ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
পুলিশ বাহিনী নিয়ে ভালো কিছু লিখতে চাইলেও হয় না! পুলিশ আর টাকা- এই দুটোকে সমার্থক শব্দ স্বীকৃতি পেতে উদাহরণ দেওয়ার মতো ঘটনার অভাব নেই আমাদের দেশে। এগুলো লিখে শেষ করা যাবে না। আজ একটি ঘটনা বলি-
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনভর মজুরি খেটে বাড়ির পাশে দোকানে আড্ডা দেওয়া নিশ্চয়ই বাজে কিছু না। আমার বাবাও সন্ধ্যার পর চা দোকানে আড্ডা দিতেন সমবয়সীদের সঙ্গে। তাঁদের আড্ডা মানে চায়ের কাপে চুমুক। তাঁদের আড্ডা মানেই বাংলা নাটক-খবরে চোখ রাখা কিংবা পরষ্পরের সঙ্গে জীবনের গল্প বলা। একান্নবর্তী পরিবারের বেশিরভাগ পুরুষের ক্ষেত্রেই এই ধরনের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
মনছুর (ছদ্মনাম) মজুরি খেটে সংসার চালান। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা তাঁর। দিনভর কঠোর পরিশ্রম করে সন্ধ্যার পর বাড়ির পাশে দোকানে আড্ডা দেন। পুলিশ খবর পায়, ওই দোকানেই মাদকদ্রব্য বিক্রি হয়।
এক সন্ধ্যায় পুলিশ ওই দোকানে হানা দেয়। দোকানদার নিজেই মাদক বেচেন। তিনি পুলিশের হাতে আটকও হন। পরে জানা গেল, ওই মামলায় পুলিশ ফাঁসিয়ে দেয় মনছুরকেও। কারণ, মনছুর ওই দোকানে আড্ডা দেন।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়টির বাড়তি অনুসন্ধানের প্রয়োজনই মনে করেননি। ওদিকে, মামলার খবরে দিশেহারা মনছুরের পরিবার। নীরিহ লোকটি উপায়ান্তর না দেখে ভয়ে পালিয়ে বেড়ান।
এর মধ্যে আমি একবার ওই থানায় যাই। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে আশ্বস্ত করলেন যে, অভিযোগপত্র প্রদানের সময় মনছুরের নাম বাদ দেওয়া হবে। এরপর সবকিছু ঠিকঠাকই চলে।
এর মধ্যে পুলিশের পক্ষ হয়ে এক সাংবাদিক যান মনছুরের বাড়িতে। পাঁচ হাজার টাকা দিতে পারলে মনছুরকে ‘দায়মুক্তি’ দেওয়া হবে। ৫০০ টাকা কামাতে যার পাঁচ কিলো ঘাম ঝরে, সেই মনছুরের কাছে পাঁচ হাজার টাকা পাহাড়সম।
আমি আবার পুলিশের সঙ্গে কথা বলি। তিনি আশ্বস্ত করলেন, কোন অসুবিধা নাই। মনছুরের ব্যাপারটা তাঁর মনে আছে। তাঁকে এর জন্য কোনরকমের ‘খুশি’ করতেও হবে না।
ছয় মাস পর।
এক বিকেলে পুলিশের একটি দল গেলেন মনছুরের বাড়ি। তারা মনছুরকে গ্রেপ্তার করতে যান। আর বলে দেন যে, কোর্ট মনছুরের ঘরের সব মালামাল জব্দ করবে। ঘরে তালা লাগিয়ে দেওয়া হবে।
এই ঘটনা শুনে বিরাট এক ধাক্কা খেতে হলো আমাকে। কারণ, ওই নীরিহ পরিবারটি আমার ওপর নির্ভরতায় ছিলেন। নিশ্চিত ছিলেন যে, তাঁদের কোনো ক্ষতি হবে না। ঘটনা অনুসন্ধান করলে মনছুরের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাবে না- এটা আমি অন্তত নিশ্চিত।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়টি অনুসন্ধানেরই প্রয়োজন মনে করলেন না। মনগড়া অভিযোগপত্র দেন আদালতে। ফলে আদালত মনছুরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং ঘরের মালামাল জব্দ করার নির্দেশ দেন।
মনছুর এবং তার পরিবার এখন ঘোর সংকটে।
আমি বহু নীরিহ মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের চক্ষুশূল হয়েছি। অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে একের পর এক খবর লিখেছি। তার জন্য আমাকে কম খেসারত দিতে হয়নি। তবু ভাল লাগে আকাশের তারার মতো পুলিশের ধারা থেকে নীরিহ কাউকে বাঁচাতে পারলে।
কোনো সাংবাদিক যখন পুলিশের হয়ে দালালি করে, উপরি কামাতে পুলিশকে সহায়তা করে, লেখনির জোরে নীরিহ মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে দফারফার পথ খুঁজে দেয়; এর চাইতে লজ্জার খবর আর হতে পারে না। নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে খুব লজ্জা হয় আমার, খুবই লজ্জা হয়।
আর পুলিশের বিষয়ে নতুন কিছু বলার নেই। এর আগে যে পোস্টগুলো দিয়েছি, সেগুলোই সত্য, সেগুলোই জীবন্ত। সৎ, নিষ্ঠাবান ও ন্যায়পরায়ন পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি স্যালুট জানিয়ে মনছুরদের বিনা অপরাধে ফাঁসিয়ে দেওয়া কুত্তাদের প্রতি শুধুই ঘৃণা।
মাত্র পাঁচ হাজার টাকার জন্য একজন দিনমজুরের জীবনকে, একটি পরিবারকে তছনছ করে দিতে যে পারে, সে মানুষ হতে পারে? সেই পুলিশ কর্মকর্তার কাছে এই বিষয়ে আর কিছুই জানতে চাইব না। তবে এইটুকু জানতে ইচ্ছে করে- হে পুলিশ, আপনি মানুষ নন?
মামলার খরচ চালানোর একটি পয়সাও তার নেই। তাই বলে তিনি জেল খাটবেন? তার ঘরে তালা ঝুলবে? বউ-বাচ্চারা খোলা আকাশের নিচে জীবন কাটাবে অনাহারে? এমন কেউ আছেন, যিনি আইনি সহায়তা দিয়ে মনছুরের পাশে দাঁড়াতে পারবেন?
আপনাদের কাছে আরজি করছি- দয়া করে এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ান, প্লিজ।

 

লেখক : সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com,  01814 31 85 32