতরে বসে থাকি। আমাদের সারি সারি দামি গাড়ি দেখে মনে বড় আশা নিয়ে দূর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে ধেয়ে আসে শিশু। সে আর ১৯ জনের মতো স্বাভাবিক নয়; প্রতিবন্ধী। অনেকে কাছে এসে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ গন্তব্যে আসার আগেই গাড়ি টান মারে। ছোট্ট চেহারাটি তখন ফ্যালফ্যাল করে!

ওদের এড়িয়ে চলার জন্য কালো কাচে ঘেরা থাকি, সেটি বুঝতেই পারে না প্রতিবন্ধী শিশুগুলো। পারলে কী আর দূর থেকে ছুটে আসে! আমাদের কিন্তু ওদের দিকে তাকানোরও সময় থাকে না। আমরা ছুটে চলি রঙিন জীবনের অদৃশ্য আহ্বানে। যেখানে রাস্তার এদিক ওদিক থেকে হামাগুড়ি দিয়ে ঘিরে ধরে না প্রতিবন্ধী শিশুর দল!

আমরা রাস্তায় কজন প্রতিবন্ধী শিশুইবা দেখতে পাই! যেখানে সারা বিশ্বে প্রায় ১০ কোটি শিশু নানা রকমের প্রতিবন্ধকতার শিকার! বাংলাদেশে এই সংখ্যাটি কত- জানার সুযোগ হলো না। বিভিন্ন জায়গায় ঢু মেরেও লাভ হয়নি। তবে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাব বের করেছে- এ মুহূর্তে দেশে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা কমপক্ষে ৬০ লাখ। এদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ছাড়াও রয়েছে দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশু।

2013-06-01-08-30-22-51a9b11ebda57-pakistanইউনিসেফ বলছে, সারা বিশ্বে মোট শিশুর প্রায় পাঁচ ভাগ প্রতিবন্ধী। মানে প্রতি ২০ শিশুর একজন প্রতিবন্ধী। তাদের অনেকে প্রতিবন্ধী হয়েই পৃথিবীতে আসে, কেউ কেউ জন্মের পর পরিস্থিতির কারণে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে।

আমাদের দেশের শিশুরা প্রতিবন্ধী হওয়ার মূল কারণ অসচেতনতা। অর্ধেক শিশু অল্প ওজন নিয়ে জন্মায়। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে শতকরা ৯০ ভাগ মহিলারই ডেলিভারির সময় যথাযথ নিয়ম অনুসরন করা হয় না। এগুলো প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

একবার খবরের কাগজে পড়েছিলাম- ‘ভিক্ষুক বানানোর নির্মম কারখানা’। ওই খবরের পাশে আমার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছিল। যা হোক। ‘ভিক্ষুক বানানোর’ খবরটিতে বলা হয়, একটি চক্র কিছু মানুষ নিয়ে এমন একটি কারখানা বানিয়েছে; যেখানে মানুষের হাত পা বিকৃত বা বিকলাঙ্গ করে তাদের ভিক্ষুক সাজিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেয়! ওই খবর নিয়ে আমি আজো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝখানে। সত্যিই কী সুস্থ-সবল একটি মানুষ ভিক্ষার মতো নিকৃষ্ট পেশায় জড়িয়ে যেতে নিজের হাত-পা বিকৃত করে ফেলতে পারে? ওই ধরনের চক্রগুলোর অন্যতম লক্ষ্য নাকি শিশু!

রাস্তায় ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রতিবন্ধী শিশু দেখামাত্রই আমার ওই প্রতিবেদনটির কথা মনে পড়ে। তবে সরল বিশ্বাসে শিশুগুলোকে সত্যিকারের প্রতিবন্ধী বলেই ধরে নিই। অক্ষম শিশুগুলোর জীবনযুদ্ধের একেকটি প্রতিচ্ছবি মানবিক হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। ওদের জীবনের গল্পগুলো কত করুণ কাহিনিতে সাজানো!

অথচ দেশের সব প্রতিবন্ধী শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার কথা সরকারের। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের ‘শিশু অধিকার সনদ’ সে কথাই বলে। আমরাও জাতিসংঘের ওই সনদে স্বাক্ষর করেছি। তাহলে আমাদের প্রায় ৬০ লাখ প্রতিবন্ধী শিশুর অবস্থা কী? সরকার যদি এসব শিশুর দায়িত্ব নিয়েই থাকে, তবে রাস্তায় হামাগুড়ি দেয় ওরা কারা? আমরা কী অনুভব করি নির্বাক শিশুগুলোর ভেতরে জমে থাকা হাজারো কষ্ট? সে হয়তো নিজেকে খুঁজে বেড়ায় বাকি ১৯টি শিশুর ভেতরে।

রাষ্ট্র যেমন দায়বদ্ধতা এড়াতে পারে না, পারি না আমরাও; যারা কালো কাচের ভেতরে বসে ছুটে চলি রঙিন জীবনের দিকে! অন্ধকার কাচের ভেতরে বসে আমরা নিজেদের ভাবি আলোর পথের যাত্রী। আর বাইরে হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে চলা লাখো শিশু যেন এই পৃথিবীর কেউই নয়!

লেখক : সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com